img

কঠোর নিরাপত্তায় রূপপুরে পৌঁছেছে ইউরেনিয়ামের চালান

প্রকাশিত :  ০৮:১২, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:২৪, ০৩ অক্টোবর ২০২৬

কঠোর নিরাপত্তায় রূপপুরে পৌঁছেছে ইউরেনিয়ামের চালান

কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়ামের নতুন চালান পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) বেলা ১১টা ২০ মিনিটের দিকে ইউরেনিয়ামবাহী বিশেষ গাড়িবহরটি নিরাপদে প্রকল্পের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।

এর আগে শুক্রবার রাত ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে রাশিয়া থেকে তেজস্ক্রিয় জ্বালানিবাহী বিশেষ কার্গো বিমানটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পরবর্তীতে শনিবার সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে সেনাবাহিনীর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় সড়কপথে ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে বহরটি। যাত্রাপথে বঙ্গবন্ধু সেতু অতিক্রম করে নাটোরের বনপাড়া ও পাবনার দাশুড়িয়া হয়ে এটি রূপপুরে পৌঁছায়। প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইউরেনিয়ামের এই চালানটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আকাশপথে কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতে নির্ধারিত বিরতি দিয়ে চালানটি বাংলাদেশে আনা হয়। প্রাথমিকভাবে বৃহস্পতিবার আসার কথা থাকলেও সময়সূচি পরিবর্তন করে শুক্রবার দুপুরে এবং পরবর্তীতে তা পুনর্নির্ধারণ করে শুক্রবার গভীর রাতে ঢাকায় অবতরণ করানো হয়। সড়কপথে পরিবহনের সময় নিরাপত্তার ঝুঁকি এড়াতে এবং যানজটমুক্ত পথ নিশ্চিত করতে ঢাকা-পাবনা মহাসড়কে সতর্কতামূলকভাবে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।

নিরাপত্তার বিষয়ে পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ঈশ্বরদী সার্কেল) প্রণব কুমার জানান, ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহরটি নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর লক্ষ্যে পাবনা জেলা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট সার্বক্ষণিক কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলে। কোনো ধরনের বিঘ্ন যাতে না ঘটে, সেজন্য বেলা পৌনে ১২টা থেকে সোয়া ১২টা পর্যন্ত পাবনা-নাটোর-কুষ্টিয়া মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। গাড়িবহরটি প্রকল্প এলাকায় প্রবেশের পরপরই মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করে দেওয়া হয়।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরবরাহ পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মোট ৯টি কার্গো ফ্লাইটে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত ৪৮টি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ১৬৩টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি বাংলাদেশে আসবে। এর মধ্যে সাতটি কার্গো দ্বিতীয় ইউনিটের মূল জ্বালানির জন্য এবং দুটি কার্গো প্রথম ইউনিটের পরবর্তী রিফুয়েলিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন (রসাটম) জানিয়েছে, নির্ধারিত সূচি মেনে ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরো জ্বালানি সরবরাহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই মেগা প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হলেও কমিশনিংয়ের কিছু জটিলতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। বিশেষ করে প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি/পিওএসভি) সংক্রান্ত কারিগরি ত্রুটির কারণে কার্যক্রম থমকে ছিল। তবে সম্প্রতি ১৬ মেগাপ্যাসকেল উচ্চচাপে সেফটি ভালভের সফল পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে বলে জানিয়েছে এনপিসিবিএল কর্তৃপক্ষ। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও কিছু বাধ্যতামূলক ও স্পর্শকাতর পরীক্ষা সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যকার জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) চুক্তির আওতায় দেশের সবচেয়ে বড় এই কম-কার্বন বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা ধরা হলেও সংশোধিত প্রাক্কলনে তা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ইউরেনিয়ামের নতুন চালান পৌঁছানো এবং ভালভ সমস্যার সফল সমাধান বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কমিশনিং কার্যক্রমে বড় ধরনের গতি সঞ্চার করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

img

শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে: দীনেশ ত্রিবেদী

প্রকাশিত :  ১০:০৩, ০৩ অক্টোবর ২০২৬

অভ্যুত্থানে পলাতক শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে একটি আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেন, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান বারবার স্পষ্ট করেছেন। বিষয়টি আইনগত ও সুসংগঠিত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং আদালতও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বলা সম্ভব নয়। ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও একই কথা বলেন তিনি।

শনিবার ‘বে অফ বেঙ্গল কনভার্সেশন ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড বলরুমে অনুষ্ঠিত একটি সেশনে এক প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী এসব কথা বলেন।

ভারতের হাইকমিশনার বলেন, এ বিষয়ে উত্তর দিতে হলে প্রথমে আমাদের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এরই মধ্যে বারবার এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তারা বলেছেন- এ বিষয়ে একটি প্রক্রিয়া রয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়াটি আইনগত ও সুসংগঠিত। বর্তমানে সেই প্রক্রিয়া চলমান এবং আদালতও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বলা সম্ভব নয়।

শেখ হাসিনা কীভাবে ভারতে গেলেন, সে প্রসঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার বলেন, শেখ হাসিনাকে ভারতীয় বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়নি। সে সময় বাংলাদেশে যে মর্মান্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি ভারতে এসেছিলেন। পৃথিবীর কোনো প্রান্তেই যেন এমন পরিস্থিতি আর কখনো সৃষ্টি না হয়, যেখানে নিরপরাধ মানুষকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়—এমন প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।

দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, সেই সময় একটি সামরিক বিমান ভারতে এসেছিল এবং ভারতও এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। আমি নিজেও তখন টেলিভিশনে দেখছিলাম, স্ক্রলে প্রচার করা হচ্ছিল যে তিনি অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন। সেই মুহূর্তে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ফলে পরিস্থিতির বাস্তবতায় আমাদের সামনে খুব বেশি বিকল্পও ছিল না।

তিনি বলেন, একজন প্রতিবেশী হিসেবে তখনকার বাস্তবতাকে গ্রহণ করাই ভারতের দায়িত্ব ছিল। কারণ কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যার জন্য কোনো দেশই আগে থেকে প্রস্তুত থাকে না। ভারত যদি বলত যে তাকে গ্রহণ করবে না, এমনকি অবতরণের অনুমতিও না দিত, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, তা বলা কঠিন।

তিনি বলেন, এটাই ছিল সেই সময়ের ঐতিহাসিক বাস্তবতা। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে যে আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে, সেটি তার নিজস্ব গতিতে চলছে। বাংলাদেশ যেমন একটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক দেশ এবং দেশটির মানুষ আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থাকে সম্মান করে, ভারতও একটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে তার আইনগত প্রক্রিয়াকে সম্মান করে।

সম্প্রতি ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ এবং নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি তারা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে ভালো বুঝেন। বাংলাদেশের কী করা উচিত, তা কাউকে বলে দেওয়ার কারণ নেই। বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপের প্রশ্নই আসে না। বাংলাদেশের জনগণের ওপর ভারতের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষও বুঝবেন যে ভারতের নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপের বিষয়টি কখনোই সামনে আসবে না।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যে সম্পর্কই বজায় রাখুক না কেন, নিজেদের জনগণের স্বার্থ রক্ষার অধিকার তাদের রয়েছে। একইভাবে ভারতেরও নিজেদের স্বার্থ রক্ষার অধিকার রয়েছে। একজন ভালো প্রতিবেশী হিসেবে একে অন্যের মর্যাদা ও সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে শুধু লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক হিসেবে না দেখার কথা জানিয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এর চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। এর সঙ্গে গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বন্ধন রয়েছে। 

পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলের মানুষ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন তিনি ভালোভাবেই বোঝেন। দুই দেশের এই সাংস্কৃতিক বন্ধন অত্যন্ত শক্তিশালী ও মৌলিক।

তিনি বলেন, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বাইরের বিশ্বের পক্ষে পুরোপুরি বোঝা কঠিন। একদিকে নজরুলগীতি, অন্যদিকে রবীন্দ্রসংগীত। এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুই দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। এ ধরনের সম্পর্ক দুই দেশের বন্ধনের অনন্য গভীরতাকে তুলে ধরে।

নিরাপত্তা সম্পর্ক এবং লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক এক নয় উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশের জনগণ অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং তারা ভারতের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বোঝেন। তাই ভবিষ্যতেও এমন কোনো পরিস্থিতি আসবে বলে তিনি মনে করেন না, যেখানে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উদ্বেগের কারণ তৈরি হবে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে মতপার্থক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি পরিবারের মধ্যে যেমন কখনো কখনো সমস্যা বা মতপার্থক্য দেখা দেয়, দুই দেশের সম্পর্কেও তেমন কিছু বিষয় থাকতে পারে। কোনো সমস্যা না থাকলে সেটি গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যও নয়। গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকবেই। তবে এসব সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হলো সংলাপ, আলোচনা, পরামর্শ ও পারস্পরিক যোগাযোগ। আর এই সংলাপের ভিত্তি হলো আস্থা।

দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দূরত্ব রেখে কোনো সম্পর্কের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সবসময়ই একটি চলমান প্রক্রিয়া। দুই দেশের মানুষের ভালোবাসা ও পারস্পরিক আন্তরিকতা তিনি দেখছেন। এ কারণে তিনি বিশ্বাস করেন, দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি অটুট রয়েছে।


জাতীয় এর আরও খবর