img

৬ এপ্রিল ১৯৭০: শ্রীমঙ্গলে চার জাঁদরেল নেতার গ্রেফতার ও প্রতিবাদের সূচনা

প্রকাশিত :  ০৬:০১, ০৬ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:১০, ০৬ এপ্রিল ২০২৬

৬ এপ্রিল ১৯৭০: শ্রীমঙ্গলে চার জাঁদরেল নেতার গ্রেফতার ও প্রতিবাদের সূচনা

সংগ্রাম দত্ত: আজ ৬ এপ্রিল । ১৯৭০ সালের এইদিনে—পাকিস্তান আমলের এক অস্থির সময়ের দিন। তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমার শ্রীমঙ্গল থানায় “পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র” তথা ‘জয় বাংলা’ মামলায় চার প্রভাবশালী নেতাকে গ্রেফতার করে পাক সরকার। তাঁদের মৌলভীবাজার মহকুমা জেলহাজতে পাঠানো হলে মুহূর্তেই এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং শুরু হয় গণআন্দোলন। শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি স্মরণীয় হয়ে আছে।

গ্রেফতার হওয়া নেতারা ছিলেন—ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ও মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া, ছাত্রলীগ নেতা এম এ রহিম এবং এস এ মুজিব। সামরিক আইনের এল আর ক্লোজ-৮ এর অধীনে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

ষাটের দশকের শেষভাগে শ্রীমঙ্গলে এই চার নেতা ছিলেন আন্দোলনের অগ্রসৈনিক। কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করে তাঁরা পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলেছিলেন। ফলে তাঁদের কার্যক্রমে প্রশাসন সবসময়ই চাপের মধ্যে থাকত।

গ্রেফতারের পরদিন শ্রীমঙ্গল পৌরসভা মাঠে ন্যাপের পূর্বনির্ধারিত জনসভা রূপ নেয় প্রতিবাদ সমাবেশে। এতে অংশ নেন তৎকালীন ন্যাপ নেত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এবং ন্যাপের কেন্দ্রীয় নেতা আহমেদুল কবির। তাঁদের জ্বালাময়ী বক্তব্যে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, ন্যাপ ও আওয়ামী লীগের হাজারো নেতাকর্মী এবং সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। টানা আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

পরবর্তীতে এই চার নেতাসহ তাঁদের সহযোদ্ধারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পরও তাঁরা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় থেকে সমাজ ও রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেন।

রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ১৯৪০ সালের ১২ এপ্রিল শ্রীমঙ্গলের নোয়াগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলন, ’৬২ শিক্ষা আন্দোলন, '৬৩ বালিশিরা পাহাড় আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধে তিনি সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তিনি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পাকবাহিনী শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করলে তিনি বাধ্য হয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নেন। সেখানে একটি শরণার্থী ক্যাম্পে সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি ক্যাম্প পরিচালনা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করায় ভারত সরকার তাঁকে সম্মানসূচক সনদ প্রদান করে। স্বাধীনতার পরও তিনি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা ও স্থানীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে তিনি ওই মামলার একমাত্র জীবিত আসামি।

মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া ১৯৩৮ সালে কালাপুর ইউনিয়নের লামুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধতা থাকলেও ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এম এ রহিম ১৯৫৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে '৬৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ছাত্রলীগের থানা কমিটি গঠিত হয়। ১৯৭০ সালের মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর মুক্তি পেয়ে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি দু’বার পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের ১৯ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এস এ মুজিব ছাত্র জীবন থেকে  দীর্ঘদিন  আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে ভূমিকা রাখেন। তিনি ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।তবে স্বাধীনতার পর তাঁদের অবদান যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি—এমন অভিযোগ রয়েছে।

২০১৪ সালে সরকারের আহ্বানে তিন নেতার পক্ষে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতির জন্য অনলাইনে আবেদন করা হয়। কিন্তু স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি, সাবেক কৃষিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদ সদস্য উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এবং কমিটির কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে সংকীর্ণ রাজনৈতিক মনোভাবের অভিযোগ ওঠে। তাঁদের আবেদনের মন্তব্যের ঘরে "মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি" উল্লেখ করে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)-এ পাঠানো হয়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট সবাই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন।

এ অবস্থায় রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী জামুকা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আপিল ও পরবর্তীতে শুনানি না হওয়া তাঁর আবেদনের বিষয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। অন্যদিকে মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া ও এম এ রহিমের পরিবার প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও অনভিজ্ঞতার কারণে আপিলের পথে এগোয়নি। এস এ মুজিবের পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের আহ্বান সম্পর্কে অবগত না থাকায় কোনো আবেদন করা হয়নি বলে জানা যায়।

ইতিহাস বিশ্লেষকদের মতে, শ্রীমঙ্গলের এই ঘটনা শুধু একটি মামলার ইতিহাস নয়; বরং এটি পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত করার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্থানীয় পর্যায়ের এই প্রতিরোধ ও সংগঠিত আন্দোলনই পরবর্তীতে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামকে বেগবান করে তোলে—যার পূর্ণতা আসে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতায়।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

হবিগঞ্জে জমির বিরোধ নিয়ে সংঘর্ষে কলেজ ছাত্র নিহত, আহত অন্তত ২০

প্রকাশিত :  ১১:৩৭, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলাস্থ বেগমপুর গ্রামে সরকারী জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মঞ্জুর মিয়া (২৩) নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।

নিহত মঞ্জুর মিয়া ওই গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে এবং নবীগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র।

রবিবার (১৯ এপ্রিল) সকালে উপজেলার করগাঁও ইউনিয়নের বেগমপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৃত আব্দুল হাসিমের ছেলে খলিলুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে সরকারী জমিতে বসবাস করে আসছিলেন। একই গ্রামের হেলাল মিয়া ও মনিরুজ্জামান ওই জমি নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় রবিবার সকালে হেলাল ও মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জমি দখলের চেষ্টা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষে মঞ্জুর মিয়াসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। আহতদের নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মঞ্জুর মিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন সাফি মিয়া (৩২), মুজিবুর রহমান (৩২), শামিম মিয়া (৫০), মামুন মিয়া (৩১), জুনেদ মিয়া (২৮), রুহেল মিয়া (৩৮), ইমন মিয়া (১৭), কাউছার মিয়া (২২), জুয়েল আহমেদ (৩২)সহ আরও অনেকে। বাকিরা বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিয়েছেন।

খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

নিহতের বাবা খলিলুর রহমান অভিযোগ করেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে তারা ওই জমিতে বসবাস করে আসছেন। প্রতিপক্ষ জোরপূর্বক উচ্ছেদের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল এবং ঘটনার দিন ভাড়াটিয়া লোকজন নিয়ে হামলা চালিয়ে তার ছেলেকে হত্যা করা হয়।

এ বিষয়ে থানার ওসি (তদন্ত) দুলাল মিয়া জানান, সরকারী জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর