img

কিছূটা স্বস্তি ফিরছে পেঁয়াজের বাজারে

প্রকাশিত :  ১০:০৯, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪

কিছূটা স্বস্তি ফিরছে পেঁয়াজের বাজারে

অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্য হিসেবে আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ায় ও বাজারে নতুন পেঁয়াজ আসায় স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।

আজ শনিবার (২৮ ডিসেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচা, মালিবাগ, রামপুরা এবং বাড্ডা এলাকার বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। খুচরা বাজারে প্রকারভেদে দেশি-বিদেশি কেজিপ্রতি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৯০ টাকায়।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, দেশি পেঁয়াজ ৭০-৮০ টাকা, তবে পাবনার স্পেশাল পেঁয়াজ কেজি প্রতি ৮৫-৯০ টাকা, নতুন মুড়ি কাটা পেঁয়াজ ৫৫-৬০ টাকা এবং ভারতীয় পেঁয়াজ ৬৫-৭০ টাকা। অন্যদিকে বাজারে বড় রসুন কেজিপ্রতি ২৪০-২৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে কারওয়ান বাজারসহ অন্য পাইকারি বাজারে প্রকারভেদে পেঁয়াজ মণ প্রতি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায়।

এর আগে দেশে অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্য পেঁয়াজের দামের লাগাম টানতে কাস্টমস ডিউটি বা শুল্ক এবং রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে এনবিআর। শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ায় ও নতুন পেঁয়াজ আসায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

পেঁয়াজের দাম সম্পর্কে জানতে চাইলে মালিবাগের ব্যবসায়ী মাহিম বলেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আসতে শুরু করেছে, অন্যদিকে নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করেছে। ফলে দাম কমছে।

অন্যদিকে কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা জালাল জানান, গত সপ্তাহের তুলনায় খুচরা বাজারে প্রতি কেজিতে ৫ টাকা কমে নতুন আলু প্রতি কেজি ৩৮-৪৫ টাকা এবং আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৪০-৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সালাম নামের একজন ক্রেতা বলেন, নতুন আলু ও পেঁয়াজ বাজারে প্রচুর পরিমাণে আসায় দাম কমছে। আগামী সপ্তাহে দাম হয়ত আরও কমবে।

তিনি আরও বলেন, পেঁয়াজের বাজারে স্বস্তি এসেছে। আমি ক্রেতা হলেও কৃষি কাজের সঙ্গে আছি। যেহেতু এখন পেঁয়াজের মৌসুম শুরু হয়েছে। সরকারের নজরদারির পাশাপাশি দাম যাতে বেশি না কমে সে বিষয়েও লক্ষ্য রাখা উচিত। এমন পরিস্থিতি হলে আমদানি শুল্ক আরোপ করে হলেও ব্যবস্থা নিতে পারে। তা না হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

img

জেপি মরগান কি সত্যিই আসছে, নাকি আমরা আবারও স্বপ্ন দেখছি?

প্রকাশিত :  ১৮:২৭, ২১ মে ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে অনেক দিন পর আবার একটি নাম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে—জেপি মরগান। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বিনিয়োগ ব্যাংক বাংলাদেশের বাজারে বড় বিনিয়োগ করতে পারে—এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়তেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ব্রোকারেজ হাউস, এমনকি নীতিনির্ধারণী মহলেও এখন একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—তাহলে কি অবশেষে আন্তর্জাতিক বড় পুঁজি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে প্রবেশ করতে যাচ্ছে?

সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই আশাবাদকে আরও উসকে দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী ও সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সংস্কারকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। বিশেষ করে জেপি মরগান বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এসব বক্তব্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে, যেন বাংলাদেশের পুঁজিবাজার খুব শীঘ্রই বৈশ্বিক বিনিয়োগের নতুন গন্তব্য হতে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাস্তবতা কি সত্যিই এতটা উজ্জ্বল?

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাস বলছে, আমরা আশার গল্প অনেক শুনেছি, কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার খুব কমই দেখেছি। বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা প্রায় প্রতি বছরই বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে বাজারের গভীরতা, সুশাসন ও আস্থার সংকট কাটেনি। ফলে জেপি মরগানকে ঘিরে তৈরি হওয়া বর্তমান উচ্ছ্বাসও বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন—জেপি মরগান বর্তমানে বাংলাদেশে যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তা মূলত ট্রেজারি সেবা, বৈদেশিক লেনদেন, আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ও করপোরেট ব্যাংকিংকেন্দ্রিক। এটি কোনো খুচরা ব্রোকারেজ বা সরাসরি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে না। ঢাকায় তাদের প্রতিনিধি কার্যালয় রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি মূলত বৈশ্বিক আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে দেশীয় ব্যাংকগুলোকে সংযুক্ত করার একটি প্ল্যাটফর্ম।

অর্থাৎ জেপি মরগানের বাংলাদেশে সক্রিয়তা মানেই তারা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে এসে বড় অঙ্কের শেয়ার কিনবে—এমন ধারণা বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি আবেগনির্ভর।

বরং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত প্রথমে একটি দেশের আর্থিক শৃঙ্খলা, অডিট ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে। আর ঠিক এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড রিপোর্টিং সামিটে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরাই স্বীকার করেছেন যে, গত এক দশকে ব্যাংক খাতে ব্যাপক অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার এবং ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। অনেক কোম্পানি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হিসাব বিবরণী দিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দীর্ঘ সময় কার্যত অকার্যকর ছিল।

এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজাররা কেন সতর্ক থাকবেন না?

বিশ্বের বড় বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। তারা এমন বাজারে প্রবেশ করে, যেখানে আর্থিক প্রতিবেদন নির্ভরযোগ্য, নীতিগত স্থিতিশীলতা রয়েছে এবং বিনিয়োগকারীর অধিকার সুরক্ষিত। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা দ্রুত কমে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে লাখ লাখ বিও অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়েছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ ধারাবাহিক লোকসানে বাজার ছেড়েছেন। বাজারে তারল্য কমেছে, লেনদেনের গতি কমেছে, আর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সংস্কৃতি দুর্বল হয়েছে।

এ অবস্থায় বিদেশি বড় ফান্ড কেন ঝুঁকি নেবে?

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ অবশ্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে। ‘টি+২’ সেটেলমেন্ট থেকে ‘টি+১’-এ যাওয়া, অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য নিটা অ্যাকাউন্ট সহজ করা, বন্ড বাজার সম্প্রসারণ, সুকুক চালু এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মানের বাজার গঠনে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব সংস্কারের বেশির ভাগই এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে।

বাংলাদেশের আর্থিক খাত বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু রাজনৈতিক আশাবাদ দিয়ে বিনিয়োগ আনা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা এখন বক্তৃতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে। তারা দেখতে চায়—অডিট রিপোর্ট কতটা বিশ্বাসযোগ্য, আদালত কতটা কার্যকর, নিয়ন্ত্রক সংস্থা কতটা স্বাধীন এবং বাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা কঠোর।

জেপি মরগানের আগ্রহের ভেতরে অবশ্যই ইতিবাচক সংকেত আছে। কারণ বৈশ্বিক বড় কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন একটি দেশকে পর্যবেক্ষণ করে, তখন সেটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বার্তা দেয়—দেশটি সম্ভাবনার তালিকায় আছে। কিন্তু সম্ভাবনা আর বাস্তব বিনিয়োগ এক জিনিস নয়।

বাস্তবতা হলো, জেপি মরগান সম্ভবত বাংলাদেশে সরাসরি শেয়ারবাজারে বড় বিনিয়োগের চেয়ে আর্থিক অবকাঠামো, কাস্টডি সেবা, বৈদেশিক পেমেন্ট ও ব্যাংকিং সংস্কারের সুযোগকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের বিপুল রেমিট্যান্স প্রবাহ, তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তাদের জন্য একটি বড় ব্যবসায়িক ক্ষেত্র। ফলে তারা এখানে নিজেদের ট্রেজারি ও পেমেন্ট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বেশি আগ্রহী—এটাই স্বাভাবিক।

তবে এই আগ্রহকে বাংলাদেশের জন্য সুযোগে পরিণত করা সম্ভব। যদি সরকার সত্যিকার অর্থে অডিট জালিয়াতি বন্ধ করতে পারে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে পারে এবং পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে জেপি মরগানের মতো প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি ভবিষ্যতে আরও বড় বিদেশি বিনিয়োগের পথ খুলে দিতে পারে।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখন এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে কেবল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নাম উচ্চারণ করলেই আস্থা ফিরবে না। আস্থা ফিরবে তখনই, যখন বাজারে ন্যায়বিচার থাকবে, আর্থিক তথ্য বিশ্বাসযোগ্য হবে এবং বিনিয়োগকারী বুঝতে পারবেন—এই বাজারে নিয়ম সবার জন্য সমান।

জেপি মরগান আসবে কি না, সেটি হয়তো সময় বলবে। কিন্তু তার আগেই বাংলাদেশের নিজের কাছে একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া জরুরি—আমরা কি সত্যিই বৈশ্বিক বিনিয়োগ গ্রহণের মতো একটি স্বচ্ছ ও পরিপক্ক পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে পেরেছি?