img

জরিমানা বাড়ছে, কমছে ন্যায়বিচার: পুঁজিবাজারে শাস্তি নাকি কেবলই আইওয়াশ?

প্রকাশিত :  ১২:৩২, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

জরিমানা বাড়ছে, কমছে ন্যায়বিচার: পুঁজিবাজারে শাস্তি নাকি কেবলই আইওয়াশ?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

পুঁজিবাজারের প্রাণের স্পন্দন হলো ‘আস্থা’। সূচকের ওঠানামা কেবল গাণিতিক হিসাব নয়, বরং এর সঙ্গে মিশে থাকে লাখো মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাস। সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধারাবাহিক জরিমানা ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে একটি অস্বস্তিকর বিতর্ক দানা বাঁধছে—এই কঠোরতা কি সত্যিই সাধারণ বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা দিচ্ছে, নাকি তাদের ক্ষতির বোঝা আরও ভারী করছে?

প্রশ্নটি সরল মনে হলেও এর গভীরে নিহিত রয়েছে আমাদের বাজার ব্যবস্থার এক মৌলিক সংকট। নিয়ম অনুযায়ী কোনো কোম্পানি বা ব্যক্তিকে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হলে সেই অর্থ সরাসরি জমা হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে অনিয়মের কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারালেন, সেই ক্ষতিপূরণের গন্তব্য কোথায়? বাস্তবতা হলো, অপরাধীর দণ্ড হলেও ভুক্তভোগীরা থেকে যান অন্ধকারেই। উপরন্তু, জরিমানার খবর বাজারে আসার পর সংশ্লিষ্ট শেয়ারের দরে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তাতে বিনিয়োগকারীরা উল্টো ‘দ্বিমুখী’ ক্ষতির শিকার হন—প্রথমে কারসাজির আঘাত, পরে শাস্তির প্রতিক্রিয়ায় দরপতন।

এখানেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতিগত দর্শনের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সংঘাত তৈরি হয়। শৃঙ্খলার নামে নেওয়া পদক্ষেপ যদি শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীকেই আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেয়, তবে সেই শাস্তির সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। পুঁজিবাজারে ন্যায়বিচার কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্তের ক্ষতি লাঘবের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া উচিত। শাস্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন তা ভুক্তভোগীর মনে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন ঘটায়।

তবে কি জরিমানা প্রথা বাতিলযোগ্য? অবশ্যই নয়। কিন্তু এর প্রায়োগিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। জরিমানার অর্থের একটি বড় অংশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিতরণের একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল ন্যায্যতার অনুভূতিই জাগাবে না, বরং বাজারে তলানিতে ঠেকে যাওয়া আস্থাও পুনরুদ্ধার করবে।

পাশাপাশি, যারা কারসাজির মাধ্যমে অস্বাভাবিক মুনাফা লুটে নেয়, তাদের ক্ষেত্রে কেবল অর্থদণ্ড যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে বাধ্যতামূলকভাবে উচ্চহারে লভ্যাংশ প্রদানে বাধ্য করার বিধান চালু করা যেতে পারে। এতে অবৈধ পথে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ প্রকৃত অংশীদারদের কাছে পৌঁছাবে—যা হবে প্রকৃত ‘আর্থিক ন্যায়বিচার’।

শাস্তির চেয়েও জরুরি হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। শক্তিশালী ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘসূত্রিতাহীন দ্রুত তদন্ত—এই তিনটি স্তম্ভ মজবুত থাকলে অনিয়মের সুযোগ কমে আসে। অপরাধ হওয়ার পর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির চেয়ে অপরাধ সংঘটিত হতে না দেওয়াটাই বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য শ্রেয়।

পরিশেষে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে মনে রাখতে হবে তাদের পরিচয় কেবল ‘শাস্তিদাতা’ হিসেবে নয়, বরং ‘বাজার অভিভাবক’ হিসেবে। আর সেই অভিভাবকত্বের সার্থকতা নির্ভর করে সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষার ওপর। জরিমানার অঙ্ক দিয়ে সংবাদপত্রের শিরোনাম হওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তের হাতে সেই সুফল না পৌঁছালে তা কেবল একটি পরিসংখ্যান হয়েই থেকে যায়।

এখন মূল প্রশ্নটি হলো—আমরা কি সত্যিই বাজারে সুশাসন আনছি, নাকি কেবল জরিমানার খতিয়ান বাড়িয়ে দায়িত্ব শেষ করছি? পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা এই প্রশ্নের সৎ ও কার্যকর উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে।

img

মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর

প্রকাশিত :  ১৫:২৬, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ করে সাময়িক স্বস্তি আনার নীতি থেকে সরে এসে এখন স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনীতির ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।

আজ শনিবার (২৫ এপ্রিল) অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিউজ কাভার করা সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে মুদ্রা সরবরাহ সীমিত রাখা জরুরি। অতীতে টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার কারণে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে, যা সুদের হার বাড়িয়েছে এবং বেসরকারি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

তিনি বলেন, আমরা এমন একটি নীতিতে আছি, যেখানে হাই পাওয়ার মানি বাড়িয়ে বাজারে অতিরিক্ত তারল্য তৈরি করা হবে না। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হয়।

তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, অতীতে পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতির কারণে দেশের অর্থনীতি কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের অর্থনীতি অলিগার্কদের হাতে চলে গিয়েছিল। এতে অর্থনীতি রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে পড়ে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতেই সরকার ‘ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি’ বা অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের ওপর জোর দিচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির সুফল যাতে সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে লক্ষ্যেই বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের সরাসরি ক্ষমতায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরিবারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় নারীরাই সবচেয়ে দক্ষ, তাই তাদের হাতে অর্থ পৌঁছালে তা সাশ্রয় ও বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী বলেন, আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার বেশি হলে পরিবারের জীবনমান কমে যায়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারলে মানুষের আয় কার্যত বেড়ে যায়।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং স্টার্টআপ খাত অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় এমপ্লয়ার হচ্ছে এসএমই খাত। এ খাতের পাশাপাশি গ্রামীণ কুটিরশিল্প, কারিগর ও সৃজনশীল শিল্প (ক্রিয়েটিভ ইকোনমি) অর্থনীতির মূলধারায় আনতে সরকার কাজ করছে।

অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলার অভাব, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘আন্ডার পারফর্ম’ করছে। এছাড়া বিনিয়োগ বাড়াতে ডিরেগুলেশন প্রয়োজন। ব্যবসা করতে এত বাধা থাকলে বিনিয়োগ আসবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। 

অর্থনীতি এর আরও খবর