img

পাতাল মেট্রোরেলের ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল চায় সরকার

প্রকাশিত :  ০৫:১২, ০৬ নভেম্বর ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ০৫:২৩, ০৬ নভেম্বর ২০২৫

পাতাল মেট্রোরেলের ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল চায় সরকার

দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেলের নির্মাণাধীন মোট ১২টি প্যাকেজের মধ্যে দুটি প্যাকেজের নির্মাণকাজের জন্য নিযুক্ত ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করতে চায় সরকার। গত রবি ও সোমবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আওতাধীন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ইস্যু করা দুই চিঠিতে চুক্তি বাতিল চাওয়ার বিষয়টি অবগত করা হয়। বাংলাদেশে অবস্থিত জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রধান কর্মকর্তাকে দেওয়া এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন প্রকল্প পরিচালক মো. আফতাব হোসাইন।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর ডিএমটিসিএলের পরিচালনা পরিষদের ৭১তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এমন চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবে (ডিপিপি) বরাদ্দ করা খরচের চেয়ে অত্যধিক বেশি দর চেয়ে যেসব ঠিকাদারের সঙ্গে নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেসব ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা যেতে পারে। এ বিষয়ে জাইকার অনুমতি চেয়ে চিঠি দেওয়া যেতে পারে। সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে চিঠি দেওয়া হলেও ‘অত্যধিক’ ব্যয় বলতে মূল বরাদ্দের কত শতাংশ বেশি দর হতে হবে, সেটি স্পষ্ট করা হয়নি।

চুক্তি বাতিলের অনুমতি চেয়ে জাইকাকে দেওয়া ডিএমটিসিলের চিঠিতে বলা হয়, প্যাকেজ অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ ডিএমটিসিলের বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিযুক্ত ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করতে চাই। জাইকার নির্দেশিকা এবং ঋণ চুক্তির ধারাগুলো অনুসরণ করে চুক্তি বাতিলের বিষয়ে সম্মতি জানাতে অনুরোধ করা হচ্ছে। এটি ডিপিপির নির্ধারিত প্যাকেজ মূল্যের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দর বলে গণ্য হওয়ায় বাতিল করার প্রয়োজন হয়েছে।

বাতিল করতে চাওয়া দুই প্যাকেজের একটি সিপি-২। এই অংশে ডিপোর অবকাঠামো ও ভবন নির্মাণের কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ ঠিকাদার চীনের সিনোহাইড্রো। প্রতিষ্ঠানটি সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজ পায়। আরেকটি প্যাকেজ সিপি-৫। এই সঙ্গে টানেল এবং স্টেশন নির্মাণ (নর্দা স্টেশন থেকে ট্রানজিশন হয়ে নতুন বাজার স্টেশন পর্যন্ত) কাজের জন্য চুক্তি হয়। এতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে জাপানি প্রতিষ্ঠান কাজিমা করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢালাওভাবে চুক্তি বাতিলের বিষয়টি বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভাবমূর্তির সংকটে ফেলবে। যদি ঠিকাদার বেশি দর চায়, তাহলে কেন চায়, কত বেশি চায়, কতটুকু বেশি হলে সেটি অযৌক্তিক হবে—এসব আগে নির্ধারণ করতে হবে। আর ২০১৯ সালে হওয়া ডিপিপির সঙ্গে ২০২৪ সালে হওয়া চুক্তির শতভাগ মিল চাওয়াটা অন্যায়। এ সময়ের মধ্যে দর বাড়বে—এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু কতটুকু বাড়ানো যায়, তা আলোচনা করে নেওয়া যেতে পারে।

জানতে চাইলে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুখ আহামেদ বলেন, ‘একটি নেগোশিয়েশনের (আলোচনা) পথ তৈরি করতেই এই চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমরা তাদের বাতিল করেই দেব, বিষয়টি এমন নয়। নেগোশিয়েশন করে যদি ব্যয় কমে, তাহলে তারাই কাজ করবে। আর তারা ব্যয় কমাতে না চাইলে রি-টেন্ডারিংয়ে (পুনঃদরপত্র) যাব। অতিরিক্ত ব্যয়ে আমাদের কাজ করা সম্ভব নয়।’

অতিরিক্ত ব্যয় বলতে কী বোঝানো হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালের যে দর সেটা ২০২৪ সালে এসে ঠিক থাকবে না, এটা স্বাভাবিক। বাজারদর, মূল্যস্ফীতি, ডলারের সঙ্গে টাকার মানের পার্থক্য—সব কিছু বিবেচনা করে মূল দরের ৩০ শতাংশ বেশি পর্যন্ত দরকে স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এর বেশি হলে সেটিকে বেশি বলব। আর ৫০ শতাংশের বেশি হলে অতিরিক্ত। তবে এই দুই প্রতিষ্ঠান কত বেশি চেয়েছে, তা এ মুহূর্তে মনে নেই।’

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাতাল মেট্রোরেলের অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়। মূলত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ডিপো তৈরির উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এই কাজের সূচনা হয়েছিল। কথা ছিল, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হবে। এরপর যাত্রী নিয়ে কাঞ্চন থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ছুটবে এই মেট্রো ট্রেন। কিন্তু বাস্তবে গত এক বছরে মেট্রোরেল নির্মাণকাজে কোনো অগ্রগতি নেই। এখনো সব কাজের চুক্তি সম্পন্ন করতে পারেনি সরকার। এরই মধ্যে নতুন করে দর কষাকষি করতে দিয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করতে চাচ্ছে সরকার। আর সরকারি নথিতেও স্বীকার করা হয়েছে যে, কাজ সংকুচিত হচ্ছে।

নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। সূত্র জানায়, আগের সরকারের করা কিছু চুক্তি নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সংশয়ে রয়েছে। এ কারণে ঠিকাদার নিয়োগ হলেও চূড়ান্ত চুক্তি হচ্ছে না। ফলে কাজও এগোচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ চায়, সব প্যাকেজের চুক্তি শেষ করে একসঙ্গে নির্মাণকাজ শুরু করতে। ব্যয় কমানোর ফয়সালায় প্রয়োজনে জাপানের সঙ্গে ঋণ চুক্তি বাতিলের কথাও ভাবছে সরকার। এ জন্য নতুন অর্থায়নের পথ খোঁজা হচ্ছে।

মেট্রোরেল লাইন-১ ও ৫ (উত্তর ও দক্ষিণ)-এর কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে এবং নিকট ভবিষ্যতে পূর্ণমাত্রায় কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম—এমন মন্তব্য পাওয়া গেছে ডিএমটিসিএলের সর্বশেষ সভার কার্যবিবরণীতে। তাতে বলা হয়েছে, এমআরটি লাইন-১-এর কাজ ২০২৬ সালে এবং লাইন-৫ (উত্তর)-এর কাজ ২০২৮ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ডিপোর ভূমি উন্নয়নসংক্রান্ত প্যাকেজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘ব্যয় কমানোর ধরনটি আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার। যদি ঠিকাদারের সঙ্গে ডিএমটিসিএল আলোচনা করতে চায়, তাহলে চুক্তি বাতিল চেয়ে চিঠি কেন? ব্যয় কমানোর আলোচনা করতে চেয়েই চিঠি দেওয়া যেতে পারে। যদিও ব্যয় পর্যালোচনা করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটি এখনো চূড়ান্ত কোনো মতামত দিয়েছি কি না, সেটি আমার জানা নেই। কমিটির মতামতে কী বলা হচ্ছে এবং কেন বলা হচ্ছে এগুলোও আলোচনায় আনা দরকার। এটি শুধু বিনিয়োগ নেওয়ার দিক থেকে বিবেচনা করলে হবে না। দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক দিকও বিবেচনা করতে হবে। ব্যয় কমানোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ঠিক রাখা জরুরি।’

কাঞ্চন সেতু থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার পথটি মাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১ নামে পরিচিত হবে। এর মধ্যে ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার মাটির নিচ দিয়ে, বাকি ১১ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার উড়ালপথে যাবে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকা দেবে ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি ৩২ লাখ এবং সরকার দেবে ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা। প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। তখন বিস্তারিত জরিপ, নকশা এবং ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা হয়। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ৯৩ একর জমিতে ডিপো নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কাজ তত্ত্বাবধানে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগও প্রায় চূড়ান্ত। 

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

পুঁজিবাজারে ধস: বিনিয়োগকারীরা কি সরকারের কাছে অপ্রয়োজনীয়?

প্রকাশিত :  ১৪:২১, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৯৭ পয়েন্টের পতন শুধু সূচকের হিসাব নয়, এটি আস্থার সংকেত। নির্বাচিত সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল পরিবর্তনের, এখন সেই প্রত্যাশার জায়গায় জমছে হতাশা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দিকে তাকালে এখন একটি দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। সংখ্যাগুলো নিচের দিকে যাচ্ছে, আর মানুষের আস্থা তার চেয়েও দ্রুত কমছে।

ডিএসইএক্সের প্রায় ৯৭ পয়েন্ট পতন হয়তো বাজারের এক দিনের হিসাব। কিন্তু এই পতনের অভিঘাত কেবল একটি সূচকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো পোর্টফোলিও, লাখো মানুষের সঞ্চয় এবং বহু পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

পুঁজিবাজারকে তাই শুধু শেয়ারের দামের ওঠানামার জায়গা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে যে অর্থ প্রবাহিত হয়, তার সঙ্গে মানুষের শ্রম, সঞ্চয়, স্বপ্ন এবং নিরাপত্তা জড়িয়ে থাকে।

এই জায়গাতেই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে।

সরকার কি সত্যিই পুঁজিবাজারের সংকটকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে?

প্রশ্নটি রাজনৈতিকও, অর্থনৈতিকও। কারণ বাজারের প্রতিটি দিনের পতনের জন্য সরকারকে দায়ী করা যায় না। শেয়ারের দাম বাজারের চাহিদা ও সরবরাহ, কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশাসহ বহু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

কিন্তু একটি বাজার দীর্ঘদিন দুর্বল থাকলে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভেঙে পড়লে, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হলে রাষ্ট্র তার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব সূচক কৃত্রিমভাবে ওপরে তুলে রাখা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে নিয়ম কার্যকর, আইন সবার জন্য সমান এবং বিনিয়োগকারীরা জানেন যে তাঁদের অর্থের নিরাপত্তার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সংকট সবচেয়ে গভীর।

প্রত্যাশা ছিল, হতাশা কেন?

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ নতুন আশায় বুক বেঁধেছিলেন।

তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনীতিতে গতি আসবে। ব্যবসা বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং তার প্রভাব পড়বে পুঁজিবাজারেও।

এই প্রত্যাশা অমূলক ছিল না।

একটি শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য কার্যকর পুঁজিবাজার প্রয়োজন। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভালো কোম্পানি বাজারে আসবে, সাধারণ মানুষ বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়বে, এটাই একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক কাঠামো।

কিন্তু বাস্তবতা এখন বিনিয়োগকারীদের অনেককে হতাশ করছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে পুঁজিবাজার রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।

এই ধারণা সত্য কি না, সেটি সরকারেরই পরিষ্কার করা উচিত।

কারণ নীরবতা অনেক সময় সন্দেহকে আরও বড় করে তোলে।

৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষের প্রশ্ন

বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষ পুঁজিবাজারের সঙ্গে যুক্ত। এই সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যান দিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা না গেলেও পুঁজিবাজারের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এই মানুষগুলো কেবল বিনিয়োগকারী নন। তাঁরা বাবা, মা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং তরুণ প্রজন্মের সদস্য।

কারও বিনিয়োগ সন্তানের শিক্ষার জন্য। কারও অবসর জীবনের নিরাপত্তার জন্য। কেউ ব্যবসার লাভের অর্থ বাজারে রেখেছেন। কেউ হয়তো চাকরির পাশাপাশি বছরের পর বছর সামান্য করে সঞ্চয় করেছেন।

একটি শেয়ারের দাম যখন ১০ টাকা কমে যায়, তখন বাজারের পর্দায় সেটি শুধু একটি সংখ্যা।

কিন্তু কোনো পরিবারের কাছে সেই ১০ টাকার পতন হয়তো কয়েক মাসের সঞ্চয়ের সমান।

এই পার্থক্যটি নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন

পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী চাইলে কি এই বাজারের জন্য একটি সমন্বিত সংস্কার উদ্যোগ নিতে পারেন না?

অবশ্যই পারেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়, বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে নিয়ে একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব। বাজার কারসাজি প্রতিরোধ, করপোরেট গভর্ন্যান্স উন্নত করা, মানসম্মত কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদারের জন্য আলাদা লক্ষ্য নির্ধারণ করা সম্ভব।

প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটিও গঠন করা যেতে পারে।

প্রশ্ন হলো, উদ্যোগটি কোথায়?

একটি নির্বাচিত সরকারকে প্রতিটি বাজার পতনের ব্যাখ্যা দিতে হবে না। কিন্তু বাজারের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা এবং আস্থার সংকট নিয়ে একটি নীতিগত অবস্থান জানানো তার দায়িত্ব।

বিনিয়োগকারীরা অন্তত জানতে চান, সরকার সমস্যাটি দেখছে কি না এবং দেখলে কী করতে যাচ্ছে।

অর্থমন্ত্রীর সামনে বড় পরীক্ষা

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুঁজিবাজারের সঙ্গে অপরিচিত নন। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার ইতিহাস রয়েছে।

এই অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর প্রতি প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রীর সামনে শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির হিসাব নেই। রয়েছে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জও।

এখন প্রয়োজন একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ।

কোন সংস্কার আগে হবে? কোনটি পরে? বাজার কারসাজি ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? ভালো কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে কী প্রণোদনা থাকবে? সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি হবে? প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কেন বাড়ছে না?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু বক্তব্যে নয়, কার্যকর নীতির মাধ্যমে দিতে হবে।

অর্থনীতি পরিচালনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আস্থা। আর আস্থা তৈরি হয় কথায় নয়, ধারাবাহিক ফলাফলে।

বিএসইসির সাফল্যের মাপকাঠি কী?

পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এর দায়িত্ব শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে অনিয়মের সুযোগই সীমিত হয়ে আসে।

বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন, বাজারের সুশাসন শক্তিশালী করা এবং মানসম্মত কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

এসব উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে।

কিন্তু বাজার শেষ পর্যন্ত বক্তব্যের মূল্যায়ন করে ফল দিয়ে।

তাহলে প্রশ্ন উঠবে, কারসাজি কি কমেছে? বিনিয়োগকারীদের অভিযোগের নিষ্পত্তি কি দ্রুত হচ্ছে? দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কি দৃশ্যমান? তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুশাসন কি উন্নত হচ্ছে? বাজারে তথ্যের স্বচ্ছতা কি বেড়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তরই বিএসইসির কার্যকারিতার প্রকৃত মাপকাঠি।

বিএসইসির চেয়ারম্যান পরিবর্তনের দাবি উঠতে পারে। দক্ষ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। কিন্তু শুধু চেয়ারম্যান পরিবর্তন করে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হবে না।

প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত বিচার এবং আইনের দৃশ্যমান প্রয়োগ।

সূচক নয়, আস্থা বাঁচাতে হবে

সরকারের একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন।

পুঁজিবাজারের সূচক কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখার দায়িত্ব সরকারের নয়।

সূচক কমবে, বাড়বে। বাজারে ঝুঁকি থাকবে। বিনিয়োগে লাভ যেমন থাকবে, ক্ষতিও থাকবে।

সরকারের দায়িত্ব হলো ন্যায্য খেলার মাঠ তৈরি করা।

কেউ বাজার কারসাজি করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে।

কোনো কোম্পানি ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে তার পরিচালনা পর্ষদকে জবাবদিহি করতে হবে।

কেউ অভ্যন্তরীণ তথ্য ব্যবহার করে অন্যায় সুবিধা নিলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

কোনো দুর্বল কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে ফেললে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সময়মতো ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই মৌলিক নিশ্চয়তাগুলো না থাকলে কোনো বাজার দীর্ঘদিন টেকসই হতে পারে না।

সরকার বিনিয়োগকারীদের লাভের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। কিন্তু ন্যায্য বাজারের নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সংখ্যার পেছনের মানুষগুলো কোথায়?

বাজারের দৈনিক প্রতিবেদনে আমরা বলি, সূচক এত পয়েন্ট কমেছে। বাজার মূলধন এত কোটি টাকা কমেছে। লেনদেন হয়েছে এত টাকা।

কিন্তু সংখ্যার পেছনে থাকা মানুষটির গল্প কোথায়?

একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি হয়তো জীবনের শেষ সঞ্চয় নিয়ে বাজারে এসেছেন।

একজন তরুণ হয়তো ভেবেছেন, বেতনের সামান্য অংশ বিনিয়োগ করে ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন।

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হয়তো ব্যবসার মুনাফা বাজারে রেখেছেন।

তাঁদের প্রত্যেকের কাছে পুঁজিবাজারের অর্থ আলাদা।

কারও কাছে এটি স্বপ্ন। কারও কাছে নিরাপত্তা। কারও কাছে শেষ আশ্রয়।

তাই বাজারের পতনকে কেবল একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে অর্থনীতির মানবিক বাস্তবতাটি হারিয়ে যায়।

এখনই সংস্কারের সময়

সরকার চাইলে বর্তমান সংকটকে একটি সুযোগে পরিণত করতে পারে।

একটি সময়বদ্ধ পুঁজিবাজার সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করা যেতে পারে। বিএসইসির নজরদারি আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। স্টক এক্সচেঞ্জের প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ বাড়ানো যেতে পারে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও করপোরেট গভর্ন্যান্সে কঠোরতা আনা যেতে পারে।

বাজার কারসাজির মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত বিচারব্যবস্থা কার্যকর করা দরকার।

ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার জন্য নীতিগত প্রণোদনা প্রয়োজন।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো দরকার।

আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ শুরু করা জরুরি।

কারণ যে বাজারে বিনিয়োগকারীরা কথা বলার সুযোগ পান না, সেই বাজারে আস্থা স্থায়ী হয় না।

দায় কার?

আজকের পুঁজিবাজারের সব সমস্যার দায় কোনো একজন ব্যক্তির নয়। বর্তমান সংকট দীর্ঘদিনের।

দুর্বল সুশাসন, নীতিগত অসঙ্গতি, বাজার কারসাজির অভিযোগ, মানসম্মত কোম্পানির ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বর্তমান সরকার দায়মুক্ত।

কারণ সরকার পুরোনো সমস্যার উত্তরাধিকার গ্রহণ করার পাশাপাশি সেগুলো সমাধানের দায়িত্বও গ্রহণ করে।

একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা তাই খুব বেশি কিছু নয়।

তাঁরা লাভের নিশ্চয়তা চান না।

তাঁরা শুধু চান, আইন যেন সবার জন্য সমান হয়।

তাঁরা চান, কারসাজি যেন শাস্তি পায়।

তাঁরা চান, ভালো কোম্পানি যেন বাজারে আসে।

তাঁরা চান, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান যেন কার্যকর হয়।

তাঁরা চান, তাঁদের সঞ্চয় যেন নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্ব পায়।

এখন উত্তর দেওয়ার সময়

ডিএসইএক্সের ৯৭ পয়েন্ট পতন একটি দিনের ঘটনা হতে পারে।

কিন্তু আস্থার পতন এক দিনের নয়।

আস্থা তৈরি হতে সময় লাগে। ভাঙতে লাগে খুব অল্প সময়। একটি বাজারে মানুষ একবার বিশ্বাস হারালে তা ফিরিয়ে আনা শুধু অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয় থাকে না, এটি হয়ে ওঠে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার সেই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সরকার চাইলে এখনো পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিষয়টিকে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারে আনতে পারেন। অর্থমন্ত্রী চাইলে একটি স্পষ্ট সংস্কার রোডম্যাপ দিতে পারেন। বিএসইসি চাইলে কঠোর ও দৃশ্যমান প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারে।

কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সিদ্ধান্ত।

প্রয়োজন সমন্বয়।

প্রয়োজন জবাবদিহি।

সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

বিনিয়োগকারীরা এখন আর শুধু সূচকের দিকে তাকিয়ে নেই। তাঁরা তাকিয়ে আছেন রাষ্ট্রের দিকে।

তাঁদের প্রশ্ন, এই বাজার কি সরকারের কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ?

তাঁদের আরেকটি প্রশ্ন, তাঁদের সঞ্চয়, তাঁদের উদ্বেগ, তাঁদের ক্ষতি এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ কি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিতে কোনো বাস্তব মূল্য বহন করে?

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল একটি বিবৃতি দিয়ে দেওয়া যাবে না।

উত্তর দিতে হবে কার্যকর সংস্কারে।

উত্তর দিতে হবে আইনের প্রয়োগে।

উত্তর দিতে হবে দৃশ্যমান জবাবদিহিতে।

কারণ পুঁজিবাজারের সূচক আবার উঠবে। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ভালো কোম্পানি নতুন করে বাজারে আসতে পারে।

কিন্তু মানুষের আস্থা যদি একবার পুরোপুরি হারিয়ে যায়, তখন শুধু সূচক বাড়িয়ে সেই ক্ষত পূরণ করা যায় না।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সামনে তাই আজ সবচেয়ে বড় লড়াই পতন ঠেকানোর নয়।

আস্থা ফিরিয়ে আনার লড়াই।

আর সেই লড়াইয়ে সরকার যদি নীরব থাকে, ইতিহাসের প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়ে উঠবে:

যখন বিনিয়োগকারীরা রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তখন রাষ্ট্র তাঁদের জন্য কী করেছিল?