পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে সংস্কার কার্যক্রম চলছে : অর্থমন্ত্রী
প্রকাশিত :
১৪:০৮, ০৯ জুন ২০২৬
দেশীয় মূলধন সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্কারের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মঙ্গলবার (৯ জুন) সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে কুড়িগ্রাম-২ আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এর কার্যকর অবদান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।’
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বীকার করেন যে বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজার দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
বাজারের বিকাশ ও সম্প্রসারণে সহায়ক বেশ কয়েকটি আর্থিক পণ্য এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
চলমান উদ্যোগের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, বাজার তদারকি ও কার্যকারিতা বাড়াতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হয়েছে।
কমিশনে অভিজ্ঞ ও দক্ষ পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পায়।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আশা প্রকাশ করেন, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও চলমান সংস্কার কার্যক্রমের ফলে আগামী দিনে পুঁজিবাজারে নতুন গতি সঞ্চার হবে এবং এর মাধ্যমে জনগণের সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তরের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পুঁজিবাজারকে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য অর্থায়নের উৎস হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
আগামীকালও ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকার জোরালো পূর্বাভাস, বাজেট ও সংস্কারের নতুন সমীকরণ
প্রকাশিত :
১৮:৪২, ০৯ জুন ২০২৬
৯ জুন ২০২৬ তারিখে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এক শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, যা পূর্ববর্তী কার্যদিবসের সাময়িক মূল্য সংশোধন পর্বকে পেছনে ফেলে বাজারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ডিএসই-র প্রধান সূচক ডিএসইএক্স (DSEX) এদিন ৩৬.৫ পয়েন্ট বা প্রায় ০.৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫,৫১৯ পয়েন্টে বন্ধ হয়েছে, যা আগের দিনের ৫,৪৮৩ পয়েন্ট থেকে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ১১ জুন ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কর্তৃক ঘোষিত হতে যাওয়া ব্যবসাবান্ধব ও জনকল্যাণমুখী জাতীয় বাজেটের প্রত্যাশা এবং বিএসইসির সাম্প্রতিক যুগান্তকারী সংস্কার পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করেছে। এই শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে আগামীকাল ১০ জুন ২০২৬ তারিখেও পুঁজিবাজারে এই ইতিবাচক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা জোরালোভাবে অব্যাহত থাকবে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
ডিএসইতে ৯ জুনের লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের ১০.৭ বিলিয়ন বা ১,০৭২ কোটি টাকা থেকে প্রায় ২৯.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৩.৯ বিলিয়ন বা ১,৩৮৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই বিশাল তারল্য প্রবাহ প্রমাণ করে যে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলগুলো পুনরায় বাজারে সক্রিয় হচ্ছে। মোট লেনদেন হওয়া ৩৯৬টি সিকিউরিটির মধ্যে ২৪১টির দাম বেড়েছে, ৯৪টির দাম কমেছে এবং ৬১টি অপরিবর্তিত ছিল। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে, যেখানে সামগ্রিক মূল্য সূচক সিএএসপিআই (CASPI) ৩.০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। ৮ জুনের সংশোধন পর্বে যারা মুনাফা তুলে নিয়েছিলেন, তারা এখন প্রাক-বাজেটের ইতিবাচক প্রভাবের কথা মাথায় রেখে পুনরায় বাজারে প্রবেশ করছেন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার দূরদর্শী পদক্ষেপ ও ফ্লোর প্রাইস যুগের অবসান
পুঁজিবাজারে এই নাটকীয় পরিবর্তনের অন্যতম চালিকা শক্তি হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্ব। গত ৪ জুন ২০২৬ তারিখে অভিজ্ঞ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব মাসুদ খান বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সাথে নতুন কমিশনার হিসেবে যোগ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদ মাহতাব, ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাফিজ আল তারিক এবং তানভীর হাবিব রহমান। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর পুঁজিবাজারের জন্য একটি বৈপ্লবিক সংস্কার রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এই সংস্কারের অংশ হিসেবে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আইএএস ৩৪-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে, যা কোম্পানিগুলোর পরিচালন ও কমপ্লায়েন্স ব্যয় বহুলাংশে কমিয়ে দেবে। একই সঙ্গে আইপিও আবেদন, বন্ড ও সুকুক অনুমোদন সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা ‘প্রয়োজন যেখানে নিয়ন্ত্রণ, সম্ভব যেখানে সরলীকরণ’ নীতির বাস্তব প্রতিফলন।
পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটানোর অন্যতম বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিএসইসি গত ৮ জুন বেক্সিমকো লিমিটেড (যার পূর্ববর্তী ফ্লোর প্রাইস ছিল ১১০.১০ টাকা) এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-র (যার পূর্ববর্তী ফ্লোর প্রাইস ছিল ৩২.৬০ টাকা) ওপর আরোপিত দীর্ঘস্থায়ী ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেয়, যা ৯ জুন থেকে কার্যকর হয়। যদিও ৯ জুন লেনদেনের শুরুতেই এই দুই হেভিওয়েট শেয়ারের দাম কমে লোয়ার সার্কিট স্পর্শ করে (বেক্সিমকো ৯৯.১ টাকা এবং ইসলামী ব্যাংক ২৯.৪ টাকা), সামগ্রিক বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বরং বিনিয়োগকারীরা এই সিদ্ধান্তকে পুঁজিবাজার স্বাভাবিকীকরণ এবং অবাধ দর আবিষ্কারের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন যে, এটি ফরেক্স ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের নেতিবাচক মনোভাব দূর করবে এবং মার্জিন ঋণগ্রহীতাদের নেতিবাচক ইকুইটির ঝুঁকি কমাবে। কৃত্রিম মূল্য নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটায় দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এখন বাজারে পুনঃপ্রবেশে আরও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন এবং এর ফলে আগামীকাল ১০ জুন থেকে বাজারে তারল্যের প্রবাহ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
খাতভিত্তিক লেনদেন ও কারিগরি নির্দেশকের বুলিশ বার্তা
খাতভিত্তিক লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ বীমা খাত ৯ জুনের মোট লেনদেনের ২৪.৪ শতাংশ দখল করে শীর্ষে ছিল, যার পরেই ছিল প্রকৌশল খাত (১১.৮ শতাংশ) এবং ওষুধ খাত (৯.৪ শতাংশ)। খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল সেবা খাত (৪.৪ শতাংশ) ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান (৩.১ শতাংশ)। কারিগরি নির্দেশকের দিকে তাকালে দেখা যায়, পুঁজিবাজারের বেশ কিছু প্রথম সারির কোম্পানি এখন শক্তিশালী বুলিশ জোনে প্রবেশ করেছে। যেমন—লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি (LHB) এবং সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেড (SAPORTL)-এর ২০ দিনের মুভিং এভারেজ ও ইএমএ ২০ নির্দেশকগুলো অত্যন্ত বুলিশ অবস্থানে রয়েছে। সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টের শেয়ারপ্রতি নিট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো (এনওসিএফপিএস) ২.৪৫ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩.৮৪ টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা এর শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ তারল্য নির্দেশ করে।
ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড এবং প্রভাতী ইন্স্যুরেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানিগুলোর মূল স্তরের নির্দেশকগুলোও ইতিবাচক প্রবণতা দেখাচ্ছে, যা আগামীকালের বাজারে শেয়ারগুলোর দর ধরে রাখতে সাহায্য করবে। ওষুধ খাতের জায়ান্ট স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড পূর্ববর্তী আর্থ-সামাজিক অস্থিরতা কাটিয়ে শক্তিশালী রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং ৯ জুন ২১৪.৪ টাকায় লেনদেন সম্পন্ন করে একটি ব্রেকআউটের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি ও বিনিয়োগকারীবান্ধব বাজেট রূপরেখা
সামষ্টিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটও পুঁজিবাজারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ঋণ ও অতিরিক্ত অর্থ ছাপানোর প্রবণতা থেকে সরে এসে একটি বিনিয়োগভিত্তিক প্রবৃদ্ধি মডেল অনুসরণ করা হবে। এনবিআরের সঙ্গে যৌথভাবে ‘লিস্টেড কোম্পানি অ্যাডভান্টেজ প্রোগ্রাম’ চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য বিশেষ কর ছাড় ও দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যাক্ট ২০২৬ এবং আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর আওতায় আমানতকারীদের সুরক্ষার সীমা ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। এই নীতিগত পদক্ষেপগুলো পুঁজিবাজারে তারল্যের অন্যতম উৎস ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে।
রাজনৈতিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্কারের সমন্বয় পুঁজিবাজারকে একটি আঞ্চলিক পাওয়ার হাউসে রূপান্তর করার সরকারের যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে, তার প্রথম ধাপ হিসেবে এই বাজেটটিকে দেখা হচ্ছে। ব্যবসার পরিবেশ সহজীকরণ ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এক জায়গায় নিয়ে আসার জন্য যে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে। এর প্রত্যক্ষ সুবিধা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত উৎপাদনশীল ও সেবা খাতের কোম্পানিগুলো পাবে।
আগামীকালের বাজার পূর্বাভাস ও শেষকথা
সামগ্রিক আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, পুঁজিবাজার এখন একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক ধারায় ফিরে এসেছে, যেখানে কোনো কৃত্রিম হস্তক্ষেপ ছাড়াই বিনিয়োগকারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন। সংস্কারের ইতিবাচক রূপরেখা, নতুন কর প্রণোদনার প্রত্যাশা এবং ফ্লোর প্রাইসের অবসান বাজারকে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আগামীকালের (১০ জুন) লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রাক-বাজেটের বিনিয়োগকারীদের আক্রমণাত্মক ক্রয় মনোভাব এবং ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারের পুঞ্জিভবন পুঁজিবাজারকে আরও ঊর্ধ্বমুখী রাখবে।
বিএসইসির নতুন কমিশনের সময়োপযোগী পদক্ষেপগুলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে, তার ফলে আগামীকালের বাজারে লেনদেনের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি সাধারণ বিনিয়োগকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সবার জন্যই অত্যন্ত লাভজনক ও ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।