img

ইতালির নামে লিবিয়ায় বিক্রি করে দেওয়া হয় রফিককে

প্রকাশিত :  ০৬:০০, ১৩ জুলাই ২০২৬

ইতালির নামে লিবিয়ায় বিক্রি করে দেওয়া হয় রফিককে

ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাতেন রফিকুল ইসলাম। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে ইতালি পাঠানোর প্রলোভনে তাঁকে ফাঁদে ফেলে একটি প্রতারক চক্র। তাদের কথায় বিশ্বাস করে দেশ ছাড়লেও ইতালির বদলে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়, যেখানে মানবপাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কয়েক মাস ধরে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর অবশেষে দেশে ফিরতে সক্ষম হন রফিকুল। শরীরে এখনও নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন বহন করছেন তিনি। অন্যদিকে, দালালদের হাতে ধার-দেনা করে দেওয়া ১৮ লাখ টাকার ঋণের ভারও এখন তাঁর কাঁধে।

রফিকুল ইসলামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার দেওঘর ইউনিয়নের পশ্চিম সাভিয়ানগর দক্ষিণপাড়া গ্রামে। গতকাল রোববার নিজ বাড়িতে স্থানীয় কিছু সাংবাদিকদের সামনে নিজের ভয়াবহ পরিণতির বর্ণনা দেন তিনি। 

রফিকুল প্রতারণার অভিযোগে গত ৮ জুন অষ্টগ্রাম থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। এতে বিবাদী করা হয়েছে একই গ্রামের আবুল হোসেন, তাঁর স্ত্রী আম্বিয়া বেগম, এ দম্পতির বড় ছেলে কাদির মিয়া, ছোট ছেলে আকাঈদ মিয়াসহ কয়েকজনকে। পুলিশ মাসখানেক তদন্ত করলেও এখনও কাউকে আটক করতে পারেনি।

রফিকুলের সঙ্গে আবুল হোসেনের পরিবারের দূর সম্পর্কের আত্মীয়তা রয়েছে। বাড়িও কাছাকাছি এলাকায়। এ কারণে আবুল হোসেন যখন ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখান, তা বিশ্বাস করেন রফিকুল। এ জন্য তাঁর পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে ১৮ লাখ টাকায় রফা হয়। কথা ছিল, শুরুতে ৯ লাখ টাকা দেবে রফিকুলের পরিবার। ইতালি পৌঁছানোর পর দেওয়া হবে আরও ৯ লাখ টাকা।

রফিকুলের ভাষ্য, তাঁর কাছ থেকে শুরুতেই পাসপোর্ট নিয়ে নেয় চক্রটি। পরে ঢাকায় নিয়ে ১৭ দিন বিভিন্ন হোটেলে রাখা হয়। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর তাঁকে পাঠানো হয় লিবিয়ায়। সেখানে পৌঁছে তিনি বুঝতে পারেন, তাঁকে ইতালিতে পাঠানোর জন্য নয়, অন্য উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।

লিবিয়ায় পৌঁছানোর কয়েক দিনের মাথায় রফিকুলকে মরুভূমির নির্জন এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে স্থানীয় অস্ত্রধারী মাফিয়ারা হাত-পা বেঁধে মারপিট করত। পাশাপাশি বলত, বাঁচতে হলে পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা দিতে হবে। ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হতো না। প্রায় সময় বেঁধে মাটিতে ফেলে রাখা হতো রফিকুলকে। এভাবে কাটে ৩৫-৩৭ দিন। অমানবিক নির্যাতন সইতে না পেরে পালানোর সময় লিবীয় পুলিশের হাতে আটক হন তিনি। চিকিৎসা শেষে তাঁকে একটি আটককেন্দ্রে রাখা হয়।

রফিকুল জানান, শ্বশুরবাড়ির এক আত্মীয়ের সহায়তায় স্থানীয় এক আইনজীবীর মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা খরচ করে চলতি বছরের ২১ মে দেশে ফেরেন তিনি। তখনই জানতে পারেন, তাঁর পরিবারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে সময়ে মোট ১৮ লাখ টাকা নিয়েছে দালালেরা। তিনি লিবিয়া থাকার সময়ই ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে আরও টাকা আদায়ের চেষ্টা করেছে তারা।

এ ঘটনায় রফিকুলের স্ত্রী ডলি সুলতানা পুনম গত ৮ জুন অষ্টগ্রাম থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। এতে ইতালিতে পাঠানোর নাম করে দফায় দফায় ১৮ লাখ টাকা নেওয়া ও লিবিয়া থেকে ফেরাতে আরও প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা খরচের উল্লেখ করা হয়েছে। ডলি সুলতানা পুনমের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সালিশের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু দালালেরা সাড়া দেননি। উল্টো তাদের ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের সঙ্গে জমা দেওয়া ব্যাংক লেনদেনের কাগজপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ৪ লাখ টাকা, একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর আরও ৪ লাখ টাকা এবং ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি সবুজা বেগম নামে একটি হিসাবে ৭ লাখ টাকা দিয়েছে রফিকুলের পরিবার। বাকি চার লাখ টাকা নগদ নেন আবুল হোসেনের স্ত্রী আম্বিয়া বেগম।

রফিকুলের বন্ধু আহমেদ রেজার ভাষ্য, রফিকুল দেশে ফেরার পর তাঁর কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা শুনে তিনি একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। পরে বিভিন্ন মহল থেকে তাঁকে চাপ দেওয়া হয়। হুমকির মুখে ভিডিও সরিয়ে নিতে বাধ্য হন।

দেওঘর ইউপির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. বাবুল আহমেদ বলেন, রফিকুল সহজ-সরল মানুষ। বিদেশ যাওয়ার আগে কাউকে জানাননি। দেশে ফেরার পর তাঁর শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা প্রভাবশালী। তাদের সন্ধানে বাড়ি গিয়েও পাওয়া যায় না।

অষ্টগ্রাম থানার ওসি মোহাম্মদ রুকনুজ্জামান বলেন, থানায় এ বিষয়ে ৮ জুন লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে অন্য পথে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে তিনি মানব পাচারকারী ও মাফিয়া চক্রের কবলে পড়েন। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।


বাংলাদেশ এর আরও খবর

img

সড়কের পাশে ধানের শীষ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডকে প্রধানমন্ত্রীর উপহার

প্রকাশিত :  ১২:৫৯, ০৮ জুলাই ২০২৬

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কের পাশে একটি বেসরকারি ব্যাংকের এটিএম বুথ। প্রতিদিনের মতো সেখানেই দায়িত্ব পালন করেন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ড আব্দুস সালাম। দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাঁর আরেকটি অভ্যাস ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গাড়িবহর ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় হাতে ধানের শীষ নিয়ে সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। 

সেই দৃশ্য লক্ষ্য করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সেই আব্দুস সালামকে উপহার পাঠিয়েছেন। 

বুধবার (০৮ জুলাই) সকালে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমন রাজধানীর রমনায় গিয়ে আব্দুস সালামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাঁর হাতে কিছু উপহারও তুলে দেন। 

এ সময় আব্দুস সালামের শারীরিক অবস্থা ও তার পরিবারের খোঁজখবরও নেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেসসচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এ কথা জানান।

আব্দুস সালামের বাড়ি পাবনার নগরবাড়ি ঘাট এলাকায়। গত আটমাস ধরে রাজধানীর সাবেক রমনা থানার সামনের একটি বেসরকারি ব্যাংকের বুথে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করছেন। এর আগে তিনি গাড়ি চালাতেন। স্ট্রোক করার পর তিনি আর গাড়ি চালাতে পারেন না। গাড়ির স্টিয়ারিং ছেড়ে এই সিকিউরিটি গার্ডের কাজ নেন তিনি। অসুস্থ শরীর নিয়েই প্রতিদিনই বিরতিহীন সকাল ৮ থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১২ ঘন্টা কাজ করেন তিনি।

সুজন মাহমুদ জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁর সচিবালয়ের কার্যালয়ে যাওয়ার সময় প্রতিদিন আব্দুস সালাম রমনা পুরনো থানার কাছে বুথের সামনে ধানের শীষ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তার এই নীরব শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নজরে আসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। তিনি তাঁর অতিরিক্ত প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমনকে ওই ব্যক্তির খোঁজ খবর নেয়ার জন্য উপহার দিয়ে পাঠান। 

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপহার পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন আব্দুস সালাম।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আব্দুস সালাম বলেন, কখনো কল্পনাও করিনি এটি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হবে। আর প্রধানমন্ত্রী আমার জন্য উপহার পাঠাবেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাবাকে ভালোবাসি, মাকে ভালোবাসি, প্রধানমন্ত্রীকে ভালোবাসি। প্রধানমন্ত্রী আমার জানের টুকরা। তিনি যখন এই পথ দিয়ে যান, আমি প্রতিদিনই প্রধানমন্ত্রীকে সালাম দেই। তিনিও আমাকে গাড়ির ভেতর থেকে সবদিনই হেসে সালাম দেন। হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীর হাসি দেখলে আমার মন জুড়িয়ে যায়। আজ আমার জীবনের সেরা দিন। সবচেয়ে আনন্দের দিন। প্রধানমন্ত্রী আমার মত ক্ষুদ্র মানুষকে উপহার পাঠিয়েছেন। এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে।’

একজন সাধারণ মানুষের নীরব ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এই মানবিক সাড়া স্থানীয়দের মধ্যেও প্রশংসা কুড়িয়েছে।

তারা বলছেন, দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একজন সাধারণ মানুষের আন্তরিক অনুভূতির এমন মূল্যায়ন নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী মানবিক দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশ এর আরও খবর