img

শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরে জেলেদের জালে ধরা পড়ল ১২ ফুট দীর্ঘ অজগর, এক ঘণ্টার চেষ্টায় উদ্ধার

প্রকাশিত :  ১১:২৭, ১৫ জুন ২০২৬

শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরে জেলেদের জালে ধরা পড়ল ১২ ফুট দীর্ঘ অজগর, এক ঘণ্টার চেষ্টায় উদ্ধার

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরে মাছ ধরার জালে আটকা পড়েছিল একটি ১২ ফুট দীর্ঘ অজগর সাপ। অপ্রত্যাশিত এই ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে জেলেরা জাল পানিতেই ফেলে নিরাপদ স্থানে সরে যান। পরে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের কর্মীরা প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় অজগরটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন।

সোমবার (১৫ জুন) সকাল ১০টার দিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলার হাইল হাওর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

জানা যায়, হাওরে মাছ ধরার জন্য পাতা জাল তুলতে গেলে জেলের জালে আটকে যায় বিশাল আকৃতির অজগরটি। সাপটি দেখতে পেয়ে জেলেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে সরে যান।

পরে বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছালে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। তারা নিশ্চিত হন, জালে আটকে পড়া প্রাণীটি একটি অজগর সাপ।

এরপর হাওরের পানিতে নেমে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় অজগরটিকে জালের ফাঁদ থেকে জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়। উদ্ধারকারী দল জানায়, সাপটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ফুট এবং ওজন আনুমানিক ১৬ থেকে ১৭ কেজি।

উদ্ধারের পর অজগরটিকে শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে সাপটিকে তার প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হবে।

শ্রীমঙ্গল অঞ্চলটি চারদিকে ঝোপঝাড়, লেক, পাহাড়-টিলা, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও চা-বাগানে ঘেরা এক বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশের অংশ। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন এই এলাকায় বিভিন্ন বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বনভূমি দখল এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্যের সন্ধানে বন্য প্রাণীদের লোকালয়ে চলে আসার ঘটনা বেড়েছে বলে পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত দুই দশকে সংস্থাটি দুই হাজারের বেশি বন্য প্রাণী উদ্ধার করে বন বিভাগের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করেছে।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওর ও আশপাশের জলাভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণে দ্রুত সাড়া ও সমন্বিত উদ্যোগের ফলে এসব প্রাণী নিরাপদে উদ্ধার ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

শ্রীমঙ্গলের সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক গ্রাম নোয়াগাঁও

প্রকাশিত :  ১৪:৫১, ১২ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:৫৩, ১২ জুলাই ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম কেন্দ্র শ্রীমঙ্গল। চা-বাগান, পাহাড়ি টিলা ও বনভূমির জন্য পরিচিত এই অঞ্চল এখন অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও পর্যটনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় শ্রীমঙ্গল কৌশলগতভাবেও দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।

শ্রীমঙ্গল শুধু পর্যটননির্ভর উপজেলা নয়; এটি দেশের অন্যতম চা-শিল্পকেন্দ্র। এখানে প্রায় অর্ধশত চা-শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। পাশাপাশি বিভিন্ন হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামও ধীরে ধীরে শিল্প, বাণিজ্য ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। রাধানগর এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। সাতগাঁও থেকে মৌলভীবাজারের জগন্নাথপুর পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে।

এই ধারাবাহিকতায় শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের নোয়াগাঁও গ্রামও শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

ঐতিহ্য ও নেতৃত্বের ইতিহাস

নোয়াগাঁও শুধু একটি গ্রাম নয়; রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাসেও এর পরিচিতি রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে এলাকাটি রাজনৈতিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত ছিল।

স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা রাখা যতীন্দ্রমোহন দত্ত চৌধুরী ১৯৪৭ সালের পর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে গ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ করেন। তাঁর ছেলে ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরী স্বাধীনতার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আরেক ছেলে সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ১৯৮৩ সালে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে রাস্তা, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।

পরবর্তী সময়েও স্থানীয় নেতৃত্ব অবকাঠামো উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক স্থাপনা নির্মাণ ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিক নেতৃত্ব নোয়াগাঁওয়ের উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছে।

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের প্রসার

বর্তমানে নোয়াগাঁও ধীরে ধীরে একটি আধুনিক অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপ নিচ্ছে। ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের নিকটবর্তী অবস্থান, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ এবং যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা এ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

এলাকায় বিভিন্ন শিল্প ও উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাজারিন মিশন, হেলদি চয়েজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানি, প্রাণ-আরএফএলের মাছের হ্যাচারি, কারিতাস বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বনশিল্প করপোরেশন ও ইস্পাহানি টি কোম্পানি।

এসব প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো নতুন আয়ের সুযোগ পাচ্ছে, যা জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

ভৌগোলিক সুবিধা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

নোয়াগাঁওয়ের অন্যতম বড় শক্তি এর ভৌগোলিক অবস্থান। শ্রীমঙ্গল শহর ও ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের কাছাকাছি হওয়ায় পণ্য পরিবহন সহজ ও দ্রুত।

এ ছাড়া সড়ক, রেল ও নৌপথের সঙ্গে সহজ সংযোগ থাকায় এলাকাটি বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, আশুগঞ্জ নৌবন্দর এবং সিলেট ও ঢাকার বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ সুবিধা ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

চা-অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে চা প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

পর্যটন ও ডিজিটাল সম্ভাবনা

নোয়াগাঁওয়ের আশপাশে রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, বাইক্কা বিল ও বিভিন্ন চা-বাগান। ফলে পর্যটননির্ভর ব্যবসারও সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ ফ্রিল্যান্সিং, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তিনির্ভর কাজে যুক্ত হচ্ছেন। ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সুবিধা বাড়ায় ই-কমার্স ও ডিজিটাল ব্যবসার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে নোয়াগাঁও পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক গ্রামে পরিণত হতে পারে।

সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে পর্যটনভিত্তিক হোটেল ও রিসোর্ট, হস্তশিল্প, চা প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ, ডিজিটাল ব্যবসা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

স্থানীয় উদ্যোক্তারা মনে করছেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যোগাযোগব্যবস্থা ও শিল্পায়নের সুযোগ মিলিয়ে নোয়াগাঁও ভবিষ্যতে শ্রীমঙ্গলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর