img

৩০ ঘণ্টা পর পুলিশ পাহারায় ক্যাম্পাস ছাড়লেন চুয়েট উপাচার্য

প্রকাশিত :  ১৪:৩১, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

৩০ ঘণ্টা পর পুলিশ পাহারায় ক্যাম্পাস ছাড়লেন চুয়েট উপাচার্য

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাঁকে প্রশাসনিক ভবন থেকে বের করে আনা হয়। পরে পুলিশি নিরাপত্তায় অ্যাম্বুলেন্সে করে ক্যাম্পাস ছাড়েন উপাচার্য।

তবে চুয়েট ক্যাম্পাস ছাড়ার ক্ষেত্রে উপাচার্যকে একটি শর্ত দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনিক ভবনের নিচে তাকে নামিয়ে আনার পর মাইক হাতে এক শিক্ষার্থী ঘোষণা দেন, ‘ভিসিকে আমরা ক্যাম্পাস থেকে বের হতে দিচ্ছি একটি মাত্র শর্তে, সেটি হলো তিনি আর চুয়েট ক্যাম্পাসে ফিরবেন না।’

এ সময় ওই শিক্ষার্থীর পাশে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার উপস্থিত ছিলেন। পরে পুলিশি নিরাপত্তায় উপাচার্যকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা তাকে লক্ষ্য করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সমকালকে বলেন, আমরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসেছি। তাদের দাবি-দাওয়া শুনেছি। আমরা তাদের আশ্বস্ত করে বলেছি যে- তাদের দাবিগুলো সরকারকে জানাব। পরে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য কার্যালয়ের তালা খুলে দেন। পুলিশি পাহারায় উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমসহ ভেতরে থাকা সবাইকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে নেওয়া হয়। 

কোথায় নেওয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত আমরা তাকে আগে হাসপাতালে নিয়ে যাবো। 

এর আগে বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে চুয়েট ক্যাম্পাসে যান ডিসি জাহিদুল ইসলাম ও এসপি মাসুদ আলম। তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। ডিসি জাহিদুল ও এসপি মাসুদ আলম শিক্ষার্থীদের জানান, আমরা আপনাদের দাবিগুলো সরকারকে জানাব। উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম অসুস্থবোধ করছেন। আমরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাবো। পরে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য কার্যালয়ের তালা খুলে দেন। পুলিশি পাহারায় উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমসহ ভেতরে থাকা সবাই ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যান।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ থাকেন নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। সোমবার দুপুর ১২টার পর শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনে তালা দেওয়ায় তিনি নিজ কার্যালয়ে আটকে পড়েন। তালা দেওয়ার পাশাপাশি উপাচার্য ভবনের পানি ও বিদ্যুতের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করেন শিক্ষার্থীরা। 

গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ২২ সেপ্টেম্বর থেকে অধ্যাপক আবু সাদাতকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ এবং শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘কর্মবিরতি’ পালন করে আসছেন। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই আন্দোলনের কারণে দায়িত্ব গ্রহণের পরও ক্যাম্পাসে আসতে পারছিলেন না নতুন উপাচার্য। তবে গতকাল সোমবার ছাত্রদল নেতাদের নিয়ে উপাচার্য ভবনে শিক্ষার্থীদের দেওয়া তালা ভেঙে নিজ দপ্তরে যান তিনি।

নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে আসার খবরে সকাল সাড়ে নয়টা থেকে শিক্ষার্থীরা তার দপ্তরের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা উপাচার্যকে কার্যালয় ত্যাগ করতে সময়সীমা বেঁধে দেন। তবে নির্ধারিত সময় অতিক্রম করার পর দুপুর ১২টার দিকে তারা উপাচার্য ভবনের ফটকে আবারও তালা ঝুলিয়ে দেন। ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেন তারা।

শিক্ষার্থীরা ভবনে তালা দেওয়ায় উপাচার্যসহ ১০-১১ জন ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদও রয়েছেন। অন্যরা বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী। 



জাতীয় এর আরও খবর

img

বিদ্যুৎ উৎপাদনে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি রূপপুরে

প্রকাশিত :  ১৯:১৮, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ ও ২ নম্বর ইউনিটে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এপিসিএস) স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। চলতি মাসে পারমাণবিক বিক্রিয়া (ক্রিটিক্যালিটি) শুরুর অনুমোদন পাওয়ার পাশাপাশি প্রথম ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত ইউরেনিয়াম প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। এসব অগ্রগতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি আরও এগিয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১ ও ২ নম্বর ইউনিটে এপিসিএস স্থাপনের পর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রূপপুরই রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটমের প্রথম প্রকল্প—যেখানে আধুনিক ‘অপারেটর ইনফরমেশন সাপোর্ট সিস্টেম’ (ওআইএসএস) বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

রোসাটম সূত্রে জানা গেছে, রোসাটম অটোমেটেড কন্ট্রোল সিস্টেমস (রাসু) সরবরাহকৃত এই ব্যবস্থাগুলোতে ৪৩টি সিস্টেমের আওতায় প্রায় ২০ হাজার সরঞ্জাম রয়েছে। এগুলো চুল্লির স্থিতিশীলতাসহ ৭ হাজারেরও বেশি প্রক্রিয়াগত প্যারামিটার পর্যবেক্ষণ করবে, যা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপদ ও দক্ষ পরিচালনায় সহায়তা করবে।

প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ওআইএসএস। বিদ্যুৎ ইউনিটের একটি ‘ডিজিটাল টুইন’ ব্যবহার করে রাসু এই সিস্টেমটি তৈরি করেছে। এটি ইতোমধ্যে ১ নম্বর ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং চালুকরণ কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে। একই ধরনের একটি সিস্টেম ২ নম্বর ইউনিটেও স্থাপন করা হবে।

ওআইএসএস ৩৬০টি প্রক্রিয়াগত সিস্টেম থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করে, বিভিন্ন বিচ্যুতি শনাক্ত করে এবং ৮০টিরও বেশি নির্দেশনার ভিত্তিতে অপারেটরদের প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করে। এসব নির্দেশনার মধ্যে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পদ্ধতিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জটিল পরিচালনাগত তথ্য সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে সিস্টেমটি অপারেটরদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং কার্যকরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সহায়তা করবে।

রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সেই লিখাচেভ বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র শুধু রাশিয়ান ফেডারেশন ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতার সবচেয়ে বড় প্রকল্পই নয়, বরং আধুনিক স্বয়ংক্রিয়করণ ও নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের একটি অগ্রগামী প্রকল্প। বিদেশে নির্মিত রোসাটমের কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এই প্রথম অপারেটর ইনফরমেশন সাপোর্ট সিস্টেম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এই সিস্টেমের মাধ্যমে পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার সময় কমবে, পরিচালন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং কন্ট্রোল রুমের কর্মীরা একটি নির্ভরযোগ্য সহায়ক ব্যবস্থা পাবেন।

রোসাটমের প্রকৌশল বিভাগ অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটিতে তৃতীয় প্রজন্মের প্লাস (জেনারেশন ৩+) প্রযুক্তির দুটি ভিভিইআর-১২০০ (VVER-1200) পারমাণবিক চুল্লি রয়েছে।

এর আগে গত ৮ অক্টোবর দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক বিক্রিয়া (ক্রিটিক্যালিটি) শুরুর অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা)। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের একদম দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেল বাংলাদেশ।

প্রকল্প সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর গাইডলাইন মেনে রাশিয়ার সহযোগিতায় পরিচালিত এই প্রকল্পের ‘বি-ওয়ান’ ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সবশেষ স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভ টেস্টের জটিলতা কেটে যাওয়ার পর শুরু হতে যাচ্ছে ‘বি-টু’ (B-2) ধাপ। এই ‘বি-টু’ ধাপে প্রাথমিক অপারেশনের জন্য পারমাণবিক চুল্লিকে প্রস্তুত করে স্বয়ংসম্পূর্ণ চেইন রিঅ্যাকশন বা পরমাণুর বিভাজন তৈরি করা হবে। চেইন রিঅ্যাকশন সফলভাবে শুরু হলে চুল্লিতে স্থায়ী ও নিরাপদভাবে শক্তি বা বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ শেষে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩০০ মেগাওয়াটে পৌঁছলে রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা হবে।

এরই ধারাবাহিকতায় কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের ইউরেনিয়াম প্রকল্পে পৌঁছানো হয়।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও গাইডলাইন অনুসরণ করে এই পারমাণবিক জ্বালানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিশেষ শেডে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সাধারণত একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর এক থেকে দেড় বছর পর কিছু ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি পরিবর্তন করতে হয়। প্রথম ইউনিটের সেই বাড়তি জ্বালানিই এখন প্রকল্প এলাকায় আনা হয়েছে।

রোসাটম জানিয়েছে, প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট ৯টি চালানে ২০০টিরও বেশি জ্বালানি অ্যাসেম্বলি আনা হচ্ছে, যার সবটির সরবরাহ সম্পন্ন হবে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই। এর আগে ২০২৩ সালে রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের যে জ্বালানি আনা হয়েছিল, তা চলতি বছরের মে মাসে পারমাণবিক চুল্লিতে বসানো হয়েছে।

প্রকল্প সূত্রের দাবি, সেফটি ভালভে ১৬ মেগাপ্যাসকেল (এমপিএ) উচ্চ-চাপ পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ার পরবর্তী ধাপে ১৮ এমপিএ চাপে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে। এটি সফল হওয়ার পর ফিশন রিঅ্যাকশন শুরু করা হবে। এই প্রক্রিয়া শেষে পাওয়ার স্টার্টআপে যেতে পুরো অক্টোবর মাস লেগে যাবে। আর পাওয়ার স্টার্টআপের পরেই গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন এবং স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপনের মধ্য দিয়ে স্বপ্নের রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট ও বাস্তব রূপ নিল।

জাতীয় এর আরও খবর