img

শিশু নিরাপত্তায় বাংলাদেশ: ২০২৫ সালের মার্চে অগ্রগতি নাকি পিছিয়ে পড়া?

প্রকাশিত :  ০৮:৪৭, ১৪ মার্চ ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৫০, ১৪ মার্চ ২০২৫

সাইবার অপরাধ, শিশু পাচার ও যৌন নির্যাতনের মাত্রা বেড়েই চলেছে; আইন বাস্তবায়নে নিষ্ক্রিয়তা

শিশু নিরাপত্তায় বাংলাদেশ: ২০২৫ সালের মার্চে অগ্রগতি নাকি পিছিয়ে পড়া?

ঢাকা, ১৪ মার্চ ২০২৫— বাংলাদেশে শিশু নিরাপত্তার চিত্র উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশু অধিকার ফোরামের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৫৬৭টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৪২টি যৌন নিপীড়ন ও ৩৮টি হত্যাকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের তথ্যমতে, এই সময়ে ২১৭টি সাইবার অপরাধের শিকার হয়েছেন ৮ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুরা।  

ঘটনার প্রেক্ষাপট: বাস্তব উদাহরণ  

গত ফেব্রুয়ারিতে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলায় ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে অপহরণের পর ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। স্থানীয় দুই যুবককে অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে। শিশুটির পরিবার জানায়, পুলিশের গাফিলতির কারণে ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পর অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়। এদিকে, গাজীপুরের শ্রীপুরে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ফেসবুকের মাধ্যমে প্রলুব্ধ করে ব্যক্তিগত ছবি চাওয়ার অভিযোগে এক যুবককে র্যাব আটক করেছে। শিশুটির মা বলেন, "মেয়েটি এখন স্কুলে যেতে ভয় পায়। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।"  

পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা  

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী:  

- ২০২৪ সালে শিশু নির্যাতনের মোট ঘটনা ছিল ৬,৮৯২টি (যৌন নির্যাতন ১,৭২৩টি, হত্যা ৪৯৩টি)।  

- ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে সাইবার অপরাধের ঘটনা ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ।  

- ইউনিসেফের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪৮% শিশু অনলাইনে হয়রানির শিকার হয় এবং ৬২% অভিভাবক ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে অজ্ঞ।  

আইনি কাঠামো ও বাস্তবতা  

বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য শিশু আইন ২০১৩, *ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০১৮ এবং জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ কার্যকর রয়েছে। তবে আইনের প্রয়োগে ধীরগতি ও দুর্নীতি প্রধান বাধা। শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে নথিভুক্ত শিশু নির্যাতন মামলার ৭২% এখনো বিচারাধীন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেনের মতে, "শিশুবান্ধব আদালতের অভাব এবং সাক্ষী সুরক্ষা নীতির দুর্বল বাস্তবায়ন অপরাধীদের উৎসাহিত করছে।"

সরকারি উদ্যোগ: অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা

শিশু সুরক্ষায় সরকারের উল্লেখযোগ্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে:  

- জাতীয় শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮: ২০২৪ সালে এই সেবার মাধ্যমে ১২,৩৪৫টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।  

- সাইবার সিকিউরিটি সচেতনতা কর্মসূচি: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীন স্কুল-কলেজে ২ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।  

- শিশুবান্ধব থানা: দেশের ৬৪টি জেলায় ১০০টি থানায় শিশু সুরক্ষা ডেস্ক চালু করা হয়েছে।  

তবে শিশু অধিকার কর্মী ও গবেষকরা মনে করেন, প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও তদারকির অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের নির্বাহী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, "২০২৩ সালে শিশু সুরক্ষায় বরাদ্দকৃত বাজেটের ৪৫% ব্যয় করা হয়নি। অথচ, শিশু পাচার রোধে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অনেক থানায় কেনা হয়নি।" 

সাইবার অপরাধ: নতুন চ্যালেঞ্জ  

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুর সংখ্যা ৩.৮ কোটি ছাড়িয়েছে। কিন্তু পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সক্ষমতা সীমিত। ইউনিটের প্রধান ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি) মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, "প্রতিদিন গড়ে ৫০টি সাইবার অপরাধের অভিযোগ আসে, কিন্তু জনবল ও প্রযুক্তির অভাবে তা সামলানো কঠিন।"  

শিশু পাচার: স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রের জাল  

বাংলাদেশ থেকে শিশু পাচারের ঘটনায় ভারত, মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের (বিএইচআরসি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে ২৮৭টি শিশু পাচারের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬৮% উত্তরবঙ্গের দরিদ্র অঞ্চল থেকে। কুড়িগ্রামের একটি গ্রামের স্থানীয় কর্মকর্তা বলেন, "দুর্ভিক্ষ ও বেকারত্বের সুযোগে পাচারকারীরা শিশুদের প্রলোভন দেখায়। অনেক পরিবার ১০ হাজার টাকার লোভে সন্তানকে হাতছাড়া করে দেয়।"  

প্রস্তাবিত সমাধান: জরুরি পদক্ষেপ  

 ১. আইনি সংস্কার:  

   - শিশু আইন ২০১৩-এ সাইবার অপরাধের জন্য পৃথক ধারা সংযোজন।  

   - শিশু নির্যাতন মামলার নিষ্পত্তির সময়সীমা ১৮০ দিনে সীমাবদ্ধ করা।  

 ২. প্রযুক্তিগত উন্নয়ন:  

   - প্রতিটি জেলায় সাইবার ল্যাব স্থাপন এবং এআইভিত্তিক মনিটরিং সিস্টেম চালু করা।  

   - স্কুলে বাধ্যতামূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা কারিকুলাম চালু করা।  

 ৩. সামাজিক সচেতনতা:  

   - স্থানীয় সরকার পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কমিটি জোরদার করা।  

   - মসজিদ, মন্দির ও গণমাধ্যমে শিশু অধিকার বিষয়ক প্রচারণা চালানো।  

 ৪. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা:  

   - ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমন্বয় করে শিশু পাচারবিরোধী অভিযান তীব্র করা।  

২০২৫ সালের মার্চে দাঁড়িয়েও বাংলাদেশের শিশুরা নিরাপদ নয়—এটি এক বাস্তবতা। সরকারি নীতিমালা, আইন ও প্রকল্প কাগজে-কলমে সীমিত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি বাড়বে। শিশু সুরক্ষার দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়, সমাজ ও পরিবারেরও। এখনই জরুরি পদক্ষেপ না নিলে শিশুদের কলকাকলিতে ভরপুর একটি দেশের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।  


তথ্যসূত্র:  

- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), ২০২৪  

- আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন  

- বাংলাদেশ পুলিশ সাইবার ক্রাইম ইউনিট, মার্চ ২০২৫  

- ইউনিসেফ বাংলাদেশ, "ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড চিলড্রেনস সেইফটি", ২০২৩  

- শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার  


দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত পরিসংখ্যান ও তথ্য সরকারি ও স্বীকৃত বেসরকারি সংস্থার প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার বাস্তব নাম উল্লেখ করা হয়নি গোপনীয়তা রক্ষার জন্য।

জাতীয় এর আরও খবর

img

দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই যেকোনো চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

প্রকাশিত :  ১৪:২০, ২৩ মে ২০২৬

দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।

আজ  শনিবার (২৩ মে) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও মরক্কো সফর নিয়ে এক বিফ্রিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। 

প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একক সিদ্ধান্ত নয়, সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ সফরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মাইগ্রেশন, রোহিঙ্গা সংকট, ব্যাবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

প্রতিমন্ত্রী আরো জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাসের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দও দিয়েছে।

এ ছাড়া পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের ব্যাবসা, বিনিয়োগ এবং ভিসা প্রক্রিয়া আরো সহজ করার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

এ ছাড়া মরক্কোর সঙ্গে বাংলাদেশের বি-টু-বি যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে এবং দুই দেশের বেসরকারি খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিশেষ করে সার ও পাট খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

জাতীয় এর আরও খবর