শ্রীমঙ্গলে বাড়ছে সহিংসতা ও অপরাধ—আতঙ্কে জনজীবন, প্রশ্নে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
সংগ্রাম দত্ত: পর্যটন নগরী ও চায়ের স্বর্গরাজ্য হিসেবে দেশে-বিদেশে পরিচিত শ্রীমঙ্গল উপজেলা সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক সহিংসতা, খুন এবং অপরাধমূলক ঘটনার কারণে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক অস্থিরতা এবং আইনের শাসনের দুর্বল প্রয়োগের ফলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর জেলা প্রতিনিধি মোঃ সাইফুল ইসলাম ১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে শ্রীমঙ্গলের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যেমন একটি সংকটকাল বিরাজ করেছিল, বর্তমানে পরিস্থিতি আরও জটিল ও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে।
গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২৯ মার্চ রাতে আলীশারকুলের কামারপাড়া এলাকায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্র জুনায়েদকে হত্যা করা হয়। এর দুই দিন আগে, ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় নিজ বাড়ির সামনে থেকে সে নিখোঁজ হয়েছিল। নিহত জুনায়েদ স্থানীয় দুবাই প্রবাসী রমিজ মিয়ার ছেলে।
এরপর ৩১ মার্চ রাতে জালালিয়া সড়ক এলাকায় এক তরুণীকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ভুক্তভোগীর চিৎকারে আশপাশের যুবকেরা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা তাদের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করে গুরুতর জখম করে।
এ ধারাবাহিকতায় ১ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে শাপলা এলাকায় কামাল নামের এক যুবককে কুপিয়ে আহত করা হয়। একই দিনে দ্বারিকা পাল মহিলা কলেজ সংলগ্ন এলাকায় একটি পরিবারের তিন থেকে চারজন সদস্যকেও কুপিয়ে আহত করার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শাপলাবাগ রেললাইন সংলগ্ন বস্তিকে কেন্দ্র করে ছিনতাই ও মাদক ব্যবসায় জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এই চক্রটি শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশন এলাকাসহ আশপাশে যাত্রী ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও অর্থ ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। জিআরপি পুলিশের জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন। একইসঙ্গে রেলওয়ে স্টেশন মাস্টারও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে সাংবাদিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মন্তব্য করে বলেন, থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে কখনও কখনও উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ও আস্থাহীনতা আরও বাড়ছে।
উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে অপর এক ফেসবুক পোস্টে সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম শ্রীমঙ্গলে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে এক প্রভাবশালী সাংবাদিকের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তুলে ধরেন, যা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, মাঝে মধ্যে উপজেলা প্রশাসন অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলেও তা স্থায়ীভাবে কার্যকর হচ্ছে না। অভিযানে কখনও কখনও ড্রাইভার, হেলপার বা শ্রমিক পর্যায়ের দু-একজনকে আটক করার খবর মিললেও, এ কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা কথিত \'গডফাদারদের\' বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার উদাহরণ খুব কমই দেখা যায়।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই চক্রের বিস্তার এবং সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা মিলেই শ্রীমঙ্গলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
এ বিষয়ে জেলা প্রতিনিধি মোঃ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, গত এক মাসে সংঘটিত অপরাধের একটি প্রাথমিক পরিসংখ্যান তিনি সংগ্রহ করেছেন এবং শিগগিরই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন। তাঁর মতে, সমস্যা চিহ্নিত করে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ শুরু করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
শ্রীমঙ্গলের বর্তমান প্রেক্ষাপট একদিকে যেমন প্রশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জরুরি সতর্কবার্তা—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



















