img

দুদকের ৫০ শতাংশ মামলা মিথ্যা প্রমাণিত, মিলেছে হয়রানির প্রমাণ

প্রকাশিত :  ০৫:৫৭, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:০৬, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দুদকের ৫০ শতাংশ মামলা মিথ্যা প্রমাণিত, মিলেছে হয়রানির প্রমাণ

দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান, মামলা দায়ের ও তদন্ত শেষে চার্জশিট দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে চলতি বছরে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৫০ শতাংশ মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং রায়ে আসামিরা খালাস পেয়েছেন। এতে দুদকের তদন্ত ও চার্জশিটের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে দুদকের কিছু মামলা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

দুদকের দায়ের করা মামলার বিচার হয় বিশেষ জজ আদালতে। ঢাকায় এমন ১০টি বিশেষ জজ আদালত রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকার ৯টি বিশেষ জজ আদালতের দুদকের মামলার রায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ সময়ে মোট ৬২টি মামলায় রায় হয়েছে।

নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৩১টি মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি দুদকের প্রসিকিউশন বিভাগ। আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়ে গেছেন। বাকি ৩১টি মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে। অথচ সব কয়টি মামলায় দুদক অনুসন্ধান ও তদন্ত করে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছিল। অনেকে এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণও করেছেন। কিন্তু বিচারে এসে মামলার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হচ্ছে।

ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এ জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৫টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আটটি মামলায় যথাযথ প্রমাণ হাজির করতে পারেনি দুদক। আসামিরা সবাই খালাস পেয়ে গেছেন। বাকি সাতটি মামলায় সাজা হয়েছে আসামিদের। এর মধ্যে গত ২ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগনি আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তী ও ভাগনে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববিকে রাজউকের প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির দায়ে ৭ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা আর্থিক জরিমানা করেছেন আদালত।

ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ দুদকের ১৬টি মামলার সত্যতা না পেয়ে আসামিদের খালাস দিয়েছেন। ১৫ মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসসহ ২১ জন খালাস পান। এসব মামলায় তাদের বিরুদ্ধে দরপত্রে অনিয়ম করে ১৮টি সরকারি বাড়ি বিক্রি-সংক্রান্ত ১২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯ টাকা দুর্নীতির অভিযোগ আনে দুদক। আদালত যে রায় দিয়েছে, তাতে এটি দৃশ্যমান যে মামলা করা হয়েছিল, তার সত্যতা প্রমাণিত হয়নি।

রায়ের পর আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. শাহীনুর ইসলাম বলেন, রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন ও ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে এসব মামলা করা হয়েছিল। দুটি মামলায় আসামি ছিলেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ব্যবসায়ী আহমেদ আকবর সোবহান। অন্যদিকে, এ আদালতে চলতি বছরে পোস্ট অফিসের সঞ্চয়পত্রের টাকা আত্মসাতের একটি মামলায় আসামির সাজার রায় দিয়েছেন।

ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৮-এ চলতি বছরে দুদকের তিনটি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। তার ভেতর একটি মামলায় আসামির সাজা হলেও বাকি দুটি মামলায় দুদকের অভিযোগের সত্যতা না মেলোয় খালাস দিয়েছেন আদালত।

ঢাকা বিশেষ জজ আদালত-৬-এ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট সাতটি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এর ভেতরে তিনটি মামলায় সত্যতা না মেলায় আসামিদের খালাস দেওয়া হয়েছে। আর বাকি চারটি মামলায় প্রমাণ করতে পেরেছে দুদকের প্রসিকিশন বিভাগ। সেই মামলাগুলোতে আসামিদের সাজা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এ ছয়টি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এর ভেতর চারটি মমালায় সাজা হয়েছে। বাকি দুটি মামলায় প্রমাণের অভাবে আসামিদের খালাস দিয়েছেন আদালত। ঢাকার ২ নম্বর বিশেষ জজ আদালত চলতি বছরে একটি, ১ নম্বর আদালত ছয়টি, ৭ নম্বর আদালতে তিনটি ও ৯ নম্বর আদালত চারটি মামলায় সাজার রায় দিয়েছেন।

খালাসের কেস স্টাডি-১:

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৫১ লাখ ৪৪ হাজার ৯০০ টাকার সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রমনা মডেল থানায় মামলা করেছিল দুদক। দীর্ঘ ৯ বছর বিচার চলে এ মামলাটির। রাষ্ট্রপক্ষ বা দুদক প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণের জন্য মোট ৮ জন সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করে। তবে সাক্ষ্য-প্রমাণে আসামির বিরুদ্ধে দুর্নীতি অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয় দুদক।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ রায়ে এমদাদুলকে বেকসুর খালাস দেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ‘আসামি মো. এমদাদুল ইসলাম অসাধু উপায়ে তার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণভাবে সম্পদ অর্জন করার যে অভিযোগ দুদক প্রসিকিউশন এনেছিল, তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। তাই দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যাচ্ছে না।

অথচ এ মামলায় আসামির বিরুদ্ধে দুদক দীর্ঘসময় ধরে তদন্ত করে চার্জশিট দেয়। রাজউকের সাবেক এই প্রধান প্রকৌশলীকে ২০১৭ সালের ২ মার্চ গ্রেপ্তার করে দুদক। এর পর কারাভোগ করেন এমদাদুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলন করে দুদক তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করে। এতে সামাজিকভাবে হেয় হন এমদাদুল। দীর্ঘ ৯ বছরে আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতিরও শিকার হন সাবেক এই প্রধান প্রকৌশলী। সাফাই সাক্ষীতে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন ও সম্পদের বৈধ উৎস দেখাতে সক্ষম হন। অবশেষে দুদকের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান তিনি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত না হওয়ায় এতদিনের ভোগান্তি বা হয়রানির দায় কাকে দেবেন তিনি।

খালাসের কেস স্টাডি-২:

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা মীর মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ আতাউল কবির। মামলায় অভিযোগ করা হয়, তিনি সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত থেকে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে মোহাম্মদ আব্দুর রহমান চৌধুরীকে সহকারী ম্যানেজার পদে নিয়োগ দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নগদ ৮ লাখ ও ব্যাংকের মাধ্যমে ৬ লাখসহ মোট ১৪ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে চাকরি দিতে না পারায় দুদকে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ মামলা করা হয়। দুদক এ ঘটনায় তদন্তে আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়।

তদন্তে দুদক জানায়, ৮ লাখ টাকা গ্রহণের রেকর্ডভিত্তিক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ব্যাংকের মাধ্যমে দুই লাখ টাকা গ্রহণের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। এ মামলায় আসামি পলাতক ছিলেন। আসামি পক্ষে কোনো আইনজীবীও ছিল না। এর ফলে দুদক প্রসিকিউশন ৮ জন সাক্ষী হাজির করে। এরপর আদালত ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি একতরফাভাবে আসামিকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ডসহ দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড করেন। পরবর্তীতে আসামি পক্ষ হাইকোর্টে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিলে একজন সাক্ষী ইয়াসিন আলীকে হাজির করার নির্দেশ দেন আদালত। তখন সাক্ষী ইয়াসিন আলী বেঁচে ছিলেন।

পরে ২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে দুদক বা রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী ইয়াসিন আলীকে বেঁচে থাকা অবস্থায় দীর্ঘ সময়েও আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে পারেননি। পরে ইয়াসিন আলী মারা যান। তাই ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর বিচারক মোহাম্মদ জাকারিয়া হোসেন গত ১৩ জুলাই মীর মোশারফ হোসেনকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন।

রায়ে আদালত বলেন, এই তিন বছরের মধ্যে দুদক বা সরকার পক্ষ সাক্ষী ইয়াসিন আলীকে আদালতে উপস্থাপন করতে পারেননি। এটার দায় আসামির নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটার শতভাগ দায় রাষ্ট্রপক্ষ বা দুদক পক্ষের। তারা কোনোভাবেই এই দায় এড়াতে পারে না। হয়তো সাক্ষী ইয়াসিন আলীকে পরীক্ষা করলে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন হতো। আত্মপক্ষ সমর্থনে আসামি বলেন, এটা ছিল চার বন্ধুর কেনা জমি বিক্রির টাকা। ২ লাখ টাকা দিয়ে বাকি টাকা পরে দেবেন বলে জানান তার বন্ধু। কিন্তু পরে আর দেননি। এই টাকা না দেওয়ার জন্যই তারা মিলে তিতাস গ্যাসে চাকরি দেওয়ার নাম করে এ মিথ্যা মামলা করেন।

এ খালাসের বিষয়ে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর দুদকের প্রসিকিউশন বিভাগের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নূরে আলম নোবেল  বলেন, ‘প্রথমে এ মামলায় তিন বছরে সাজা হয়েছিল। পরে আপিলে মামলার সাক্ষীদের জেরা শুরু হয়। তবে প্রধান সাক্ষী মারা যাওয়ায় সাক্ষ্য নেওয়া যায়নি বলে খালাস হয়ে গেছে।’ চলতি বছর আরও দুদক মামলার আসামিদের খালাসের বিষয়ে দুদকের এ পিপি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সময় রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করতে দুদকে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। যেগুলো অনেক মামলায় খালাস হচ্ছে।’

খালাসের কেস স্টাডি-৩: উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কমিটির রেজল্যুশন খাতায় ‘ফ্লুইড’ (সাদা তরল কালি) ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া পদোন্নতি দেখানো এবং সরকারের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগে ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর শাহবাগ থানায় তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলায় আসামি করা হয় মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার নগরীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিল্লুর রহমান, ওই উপজেলার সাবেক শিক্ষা কর্মকর্তা (বর্তমানে যশোর ডিপিইও অফিসে কর্মরত) মুশতাক আহমেদ ও প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ ইউনিটের (শিক্ষা ভবন, ঢাকা) সাবেক সাঁট লিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. আওকাত হোসেনকে।

দুদকের যশোর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের তৎকালীন সহকারী পরিচালক মো. ওয়াজেদ আলী গাজী নিজেই এই মামলার বাদী এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। দুদক তদন্তে পায়, এই ভুয়া পদোন্নতির ওপর ভিত্তি করে আসামি জিল্লুর রহমান ২০১৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের স্কেলের ৪ হাজার ৯০০ টাকার পরিবর্তে ৫ হাজার ৫০০ টাকা বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন। বাকি দুই আসামি তাকে সহযোগিতা করেন। কিন্তু ৯ বছর ধরে বিচারাধীন এ মামলায় অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি দুদক।

চলতি বছরের ৯ জুলাই ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৪-এর বিচারক মো. রবিউল আলম মামলার রায় ঘোষণায় আসামিদের খালাস দেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপিতে বলা হয়েছে, দুদক প্রসিকিউশন তাদের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

ঢাকার বিভিন্ন বিশেষ জজ আদালতে দুদকের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন পাবলিক প্রসিকিউটর খন্দকার মশিউর রহমান। দুদকের ৫০ ভাগ মামলা খালাসের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুদকের মামলায় বিচারের দীর্ঘসূত্রতা অনেকটা দায়ী। অনেক মামলা ২০-২৫ বছর ধরেও চলে। এতে সাক্ষী মারা যায়। এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলেও অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়। অতীতে অনেক কিছুর সাক্ষী আমরা হয়েছি। দুর্নীতির মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাদের কাজে গাফিলতি নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক কিছু ঘটেছে।’

ঢাকা বিশেষ জজ আদালত-৪-এর পাবলিক প্রসিকিউটর (দণ্ডবিধির অন্য মামলায় নিয়োজিত) আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কোর্টে দুদকের মামলা আরেকজন দেখেন। তবে আপনার প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের মামলা খালাসের বিষয়ে বলতে পারি, অতীতে সেনা সমর্থিত ওয়ান-ইলেভেন ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিরোধী দলকে দমন-পীড়নের জন্য দুদককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। সেসব মামলায় হয়তো এখন খালাস পাচ্ছে। মিথ্যা প্রমাণিত হচ্ছে।’

দুদকের প্রসিকিউশন বিভাগের সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘হঠাৎ করে এ বছরের ডাটা দিয়ে তো সব হবে না। আগামী বছর অপেক্ষা করতে হবে। পরের বছর হয়তো আরও ভালো হবে। আদালত মনে করছেন মামলা খালাস হওয়ার মতো, খালাস দিচ্ছেন। এ ছাড়া, ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করলে সাজার পরিমাণ হয়তো বাড়বে।’ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩১টি মামলায় খালাস হয়েছে, সেগুলোতে দুদকের মামলা বা তদন্তে দুর্বলতা ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলাগুলো দেখতে হবে। কী মামলায় রায়ে খালাস হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এ ছাড়া আসামিরা নিম্ন আদালত থেকে খালাস পেলেই চূড়ান্ত নয়। দুদক নিশ্চয়ই উচ্চ আদালতে আপিল করবে। কারণ আপিল করার সুযোগ আছে। অনেক সময় নিম্ন আদালত খালাস দিলেও আপিল করলে সাজা হয়। আমরা এমনও পেয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের জায়গা থেকে এসব বিষয়ে বলতে পারি না। আপনারা আমাদের দুদকের ডিজি লিগ্যালের সঙ্গে কথা বলেন।’

এ বিষয়ে দুদক সচিব সাইদুর রহমান বলেন, ‘নতুন কমিশন এক মাস হলো কাজ করছে। এই কমিশন আসার পর তো তাদের কোনো রিপোর্ট বা চার্জশিটের পরিপ্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত রায় হয়নি বা ওই পর্যায়ে যায়নি। আগের কমিশনের বিষয়গুলোতে আমাদের কিছু দুর্বলতা আছে। সেটা আমরা চিহ্নিত করছি, সংস্কারের উদ্যোগ নিচ্ছি। নতুন কমিশন চেষ্টা করবে রায়গুলো যেন আমাদের ফেভারে আসে। আমাদের তদন্ত যেন সঠিক হয়। সেই বিষয়ে আমরা সেভাবে কাজ করছি। আপনারা সেটা দেখবেন সামনে। যখন ওই পর্যায়ে যাবে (মামলাগুলো), নিশ্চয় আপনারা দেখবেন।’

গত ৩০ জুন পর্যন্ত সর্বশেষ প্রকাশিত দুর্নীতি দমন কমিশনের এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন আদালতে দুদকের করা প্রায় আট হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে নিম্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে ৩ হাজার ৪৩৮টি মামলা। আর সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে রয়েছে আরও ৪ হাজার ৮১৬টি মামলা।


জাতীয় এর আরও খবর

img

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিসহ তিন কমিটি বিলুপ্ত, বহিষ্কার ১৪

প্রকাশিত :  ১৮:১৩, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও মেয়াদোত্তীর্ণতার কারণে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, মহানগর উত্তর যুবদল এবং মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের বিদ্যমান কমিটি একযোগে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনবিরোধী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুস্পষ্ট অভিযোগে বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন স্তরের ১৪ নেতাকে পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সংশ্লিষ্ট দল ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে পাঠানো পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর এলাকায় মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে’ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। সেই বিতর্কের প্রেক্ষাপটেই দলগুলোর পক্ষ থেকে কঠোর এই সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হলো। তবে প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিগুলোতে মিরপুরের রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনার কোনো উল্লেখ করা হয়নি; বরং বহিষ্কারের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অনৈতিক কার্যক্রমের কারণ এবং যুবদল ও ছাত্রদলের ক্ষেত্রে কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মুহম্মদ মুনির হোসেন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মো. আমিনুল ইসলামকে আহ্বায়ক ও মো. মোস্তফা জামানকে সদস্যসচিব করে গঠিত ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির বিদ্যমান ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে কমিটি বিলুপ্তির কারণ নির্দিষ্ট করা না হলেও খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে মহানগর উত্তরের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়।

একই দিনে বিএনপির অপর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দলের তিন নেতাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃতরা হলেন শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি-ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান শুক্কু। তাঁদের বিরুদ্ধে অনৈতিক আচরণ ও দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।

অন্যদিকে, মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত করেছে যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (দপ্তরের দায়িত্বে) মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন এই বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছেন।

একইভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর পশ্চিম শাখার কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, দ্রুতই এই শাখার নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করা হবে। পাশাপাশি শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের পাঁচ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন মহানগর পশ্চিমের সহসভাপতি সারোয়ার আলম পিয়াস, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম জিন্নাহ, দারুসসালাম থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন দিপু, সদস্যসচিব ওমর নাঈম এবং ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সদস্যসচিব শান্ত রহমান। ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এসব সিদ্ধান্তের অনুমোদন দেন।

দলীয় আদর্শ পরিপন্থী কার্যকলাপে যুক্ত থাকার দায়ে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল থেকেও দুজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সংগঠনের সহদপ্তর সম্পাদক মো. ওসমান গনির পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানী ও সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসানের নির্দেশে দারুসসালাম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. আক্তার হোসেন মামুন ও সদস্যসচিব মো. হাফিজুর রহমানকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সাথে সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাঁদের সঙ্গে যেকোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগ না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর সই করা বিজ্ঞপ্তিতে আরও চার নেতাকে বহিষ্কারের কথা নিশ্চিত করা হয়। বহিষ্কৃতরা হলেন শাহ আলী থানা শ্রমিক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনির হোসেন, শাহ আলী থানা অটোরিকশা শ্রমিক দলের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন, সদস্য হুজাইফা এবং দারুসসালাম থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক গোলাম রসুল পারভেজ। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম খান নাসিম তাঁদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এই ব্যবস্থা অনুমোদন করেন।

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার অনৈতিক ও সংগঠনবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকা মহানগর উত্তরের পল্লবী থানার ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মফিজুর রহমান মামুনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় অবস্থান করে মামুন মিরপুর অঞ্চলে নিজস্ব একটি অপরাধ চক্র নিয়ন্ত্রণ করতেন। দেশে অবস্থানরত তাঁর দুই ভাই জামিল রহমান ও মশিউর রহমানের মাধ্যমে সেই চক্র পরিচালিত হতো। এই চক্রটির বিরুদ্ধে মিরপুরের পল্লবী, মিরপুর ১২, সাগুফতা এবং বাউনিয়া এলাকায় চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা জবরদখল, জমি দখল ও মাদক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের বহু অভিযোগ রয়েছে।

জাতীয় এর আরও খবর