কঠোর অভিবাসন নীতির যুগে সিলেট-লন্ডন সম্পর্ক
ইসমাইল আলী
সিলেট-লন্ডন সম্পর্ক গভীর। দেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত এই মহানগরীকে প্রায়শই "বাংলাদেশের লন্ডন" বলা হয়। সম্প্রতি সিলেট সফরকালে, বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক সিলেটের সাথে তার দেশের বিদ্যমান বিশেষ সম্পর্ক পুনর্ব্যক্ত করে বলেন যে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী প্রায় ৯০% বাংলাদেশি সিলেটের বাসিন্দা। তিনি আরও বলেন ব্রিটেনের সাথে বাংলাদেশের দৃঢ় সম্পর্ক মূলত সিলেটের কারণে। এবং যুক্তরাজ্যে সিলেটীদের অবদানকে অসাধারণ বলে বর্ণনা করেছেন।
২০২১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ৬,৫২,৫৩৫ জন মানুষ যুক্তরাজ্যে বসবাস করছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে তাদের অনেকেই ব্রিটেনে আসেন এবং গত ৭৫ বছরে তারা কেবল তাদের জন্মভূমিকেই পরিবর্তন করেননি বরং পেশাদার, কূটনীতিক এবং সংসদ সদস্য হিসেবে ব্রিটিশ সমাজেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
তবে, সাম্প্রতিক কঠোর অভিবাসন নীতি সিলেট-লন্ডন সম্পর্ককে বিপন্ন করতে পারে। ব্রিটেনের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি ইমিগ্রেশন আইনকে কঠোর করার জন্য কার্যত প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তারা মনে করছে যে "অভিবাসনের ব্যাপারে কঠোর" হওয়াই ক্ষমতায়নের সবচেয়ে নিশ্চিত পথ।
ফলাফল স্পষ্ট। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান (২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) জানিয়েছে যে ব্রিটেনে প্রবেশের অনুমতিপ্রাপ্ত বিদেশী নার্স এবং সেবাকর্মীর সংখ্যা ২০২৩ সালে ১০৭,৮৪৭ জন থেকে ২০২৫ সালে মাত্র ৩,১৭৮ জনে নেমে এসেছে - যা দুই বছরে ৯৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
পড়াশোনা এবং কাজ করতে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কারণে ব্রিটিশ সরকার (৪ মার্চ ২০২৬) আফগানিস্তান, মায়ানমার, সুদান, এবং কেমারুনের ছাত্রদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ আশ্রয়প্রার্থীদের (Asylum Seekers) জন্য এক অভূতপূর্ব নতুন ব্যবস্থা চালু করেছেন, যা ২রা মার্চ ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। ডেনমার্ক-ধাঁচের মডেলের অধীনে, শরণার্থীদের যুক্তরাজ্যে আর স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ দেওয়া হবে না। অস্থায়ী ভাবে যারা বসবাসের অনুমতি পাবেন, তাদের দেশ নিরাপদ বলে বিবেচিত হলে নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যেতে হবে। এবং প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলছেন যে "অভিবাসন ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্র - কাজ, পরিবার এবং পড়াশোনা সহ - কঠোর করা হবে যাতে আমাদের আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং মোট অভিবাসীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পায়।”
এই নীতিগত পরিবর্তন বাংলাদেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় স্বাভাবিক ভাবেই সিলেটকে বেশি আঘাত করবে। ব্রিটিশ-বাংলাদেশীরা এখন চতুর্থ প্রজন্মের যুগে। নতুন এই প্রজন্ম তাদের দাদা-দাদির দেশের সাথে খুব কম মানসিক সংযোগ নিয়ে বেড়ে উঠেছে। পর্যবেক্ষকরা লক্ষ্য করে থাকবেন যে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ ব্রিটিশ ছেলে-মেয়েদের সিলেটে বিয়ের জন্য ভ্রমণের প্রবণতা মূলত অদৃশ্য হয়ে গেছে দুটি প্রধান কারণে: সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং কঠোর অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ।
আরেকটি স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে ছাত্র ভিসার (Student Visa) উপর। অভিবাসন ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করার পর, যুক্তরাজ্যের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি সীমিত বা স্থগিত করেছে। এর ফলে ভিসা প্রত্যাখ্যানের ঘটনা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কর্ম ভিসা (Work Permit) রুটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বাংলাদেশ সহ বেশ কয়েকটি দেশ এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করেছে বলে অভিযুক্ত। যারা কেয়ার (Care Visa) ভিসায় যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন তাদের অনেকেই পরে আবিষ্কার করেন যে তাদের মুলত কোন নিয়োগকর্তাই (Employer) নেই। ব্যাপক অপব্যবহারের কারণেই আজকের এই বিধিনিষেধ, যেমনটি অনেকেই মনে করেন।
উপরে উল্লিখিত রুটগুলিতে যারা ইতিমধ্যেই যুক্তরাজ্যে আছেন - যাদের মধ্যে কয়েকজনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তারা এখন গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন: মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসা, আশ্রয় (Asylum) দাবি প্রত্যাখ্যান, বেকার অথবা শোষণমূলক কম বেতনের কাজ করছেন। পরিস্থিতি গভীর হতাশাজনক। এমনকি কেউ কেউ বাসস্থান নিশ্চিত করতেও লড়াই করছেন। কারণ অবৈধদের বাসা ভাড়া নিতে আইনি জটিলতা রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের এই কঠোর বিধিনিষেধের অর্থনৈতিক পরিণতি সিলেটে প্রতীয়মান হবে। বছরে ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স প্রবাহ কেবল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সিলেটের অনেক পরিবারের জন্য একমাত্র ভরসা। দ্য ডেইলি স্টারে লেখার সময়, সৈয়দ জয়ন আল-মাহমুদ যুক্তি দেন যে, ব্রিটেনের রেমিট্যান্স সিলেটকে ঢাকার পরে বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী শহর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আশীর্বাদ হয়ে কাজ করেছে। তবে নতুন করে আসার সুযোগ এভাবে বন্ধ হয়ে গেলে এই রেমিট্যান্স প্রবাহ থাকবে না। কারণ যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর প্রয়োজন মনে করেনা।
লন্ডন নির্ভর সিলেটের আশেপাশের শহরগুলিতে – মৌলভীবাজার, বিয়ানী বাজার, বিশ্বনাথ, জগন্নাথপুর এবং গোয়ালাবাজার – এর প্রভাব বিশেষ ভাবে পরিলক্ষিত হবে। আমি ছাতকের একটি গ্রাম (কেওয়ালি পাড়া) থেকে এসেছি – যেখানে উপরে উল্লিখিত উপজেলাগুলির তুলনায় "লন্ডোনি" কম। তারপরও, উন্নয়নের বেশিরভাগ অংশ - রাস্তাঘাট, মসজিদ, ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণ - লন্ডনের অর্থায়নে হয়েছে। আমার এলাকায় জমির দামের উত্থান-পতন লন্ডনের সাথে গ্রামের সম্পর্কের উপর নির্ভর করে।
এখানে, একটি বিষয়ে আমি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সিলেটের অনেক এলাকায় কৃষি জমির বিশাল অংশ লন্ডনবাসীদের মালিকানাধীন। বাংলাদেশের কৃষকরা সাধারণত বছরে দুই বা তিনবার তাদের জমি চাষ করলেও, লন্ডনিদের মালিকানা ভুমিতে প্রায়শই কেবল একবারই চাষ করা হয়। হ্যাঁ, এখানে অবশ্যই প্রকৃতির/আবহাওয়ার ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু যখন জমির মালিকরা হাজার মাইল দূরে থাকেন, তখন এই মূল্যবান সম্পদ খুব কমই তার পূর্ণ সম্ভাবনার সাথে ব্যবহৃত হয়। আমার গ্রামও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই এর অপব্যবহার মোকাবেলায় সরকারের সহযোগিতামুলক উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এদিকে, যারা বিদেশে পড়াশোনা করতে আগ্রহী তাদের এ বিষয়ে পুর্ব প্রস্তুতি প্রয়োজন। যুক্তরাজ্য এখনও পড়াশোনার জন্য একটি সম্ভাবনাময় দেশ। বিশ্বের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এখানে অবস্থিত। তবে কেবল যদি আপনি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হন এবং প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্য থাকে। সুইডেন, জার্মানির মতো দেশগুলিও বিবেচনা করতে পারেন, যেগুলি কিছু দিক থেকে ভালো সুযোগ প্রদান করছে।
যারা বিদেশে কাজ খুঁজছেন তাদের জন্য বার্তাটি সহজ: দক্ষতা অর্জন করুন। যেকোনো দক্ষতাই কোনও দক্ষতা না থাকার চেয়ে ভালো। একজন দক্ষ নির্মান শ্রমিক (construction worker) অথবা পানির মিস্ত্রি (plumber) বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রিধাবির চেয়েও লন্ডনে বেশি আয় করতে পারেন। তবে মনে রাখবেন - বিদেশে চলে যাওয়ার অর্থ কেবল আশাবাদী প্রত্যাশা নয়, বরং কঠিন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
লন্ডনে অবস্থানরত আমার ছেলে, যে সিলেটে ফিরে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যুক্তি দেয় যে, যুক্তরাজ্য আর স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য উত্তম দেশ নয়। তার ভাষায়, ব্রিটেন দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে। উচ্চ কর, কম বিনিয়োগ, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং চাপযুক্ত কল্যাণ (Stressed Welfare System) ব্যবস্থার কারণে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, সে মনে করে, বিদেশিদের প্রতি ক্রমবর্ধমান কঠোর মনোভাব।
যদিও আমি তার সাথে সব বিষয়ে একমত নই, কিছু বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না। যুক্তরাজ্যে এখন রাজনৈতিক ভূমিকম্প চলছে। লেবার পার্টি এবং কনজারভেটিভ পার্টির ঐতিহ্যবাহী দুই-দলীয় আধিপত্য ভেঙে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে পাঁচ বা ছয়টি দলকে কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখা যেতে পারে। আশ্চর্যজনক ভাবে অভিবাসন বিরোধী দল – রিফর্ম ইউকে – সরকার গঠনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার সাথে সংঘর্ষের আশঙ্কায় ব্রিটেন প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি করে চলেছে। অতিরিক্ত এই অর্থের বেশিরভাগই আসছে কল্যাণ বাজেট (Welfare Budget) এবং পেনশন ব্যবস্থা সঙ্কুচিত করে, এমনকি পাবলিক লাইব্রেরি বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে।
আমরা এক অদ্ভুত সময়ে বাস করছি। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের প্রায় সব দেশেরই অভিবাসীদের (Immigrants) খুব বেশি প্রয়োজন। তবুও, ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মানুষ এই বাস্তবতা প্রত্যাখ্যান করছে। তাদের কর্মক্ষম জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। জন্মহার এখন ঐতিহাসিকভাবে কম। যুক্তরাজ্যে, গড় প্রজনন হার (Fertility Rate) প্রতি মহিলা ১.৪১ শিশু। অভিবাসন ছাড়া জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে দরকার ২.১। প্রায় প্রতিটি ইউরোপীয় দেশের ক্ষেত্রেই একই কথা প্রযোজ্য। তবুও, মহাদেশ জুড়ে অভিবাসন বিরোধী মনোভাব বিরাজ করছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে চাই যে, মাসে অন্তত একবার আমার সুযোগ হয় ইউরোপীয় বন্ধুদের সাথে সাম্প্রতিক বিষয়গুলি নিয়ে মতবিনিময় করার। ২০১৫ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় এমনই একটি আলোচনায় আমি বাংলাদেশী সংবাদপত্রের কিছু অংশ তাদেরকে দেখিয়েছিলাম যেখানে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলকে পালিয়ে আসা সিরিয়ানদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য "নিঃস্বদের মা" হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছিল। আমার জার্মান বন্ধু এসব দেখে হেসে বলেছিলো যে আমাদের মিডিয়া আবেগপ্রবণ। তার মতে, এই উচ্চ শিক্ষিত তরুণরা জার্মানের জন্য আশীর্বাদ। মুলত কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই জার্মান অর্থনীতি প্রায় ১২ লাখ সিরিয়ান কর্মীবাহিনী পেয়েছিলো।
লেখকঃ লন্ডন প্রবাসী কলামিস্ট



















