img

চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ, উদ্বিগ্ন ভারত

প্রকাশিত :  ০৬:১২, ২০ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:৪৮, ২০ জুন ২০২৬

চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ, উদ্বিগ্ন ভারত

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে চীনের তৈরি ২০টি জে-১০সিই (J-10CE) মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে নয়াদিল্লি শুধু একটি সামরিক ক্রয় হিসেবে দেখছে না; বরং ভারতের চারপাশে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি ও ‘কৌশলগত ঘেরাও’ নীতির অংশ হিসেবেই বিবেচনা করছে।

এ নিয়ে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আলোচনাকে গতিশীল করে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও এই প্রতিরক্ষা নীতি সচল রেখেছে। এই চুক্তি ঢাকা ও বেইজিংয়ের সামরিক সম্পর্ককে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, যা ভারতের পূর্ব সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর অংশ হিসেবে এই চুক্তিটি করা হচ্ছে। বিমান বাহিনীর বর্তমান বহরে থাকা পুরোনো এফ-৭ এবং সীমিত সংখ্যক মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান পরিবর্তন করে আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করতে এই আধুনিক ফাইটার জেটগুলো অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।

প্রায় ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই চুক্তিটির অর্থ আগামী ১০ বছরের সহজ কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে। এর ফলে জাতীয় রাজস্বের ওপর তাৎক্ষণিক কোনো বড় চাপ ছাড়াই বাংলাদেশ তার সামরিক বাহিনীকে আধুনিক করার সুযোগ পাচ্ছে। ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে ফাইটার জেটগুলো বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এই প্যাকেজের আওতায় শুধু যুদ্ধবিমানই নয়, বরং লজিস্টিকস, পাইলট ও ক্রু ট্রেনিং, দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নত যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করবে চীন, যা দুই দেশের সামরিক নির্ভরতাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে।

বাংলাদেশের এই সামরিক আধুনিকায়ন ভারতের প্রতিরক্ষা মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করেছে সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর, যা সামরিক পরিভাষায় ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত। ভারতের সামরিক পরিকল্পনাবিদদের আশঙ্কা, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় বিমান ঘাঁটিগুলোতে এই আধুনিক চীনা ফাইটার জেট মোতায়েন করা হলে তা শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তার জন্য বড় মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করবে। ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান ইতিপূর্বেই চীন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে সম্ভাব্য ‘স্বার্থের মিলন’ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, যা ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা নীতিকে নতুন করে সাজাতে বাধ্য করছে।

জে-১০সিই ও ‘অপারেশন সিন্দুর’ 

জে-১০সিই মূলত একটি ৪.৫ প্রজন্মের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত সংক্ষিপ্ত আকাশযুদ্ধ ‘অপারেশন সিন্দুর’-এ পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর জে-১০সি ফাইটার জেটের দুর্দান্ত কার্যকারিতা প্রদর্শনের পর এই বিমানের প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ, বিশেষ করে বাংলাদেশের আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়।

এই ফাইটার জেটটি অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে রাডারে সজ্জিত, যা একসাথে একাধিক লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করতে পারে এবং শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া বিমানটি চীনের তৈরি দূরপাল্লার বিয়ন্ড-ভিজ্যুয়াল-রেঞ্জ এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল ‘পিএল-১৫’ ছুঁড়তে সক্ষম, যা যেকোনো আধুনিক পশ্চিমা বা রুশ বিমানকে আকাশযুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। উন্নত ডেটা লিংক এবং এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের মাধ্যমে এটি যুদ্ধক্ষেত্রে নিখুঁত নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক সমন্বয় তৈরি করতে সক্ষম।

বেইজিংয়ের প্রভাব ও ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক টানাপোড়েন

বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের ৭০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করে চীন। সাবমেরিন, ট্যাংক, মিসাইল সিস্টেম এবং যুদ্ধজাহাজের পর এবার অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সরবরাহের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ইকোসিস্টেমে চীনের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা এসেছে।

ট্রানজিট, বাণিজ্য, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোতে যখন দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই চীনের সাথে এই মেগা চুক্তি বেইজিংয়ের প্রতি ঢাকার কৌশলগত ঝুঁকে পড়াকেই নির্দেশ করে। যদিও বেইজিংয়ের সাথে এই চুক্তিকে বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে এবং ভারতের বিরুদ্ধে কোনো জোটে শামিল হওয়া এর উদ্দেশ্য নয় বলে মনে করে ঢাকা।

প্রতিযোগিতামূলক নিরাপত্তার নতুন যুগ

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য এবং সীমান্ত সুরক্ষায় পারস্পরিক নির্ভরতা থাকার কারণে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা নেই। তবে সম্পর্কের ধরনটি আগের ‘বিশেষ বন্ধুত্ব’ থেকে বদলে গিয়ে এখন অনেকটাই আনুষ্ঠানিক, সতর্কতামূলক ও দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট রূপ নিতে যাচ্ছে। ২০টি জে-১০সিই ফাইটার জেট ক্রয়ের এই সিদ্ধান্ত কেবল বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং এটি বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের ভূরাজনৈতিক প্রভাবকে আরও দৃশ্যমান করবে। এর ফলে, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন একটি নতুন এবং অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক যুগে পদার্পণ করছে, যেখানে প্রতিটি দেশের সামরিক সিদ্ধান্তই আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে পুনর্নির্ধারণ করছে।


জাতীয় এর আরও খবর

img

এমপি হাসনাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে লন্ডনে মামলা

প্রকাশিত :  ১৮:১৮, ২০ জুন ২০২৬

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) হাসনাত আবদুল্লাহসহ চার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ।

গতকাল শুক্রবার (১৯ জুন) যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থিত কেমব্রিজ থানায় মামলাটি করা হয়।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন, এনসিপি নেতা এহতেশাম হক, জাকির চৌধুরী ও শাহীন আলম। তাদের মধ্যে জাকির চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে গেছে পুলিশ। এ ছাড়াও অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

আজ শনিবার (২০ জুন) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্স।

এতে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগ ও পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের সমর্থকরা হাসনাত আবদুল্লাহ এবং তার সফরসঙ্গীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার ও হয়রানির পর এবার নতুন নাটক শুরু করেছে। তারা হাসনাত আবদুল্লাহ, এহতেশাম হক, জাকির চৌধুরী, শাহীন আলমসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ‘বেধড়ক পেটানোর’ অভিযোগ এনে থানায় মামলা করেছে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্য পুলিশের মূল্যবান সময় নষ্ট করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, জননিরাপত্তা এবং যুক্তরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে যুক্তরাজ্যের একটি বিশেষায়িত সংস্থা তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।

হাসনাত আব্দুল্লাহ যুক্তরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের পেশাদার ও দায়িত্বশীল ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে পতিত আওয়ামী লীগ আগেও ব্যর্থ হয়েছে, এবারও হবে। অক্সফোর্ড ইউনিয়নে হাসনাত আব্দুল্লাহর ঐতিহাসিক বক্তব্য, যুক্তরাজ্য জুড়ে প্রবাসীদের সঙ্গে তার সফল মতবিনিময় এবং সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে তারা বারবার চেষ্টা করলেও প্রতিবারই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।


জাতীয় এর আরও খবর