img

বাংলাদেশ-চীনের যৌথ বিবৃতি: প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারে ঐকমত্য

প্রকাশিত :  ১২:০৪, ২৬ জুন ২০২৬

বাংলাদেশ-চীনের যৌথ বিবৃতি: প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারে ঐকমত্য

বাংলাদেশ ও চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে ‘নতুন যুগের অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদার করা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ চালু এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সহযোগিতা গভীরতর করার বিষয়ে বিস্তৃত ঐকমত্যে পৌঁছেছে দুই দেশ।

তা ছাড়া প্রতিরক্ষা খাতে নিজেদের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়সহ তিস্তা নদী সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে সব ধরনের সহযোগিতা জোরদারের কথা রয়েছে।

আজ শুক্রবার বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ দিনের সরকারি সফর শেষে প্রকাশিত বাংলাদেশ-চীনের যৌথ ঘোষণাপত্রে এসব তথ্য জানানো হয়।

যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত সরকারি সফরে চীন যান। সফরকালে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিত নিউ চ্যাম্পিয়ন্স ২০২৬-এর ১৭তম বার্ষিক সভা (সামার দাভোস)-এও অংশ নেন।

সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। 

এ ছাড়া ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজিও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং দুই দেশ বিস্তৃত ঐকমত্যে পৌঁছে।

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়

যৌথ ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা, ঐতিহ্যগত বন্ধুত্ব এবং বাস্তবমুখী সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে আরো শক্তিশালী হয়েছে। দুই দেশই মনে করে, তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল।

চীন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন সরকারের শাসন কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে ‘বাংলাদেশ বিফোর অল’ নীতির প্রশংসা করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মনে করে, চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য নতুন উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

দুই দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিদ্যমান ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারত্ব’কে আরো উন্নীত করে ‘নতুন যুগের অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ গড়ে তোলা হবে, যাতে দুই দেশের জনগণ আরো বেশি উপকৃত হয়।

 ‘২+২’ উদ্যোগ

দুই দেশ উচ্চপর্যায়ের সফর ও রাজনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে। পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিনিময়, সরকার, আইনসভা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ আরো বাড়ানো হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে নিয়মিত কৌশলগত সংলাপ চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক ‘২+২ সংলাপ’ চালুর সম্ভাবনা যাচাই করবে দুই দেশ।

‘এক চীন’ নীতিতে বাংলাদেশের সমর্থন

যৌথ ঘোষণাপত্রে দুই দেশ একে অপরের মৌলিক জাতীয় স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়ে দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

বাংলাদেশ আবারও ‘এক চীন’ নীতির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। এতে বলা হয়, পৃথিবীতে একটিই চীন, তাইওয়ান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বেইজিংই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ সরকার। বাংলাদেশ যেকোনো ধরনের ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছে এবং জাতীয় পুনঃএকত্রীকরণে চীনা সরকারের প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নপথ বেছে নেওয়ার অধিকারকে সম্মান জানিয়েছে।

বেল্ট অ্যান্ড রোড ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা

দুই দেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় উচ্চমানের সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক ক্ষুদ্র প্রকল্প বাস্তবায়নেও সহযোগিতা করবে।

চীন বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষির সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে সক্ষমতা অনুযায়ী সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিনিয়োগে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।

বাংলাদেশের জন্য শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা অব্যাহত রাখায় চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঢাকা।

দুই দেশ যৌথভাবে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংযোগ ব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি, দুর্যোগ প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে একমত হয়েছে দুই দেশ।

এছাড়া বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাসহ আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির নতুন নতুন সুযোগ খুঁজে দেখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহায়তা

যৌথ ঘোষণাপত্রে তিস্তা নদীকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুই দেশ সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানি পরিকল্পনা, জলবিদ্যাগত পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা আরো গভীর করবে।

চীন তার সক্ষমতা অনুযায়ী তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) সহায়তা করবে। পাশাপাশি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত শেষ করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের কাজ এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে। সামুদ্রিক বিষয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

প্রতিরক্ষা খাতে সফর, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়সহ সহযোগিতা আরো সম্প্রসারণে একমত হয়েছে দুই দেশ। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্পৃক্ততা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

২০২৫ সালে বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি এবং ‘পিপল-টু-পিপল এক্সচেঞ্জ ইয়ার’ সফলভাবে উদযাপনের প্রশংসা করেছে দুই দেশ।

গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, শিক্ষা, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা, যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে সহযোগিতা আরও বাড়ানো হবে। মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা হবে।

চীন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখবে। জনস্বাস্থ্য ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ক্ষেত্রেও বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ানো হবে। ইউনান প্রদেশসহ স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবায় চীনের সহযোগিতার প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ।

ব্রিকস ও এসসিওতে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন

বাংলাদেশ প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ‘মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যতের কমিউনিটি’ ধারণা এবং তাঁর প্রস্তাবিত বিভিন্ন বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং এসব উদ্যোগে সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

চীন জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের আরও সক্রিয় ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। পাশাপাশি ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) অংশীদার হওয়ার আবেদনের প্রতিও সমর্থন দিয়েছে।

দুই দেশ আঞ্চলিক বহুপাক্ষিক সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়া এবং এ প্রক্রিয়ায় অঞ্চলের আরও দেশকে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

দুই দেশ জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা এবং জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য ও নীতির প্রতি দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

এছাড়া সমতা ও শৃঙ্খলাভিত্তিক বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ের ফলাফল সমুন্নত রাখা এবং ফ্যাসিবাদ ও সামরিকবাদের পুনরুত্থানের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতার কথাও যৌথ ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। কায়রো ঘোষণা, পটসডাম ঘোষণা এবং জাতিসংঘ সনদভিত্তিক যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতিও সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে দুই দেশ।

রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেছে চীন।

চীন জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করতে তারা সহায়ক ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।

সফরকালে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সফরের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের সরকার ও জনগণের আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।

জাতীয় এর আরও খবর

img

শঙ্কার মুখে বাংলাদেশ: ঢাকা-চট্টগ্রামের জন্য চরম অবহেলা ও ভূমিকম্পের আসন্ন মহাবিপর্যয়

প্রকাশিত :  ১৮:৫৪, ২৬ জুন ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশ ও সন্নিহিত অঞ্চলগুলো ভৌগোলিক ও ভূ-তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থানে রয়েছে। মাটির নিচে সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত নড়াচড়া এবং দীর্ঘদিনের আপাত শান্ত পরিস্থিতি দেশটিকে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিগত এক শতাব্দীতে এই অঞ্চলে কোনো বড় ধরনের বিধ্বংসী ভূমিকম্প আঘাত না এলেও সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন মাঝারি মাত্রার কম্পন সেই আশঙ্কাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালেই দেশে ৫.০ মাত্রার চেয়ে বড় ছয়টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে, যা মাটির নিচে সঞ্চিত বিপুল শক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন ভূ-বিজ্ঞানীরা। ভূ-তাত্ত্বিকদের একাংশের মতে, আগামী ১০০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্প আঘাত হানার তীব্র পরিসংখ্যানগত সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাব্য দুর্যোগে দেশের দুই প্রধান অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র—রাজধানী ঢাকা এবং প্রধান বন্দরনগরী চট্টগ্রাম—সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে পারে।

ভূ-তাত্ত্বিক বাস্তবতার বিপজ্জনক সমীকরণ ও নতুন ফল্টের সন্ধান

বাংলাদেশের নিচে মূলত তিনটি গতিশীল লিথোস্ফিয়ারিক প্লেটের সংযোগস্থল অবস্থিত, যার মধ্যে রয়েছে ভারতীয় প্লেট, ইউরেশীয় প্লেট ও বার্মা প্লেট। এই প্লেটগুলোর ক্রমাগত পারস্পরিক চাপ ও সরণের ফলে মাটির গভীরে বিপুল পরিমাণ ভূকম্পন শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমান ভূ-তাত্ত্বিক পরিমাপ অনুযায়ী, ভারতীয় প্লেটটি প্রতি বছর প্রায় ৪৬ মিলিমিটার বা ৪.৬ সেন্টিমিটার গতিতে ইউরেশীয় প্লেটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে এই অঞ্চলে মাঝারি থেকে অতি তীব্র মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এত দিন ধরে দেশের গবেষকেরা মূলত ডাউকি ফল্ট এবং ইন্দো-বার্মা মেগাথ্রাস্টের মতো প্রধান ফল্ট লাইনগুলোকে প্রধান বিপদের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে আসছিলেন। এর পাশাপাশি মধুপুর, সিতাকুণ্ড, শাহজিবাজার, জাফলং ও কুমিল্লা অঞ্চলের ফল্ট লাইনগুলোও সক্রিয় হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গবেষকদের একটি আন্তর্জাতিক দল বাংলাদেশে আরও একটি অত্যন্ত সক্রিয় ভূগর্ভস্থ ফল্ট লাইনের সন্ধান পেয়েছেন। প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নতুন ফল্ট লাইনটি বাংলাদেশের জামালপুর ও ময়মনসিংহ হয়ে ভারতের কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত। ভূ-তাত্ত্বিক রূপবিদ্যা বা \'টেকটোনিক জিওমরফোলজি\' পদ্ধতিতে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন এই ফল্ট লাইনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ভূমিকম্পপ্রবণ অংশটি বাংলাদেশের সীমানার ভেতরেই অবস্থিত এবং এটি রিখটার স্কেলে অন্তত ৬ মাত্রা পর্যন্ত ভূমিকম্প ঘটাতে সক্ষম।

ঐতিহাসিকভাবে এই নতুন আবিষ্কৃত ফল্ট লাইনের সঙ্গে অতীতের বেশ কয়েকটি বড় ভূমিকম্পের সংযোগ পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, ১৮৮৫ সালের বিখ্যাত \'বেঙ্গল আর্থকোয়েক\', যা রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ছিল এবং যার কেন্দ্রস্থল ছিল মানিকগঞ্জে, তা পূর্বে কেবল মধুপুর ফল্টের কারণে হয়েছে বলে মনে করা হলেও এখন নতুন এই ফল্ট লাইনের সক্রিয়তাকেও এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে। এ ছাড়া ১৯২৩ সালে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে আঘাত হানা ৬.৯ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্পটির উৎসও ছিল এই নব-আবিষ্কৃত ভূগর্ভস্থ ফাটলটি। দীর্ঘকালের এই সঞ্চিত শক্তি যেকোনো মুহূর্তে মুক্ত হয়ে ৭.৫ থেকে ৮.৫ মাত্রা পর্যন্ত বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।

মেগাসিটি ঢাকা: অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও তাসের ঘরের মতো ধসের শঙ্কা

ভূমিকম্পের সরাসরি প্রভাবে ঢাকা শহরের ক্ষয়ক্ষতির যে পূর্বাভাস গবেষকেরা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ঢাকা বিশ্বের অন্যতম প্রধান ঘনবসতিপূর্ণ শহর হলেও এখানকার প্রায় ৬০ শতাংশ ভবনই যেকোনো সাধারণ ভূকম্পন প্রতিহত করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। বিশদ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ও ভূগর্ভস্থ কম্পন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, ঢাকার ভূ-স্তর অত্যন্ত নরম এবং এর আশপাশে অন্তত চারটি ভূমিকম্পের উৎসবিন্দু বা মাইক্রো-সিসমিসিটি কেন্দ্র রয়েছে। ঢাকা শহরের পশ্চিম প্রান্ত—মিরপুর ও কল্যাণপুর থেকে বুড়িগঙ্গা তীরের পাগলা পর্যন্ত এবং পূর্ব প্রান্ত—উত্তরখান ও বাড্ডা থেকে বালু নদীসংলগ্ন ডেমরা পর্যন্ত এলাকাগুলো তীব্র ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এসব এলাকায় রিখটার স্কেলে মাত্র ৫.৬ মাত্রার একটি স্থানীয় ভূমিকম্প আঘাত হানলেও মাটির ত্বরণ বা পিক গ্রাউন্ড অ্যাক্সিলারেশন (পিজিএ) ০.৩ থেকে ০.৩৫জি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা দুর্বল কাঠামোর ভবনগুলোর তাৎক্ষণিক ধসের জন্য যথেষ্ট।

২০১৪ সালে বিশ্বব্যাংক এবং আর্থকোয়েক অ্যান্ড মেগা-সিটিজ ইনিশিয়েটিভের সহায়তায় পরিচালিত \'ঢাকা প্রোফাইল অ্যান্ড আর্থকোয়েক রিস্ক অ্যাটলাস\' শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, মধুপুর ফল্ট লাইনে ৭.৫ মাত্রার একটি কম্পন সৃষ্টি হলে ঢাকায় প্রায় ৫০,০০০ মানুষের মৃত্যু এবং ২,০০,০০০ মানুষ আহত হতে পারে। এই দুর্যোগে প্রায় ৮৮,০০০ ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে, যার ফলে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সিটি কর্পোরেশনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতায় প্রায় ৫৪,০০০ ভবন ধসে পড়তে পারে, যার আর্থিক মূল্য ৩.৪ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে প্রায় ৩৪,০০০ ভবন ধসের শিকার হবে, যার আনুমানিক ক্ষতি হবে ২.২ বিলিয়ন ডলার।

ধানমন্ডি, লালমাটিয়া ও মোহাম্মদপুর এলাকায় পরিচালিত র‌্যাপিড ভিজ্যুয়াল স্ক্রিনিং (আরভিএস) বা দ্রুত চাক্ষুষ পরীক্ষা পদ্ধতির একটি জরিপ ঢাকার এই ভয়াবহ কাঠামোগত দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। জরিপকৃত ২,০০৭টি ভবনের মধ্যে ১,০৮২টি ভবন ছিল রিইনফোর্সড কংক্রিট ফ্রেমের (আরসিসি) এবং ৯২৫টি ভবন ছিল প্লাস্টারবিহীন বা সাধারণ ইটের গাঁথুনির তৈরি দুর্বল অবকাঠামো (ইউআরএম)। আরও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, এই আরসিসি ভবনগুলোর মধ্যে ৪৫৬টি ভবনই ছিল \'সফট-স্টোরি\' বা উন্মুক্ত নিচতলাবিশিষ্ট ভবন, যেগুলোর নিচতলা মূলত গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য দেয়ালহীন ফাঁকা রাখা হয়েছে। অতীতের বিভিন্ন বৈশ্বিক ভূমিকম্প, যেমন তুরস্ক ও কাশ্মীরের দুর্যোগে দেখা গেছে, এই ধরনের সফট-স্টোরি ভবনগুলো মাটির প্রথম ঝাপটাতেই হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে জলাভূমি ও প্লাবনভূমি ভরাট করে বালুমাটির ওপর বহুতল ভবন নির্মাণ, যা তীব্র কম্পনে সয়েল লিকুইফ্যাকশন বা মাটির তরলীকরণ ঘটিয়ে আস্ত ভবনকে মাটির নিচে ডুবিয়ে দেবে অথবা কাত করে ফেলবে।

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম: পাহাড়ধস ও মাটি তরলীকরণের দ্বৈত ঝুঁকি

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ঢাকার চেয়ে আলাদা হলেও এর ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কোনো অংশে কম নয়। বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী চট্টগ্রামকে ভূমিকম্পের ৩ নম্বর জোনে রাখা হয়েছে, যেখানে পিক গ্রাউন্ড অ্যাক্সিলারেশন (পিজিএ) ধরা হয়েছে ০.২৮জি। কিন্তু এই শহরের তীব্র পাহাড়ি ঢাল এবং কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত নরম পলিমাটি একে একজোড়া প্রাকৃতিক বিপদের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

চট্টগ্রাম মূলত ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম ভাঁজ অঞ্চলের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এবং এটি সিতাকুণ্ড ফল্টের অত্যন্ত কাছাকাছি। বিজ্ঞানীদের পরিচালিত একটি সম্মিলিত ভূকম্পন ঝুঁকি মানচিত্রে দেখা গেছে, যদি ১৯১২ সালের মিয়ানমারের মান্দালয় ভূমিকম্পের মতো তীব্রতার কোনো কম্পন চট্টগ্রামের কাছাকাছি পুনরায় ঘটে, তবে শহরের ২০ শতাংশ এলাকা ০.৬জি-এর মতো মারাত্মক ভূ-ত্বরণের সম্মুখীন হবে। এ ছাড়া আরও ২০ শতাংশ এলাকা ০.৪জি এবং ৬০ শতাংশ এলাকা ০.২জি ত্বরণের শিকার হবে। এর ফলে শহরের ২৪ শতাংশ এলাকায় তীব্রতা স্কেলে ৯ (ইনটেনসিটি ৯) মাত্রার ধ্বংসযজ্ঞ ঘটবে, যা যেকোনো আধুনিক কংক্রিট অবকাঠামোকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এ ছাড়া ৫৭ শতাংশ এলাকা তীব্রতা ৮ এবং ১৯ শতাংশ এলাকা তীব্রতা ৭ মাত্রার ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়বে।

চট্টগ্রামের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় হতে পারে ভূমিকম্প-প্ররোচিত পাহাড়ধস। লিমিট ইকুইলিব্রিয়াম মেথড বা গাণিতিক ভারসাম্য মডেলিং ব্যবহার করে দেখা গেছে যে, চট্টগ্রামের মতিঝর্ণা, ট্যাঙ্কির পাহাড় ও বাটালি হিল এলাকার পাহাড়ের মাটির গঠনে অসংখ্য ফাটল ও জোড় রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমেও যদি ৬.৫ মাত্রার একটি মাঝারি ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে এই শুষ্ক পাহাড়ি ঢালগুলোর স্থায়িত্ব নষ্ট হয়ে ধসে পড়বে। আর যদি বর্ষাকালে বা ভেজা মাটিতে (ওয়েট কন্ডিশন) এমন কম্পন হয়, তবে পাহাড়গুলোর নিরাপত্তা সূচক বা ফ্যাক্টর অব সেফটি (এফএস) ০.৫-এর নিচে নেমে যাবে, যার অর্থ সামান্যতম কম্পনেই পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পাদদেশে থাকা হাজার হাজার ঘরবাড়ি ও মানুষের ওপর আছড়ে পড়বে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী উপকূলীয় পলিস্তর, যেখানে মাটির নিচে ২০ মিটারের মধ্যে সম্পৃক্ত আলগা বালি রয়েছে। কম্পন শুরু হওয়া মাত্রই এই মাটি তরল আকার ধারণ করবে, ফলে বন্দর অবকাঠামো ও বহুতল ভবনগুলোর ভিত্তি সম্পূর্ণ ধসে পড়বে।

পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও উদ্ধার অভিযানের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে প্রায়ই ভূমিকম্পের আগাম পূর্বাভাসের বিষয়ে বিভ্রান্তি দেখা যায়। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি সত্য যে, পৃথিবীর কোনো প্রযুক্তিই ভূমিকম্প কখন ও কোথায় আঘাত হানবে, তার সময় বা দিনক্ষণ নির্দিষ্ট করে পূর্বাভাস দিতে পারে না। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) মূলত আধুনিক সিসমিক স্টেশনের মাধ্যমে ভূমিকম্প-পরবর্তী তীব্রতা এবং উৎপত্তিস্থল রেকর্ড ও সুনামি সতর্কতা জারি করতে পারে, তবে তা আগাম কোনো বার্তা দিতে পারে না। তাই একমাত্র প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতিই জীবন বাঁচানোর কার্যকর উপায়।

তবে বাংলাদেশের বর্তমান দুর্যোগ প্রস্তুতি ও উদ্ধার সক্ষমতা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করেছেন। যদিও সরকারিভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৬২,০০০ নগর স্বেচ্ছাসেবক দল বা \'আরবান কমিউনিটি ভলান্টিয়ার\' গঠনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে ৩৬,০০০ স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তবুও একটি বড় মেগাসিটি বিপর্যয়ের তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবিরের মতে, অতীতে এ ধরনের বড় দুর্যোগ মোকাবিলার কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উদ্ধারকারী দলগুলোর নেই। বড় কোনো ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজের জন্য যে ধরনের চওড়া ও নিরবচ্ছিন্ন সড়ক নেটওয়ার্ক প্রয়োজন, ঢাকা বা চট্টগ্রামের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ফলে যান্ত্রিক উদ্ধার সরঞ্জাম নিয়ে ধসে পড়া ভবনের কাছে পৌঁছানোই ফায়ার সার্ভিসের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এর চেয়েও বড় অবহেলার চিত্র দেখা যায় দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের ভূমিকম্পের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ ধরনের দুর্যোগে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর চেয়েও বড় সংকট তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদী পঙ্গুত্ব বা মেরুদণ্ডের আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের নিয়ে। বাংলাদেশে বর্তমান দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন চিকিৎসা বা \'রিহ্যাবিলিটেশন মেডিসিন\' ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি রূপরেখায় পঙ্গুত্ব এড়ানো, পুনর্বাসন সেবার ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসাকর্মী নিয়োজিত করার মতো বিষয়গুলো প্রায় উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

দুর্যোগকালে জীবন রক্ষায় সাধারণ জনগণের সচেতনতা ও প্রস্তুতি

যেহেতু ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাভাস পাওয়া যায় না, তাই নাগরিকদের ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতিই জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান গড়ে দিতে পারে। প্রতিটি পরিবার ও সাধারণ জনগণের জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী করণীয় পদক্ষেপগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

ভূমিকম্পের পূর্বপ্রস্তুতি ও করণীয়

নতুন কোনো ঘর বা ভবন নির্মাণের সময় কোনো অবস্থাতেই জাতীয় বিল্ডিং কোডের (বিএনবিসি) নিয়মগুলো অমান্য করা যাবে না। মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে ও দক্ষ প্রকৌশলীর অধীনে সঠিক নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। ইতিমধ্যে নির্মিত দুর্বল ভবনগুলোর ক্ষেত্রে কাঠামোগত শক্তি বাড়ানোর জন্য রেট্রোফিটিং করা অত্যন্ত জরুরি।

পারিবারিকভাবে প্রতিটি ঘরে একটি জরুরি দুর্যোগব্যাগ প্রস্তুত রাখতে হবে, যার মধ্যে অন্তত কয়েকদিনের জন্য শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধপত্র বা ফার্স্ট এইড কিট, একটি সচল টর্চলাইট, হুইসেল এবং জরুরি যোগাযোগের নম্বরগুলোর একটি তালিকা থাকবে। ঘরের ভেতরের ভারী আসবাব, যেমন আলমারি, বুকশেলফ বা শোকেস, দেয়ালের সঙ্গে স্ক্রু বা ক্ল্যাম্প দিয়ে শক্তভাবে আটকে রাখতে হবে, যেন কম্পনের সময় সেগুলো গায়ের ওপর ছিটকে না পড়ে। পরিবারের সকল সদস্যের সঙ্গে দুর্যোগকালীন সময়ে ঘরের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান কোনটি (যেমন শক্ত টেবিল বা খাটের নিচে) এবং কম্পন থামার পর কীভাবে ঘর থেকে বের হতে হবে—তা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা ও মহড়া করতে হবে।

ভূমিকম্প চলাকালীন করণীয়

ভূমিকম্পের প্রথম ঝাঁকুনি অনুভূত হওয়া মাত্রই আতঙ্কিত হয়ে দিকবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াদৌড়ি করা যাবে না। ঘরের ভেতরে থাকলে দ্রুত কোনো শক্ত কাঠের টেবিল, খাট বা ডেস্কের নিচে অবস্থান নিতে হবে এবং টেবিলের পা শক্ত করে ধরে মাথা ও ঘাড় হাত দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে, যা দুর্যোগ বিজ্ঞানে \'ড্রপ, কাভার অ্যান্ড হোল্ড অন\' নামে পরিচিত। ঘরের কাঁচের জানালা, ঝুলন্ত ছবি বা ঝাড়বাতি এবং ভারী আসবাবপত্র থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকতে হবে।

যদি কোনো বহুতল ভবনে অবস্থান করা হয়, তবে কম্পন চলাকালীন সময়ে কোনো অবস্থাতেই সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করা বা লিফট ব্যবহার করা যাবে না, কারণ বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এবং লিফটের তার ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। যদি কেউ ভূমিকম্পের সময় ঘরের বাইরে খোলা জায়গায় থাকেন, তবে বহুতল ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি, বড় গাছপালা এবং ওভারহেড ব্রিজ থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিতে হবে। গাড়ি চালানোর অবস্থায় থাকলে দ্রুত কোনো নিরাপদ ফাঁকা জায়গায় গাড়ি থামিয়ে কম্পন শেষ না হওয়া পর্যন্ত গাড়ির ভেতরেই অবস্থান করতে হবে।

ভূমিকম্প-পরবর্তী করণীয়

কম্পন সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পর অত্যন্ত শান্তভাবে ও সতর্কতার সঙ্গে সিঁড়ি ব্যবহার করে ভবন থেকে বের হয়ে খোলা স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। বের হওয়ার সময় অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে ঘরের গ্যাস সিলিন্ডারের চাবি ও প্রধান বিদ্যুৎ সংযোগটি বন্ধ রয়েছে কি না, কারণ ভূমিকম্পের পর ধসের চেয়েও গ্যাস লিক ও বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড বেশি প্রাণহানি ঘটায়।

কাছে কোনো দিয়াশলাই বা লাইটার জ্বালানো যাবে না, কারণ বাতাসে গ্যাসের উপস্থিতি থাকলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। নিজের পরিবারের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের কেউ আহত বা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছেন কি না, তা দেখতে হবে এবং ফায়ার সার্ভিস বা জরুরি উদ্ধারকারী সংস্থাকে খবর দিতে হবে। মূল ভূমিকম্পের পর বেশ কয়েকটি মৃদু আফটারশক বা অনুকম্পন হতে পারে, তাই ক্ষতিগ্রস্ত বা ফাটলধরা ভবনে পুনরায় প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যৎ সুপারিশ

ভূমিকম্পের মতো একটি অতিঝুঁকিপূর্ণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কেবল তাৎক্ষণিক উদ্ধার তৎপরতা যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন একটি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা। প্রথমত, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ) ভবনের নকশা অনুমোদন ও মাঠপর্যায়ের নির্মাণকাজে বিল্ডিং কোডের প্রয়োগ শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সেগুলো ভেঙে ফেলা বা রেট্রোফিটিং করার জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা জারি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং শহরের উন্মুক্ত স্থান ও পার্কগুলোকে দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকর্মীদের আধুনিক ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে সুসজ্জিত করতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে পাড়ায় পাড়ায় সাধারণ মানুষদের নিয়ে উদ্ধারকারী দল ও ফার্স্ট রেসপন্ডারদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ চলমান রাখতে হবে।

পরিশেষে, যেকোনো বড় ভূমিকম্পের পর দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর যে প্রচণ্ড চাপ পড়বে, তা সামাল দেওয়ার জন্য এখনই সরকারি হাসপাতালগুলোতে জরুরি ট্রমা সেন্টার ও পুনর্বাসন চিকিৎসা বা রিহ্যাবিলিটেশন মেডিসিন বিভাগকে শক্তিশালী করতে হবে। ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তনের গতিধারাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, তবে সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ ও সচেতন নাগরিক সমাজই পারে বাংলাদেশের এই আসন্ন মহাবিপর্যয়কে রুখে দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ দেশ উপহার দিতে।

জাতীয় এর আরও খবর