img

আব্রাহাম একর্ড : গ্রেটার ইসরায়েলের কূটনৈতিক যাত্রা

প্রকাশিত :  ০৬:৫৭, ১৪ নভেম্বর ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ০৭:০৩, ১৪ নভেম্বর ২০২৫

আব্রাহাম একর্ড : গ্রেটার ইসরায়েলের কূটনৈতিক যাত্রা

সাইফুল খান

ভূমিকা : ২০২০ সালের ১৩ আগস্ট, হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হয় এক তথাকথিত “ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি” Abraham Accords। নামটি নেওয়া হয়েছে নবী ইব্রাহিম (আঃ)-এর নামে, যিনি ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম তিন ধর্মেরই পিতা হিসেবে বিবেচিত। এই নামকরণ ছিল কৌশলগত, যেন মুসলিম মনস্তত্ত্বে শান্তি, ঐক্য ও ধর্মীয় আবেগ জাগিয়ে প্রকৃত ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য ঢেকে দেওয়া যায়।

তবে বাস্তবতা হলো  আব্রাহাম একর্ড কোনো শান্তি চুক্তি নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে জায়নিস্ট ভূরাজনীতির নতুন অধ্যায়, যার লক্ষ্য “গ্রেটার ইসরায়েল” বাস্তবায়নের পথ তৈরি করা এবং ইরানকে কৌশলগতভাবে ঘিরে ফেলা।

চুক্তির প্রকৃত চরিত্রঃ“Normalization” না “Submission”?

আব্রাহাম একর্ডের মূল কাঠামো হলো আরব দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে “স্বাভাবিক সম্পর্ক” স্থাপন করবে। প্রথমে এতে যুক্ত হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) ও বাহরাইন; পরে সুদান ও মরক্কো।

চুক্তির ঘোষণাপত্রে বলা হয় এটি “মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা” আনবে। কিন্তু এর অন্তরালে যা ঘটেছিল, তা হলো-

আরব দেশগুলোর ওপর আমেরিকার অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বাড়ানো,

ইরানকে একঘরে করা,

প্যালেস্টাইনের প্রশ্নকে প্রান্তিক করে ফেলা,

এবং ইসরায়েলকে আঞ্চলিক বৈধতা প্রদান।

এই প্রক্রিয়াকে অনেক বিশ্লেষক “Normalization” নয়, বরং “Submission” অর্থাৎ ইসরায়েলের প্রতি আত্মসমর্পণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

জায়নিজমের দৃষ্টিকোণ : ইসরায়েল রাষ্ট্র নয়, এক ধর্মীয় প্রজেক্ট

জায়নিজ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য কখনোই শুধু ১৯৪৮ সালের ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিল না। তাদের ধর্মীয় ন্যারেটিভ অনুযায়ী, “Eretz Yisrael” বা গ্রেটার ইসরায়েল হচ্ছে সেই ভূমি, যা নাইল নদী থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ বর্তমান মিশর, জর্ডান, সিরিয়া, ইরাক, সৌদি আরবের অংশবিশেষ সবকিছুই এর আওতায় পড়ে।

Abraham Accords-এর মাধ্যমে ইসরায়েল কার্যত এই “বৃহৎ ভৌগোলিক কল্পরাজ্য”-এর প্রথম সফট সংস্করণ তৈরি করছে সরাসরি দখল নয়, বরং চুক্তি, বাণিজ্য ও সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ।

আমেরিকার উদ্দেশ্য : মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্য ভেঙে দেওয়া

ওয়াশিংটনের কাছে এই চুক্তি কেবল ইসরায়েলকে উপহার নয়; এটি নতুন ভূরাজনৈতিক বিন্যাসের হাতিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরানকে ঘিরে “Sunni-Israel alliance” তৈরি করতে।

একইসাথে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব ঠেকাতে এই অঞ্চলকে আমেরিকান বলয়ে রাখতে। মার্কিন অস্ত্রশিল্পের বাজার নিশ্চিত করতে আরব দেশগুলোর ওপর অস্ত্র নির্ভরতা বাড়ানো।

“Peace for Prosperity” স্লোগানটি তাই আসলে “Peace for American Hegemony” যেখানে শান্তির আড়ালে চলছে অস্ত্র, তেল ও কৌশলগত ঘাঁটির বাণিজ্য।

ইরানকে ঘিরে কৌশল : সামরিক নয়, কূটনৈতিক অবরোধ

ইরান ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বী। তেহরান কখনোই ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি। বরং ফিলিস্তিনকে “ইসলামি ভূমি” ঘোষণা করেছে।

এই অবস্থান মোকাবেলায় আমেরিকা ও ইসরায়েল “Abraham Alliance”-এর মাধ্যমে এমন এক বলয় গঠন করেছে, যা ইরানকে চারপাশ থেকে কূটনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ রাখবে।

পশ্চিমে UAE, বাহরাইন, সৌদি আরব,

পূর্বে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মার্কিন প্রভাব,

উত্তরে আজারবাইজান যেখানে ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি ইতিমধ্যে সক্রিয়।

এভাবে ইরানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক “soft blockade” যুদ্ধ নয়, কূটনৈতিক বেষ্টনী।

সফ্টলি গ্রেটার ইসরায়েল : অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার জালে

“Greater Israel Project”-এর আধুনিক রূপ এখন “Economic Israelization”

UAE–Israel tech collaboration,

Neom (Saudi Mega City) Project-এ ইসরায়েলি অংশগ্রহণ,

Red Sea Economic Corridor,

এবং India–Middle East–Europe Economic Corridor (IMEC)—

 সবই এই “সফ্ট গ্রেটার ইসরায়েল”-এর অবকাঠামো।

এখানে সামরিক দখল নয়, বরং ডিজিটাল, অর্থনৈতিক ও গোয়েন্দা প্রভাবের মাধ্যমে অঞ্চলকে এক ছাতার নিচে আনা হচ্ছে। যার নেতৃত্বে থাকবে ইসরায়েল, আর অর্থ জোগাবে আমিরাত ও সৌদি আরব।

ধর্মীয় প্রতীকবাদের রাজনীতি : “আব্রাহাম” নামের কূটনৈতিক ব্যবহার

চুক্তির নাম “Abraham Accords” এই নামটি শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতি। ইব্রাহিম (আঃ)-এর নামে চুক্তির বার্তা হলো “ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিমরা এক বংশধর, তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত।”

কিন্তু বাস্তবে এই ঐক্য ইসরায়েলকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংহতি তৈরি করছে, যা ইসলামী ঐক্যের বিপরীত। কুরআনে নবী ইব্রাহিম (আঃ)-এর বাণী ছিল তাওহিদের ভিত্তিতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা; আর এই চুক্তিতে তাঁর নাম ব্যবহৃত হচ্ছে দখলদার ন্যায়হীন অবৈধ রাষ্ট্রকে বৈধতা দিতে।

প্যালেস্টাইন : নীরবতার কবরস্থানে নিক্ষিপ্ত ইস্যু

আব্রাহাম একর্ড স্বাক্ষরের পর প্যালেস্টাইনি কর্তৃপক্ষ এটিকে আখ্যা দিয়েছিল “A betrayal” বিশ্বাসঘাতকতা। আরব লীগের সভায় পর্যন্ত প্যালেস্টাইনের প্রস্তাব ফেলে দেওয়া হয়।

এর ফলে প্যালেস্টাইনের মুক্তির প্রশ্ন আজ আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রান্তিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

“Two-State Solution”-এর বদলে বাস্তবে তৈরি হচ্ছে “No-State Reality” যেখানে ফিলিস্তিনের অস্তিত্বই ক্রমে মুছে যাচ্ছে।

ইরানের অবস্থান : “ইসলামি প্রতিরোধ ফ্রন্ট”

ইরান এই চুক্তিকে সরাসরি আখ্যা দিয়েছে—

“A dagger in the back of Muslim Ummah.”

তেহরান ঘোষণা করেছে, আব্রাহাম একর্ড হলো আমেরিকান জায়নিজমের হাতিয়ার যা মুসলিম দেশগুলোকে বিভক্ত করছে। ইরান  “Axis of Resistance” নামে নেটওয়ার্ক গঠন করেছে। হিজবুল্লাহ, হামাস, হুথি, সিরিয়া, ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ইউনিটস (PMU) এই ফ্রন্টকে ব্যবহার করে তারা আঞ্চলিক প্রতিরোধ জারি রেখেছে।

উপসংহার : 

জায়নিজ মতবাদে “Greater Israel” এক ধর্মীয় প্রতিশ্রুতি, এক ধরনের “কিতাবি যাত্রা”। যা তারা রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দিচ্ছে কূটনীতি, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির মাধ্যমে। Abraham Accords সেই যাত্রারই সূচনা বিন্দু, যেখানে পবিত্র নামের আড়ালে চলছে আধুনিক উপনিবেশবাদের পুনর্জন্ম।

আজকের প্রশ্ন হলো- ইব্রাহিম (আঃ)-এর বংশধরেরা কি সত্যিই ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে? নাকি তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এক নতুন জায়নিস্ট সাম্রাজ্য, যার সীমানা কিতাবের পাতা ছাড়িয়ে বাস্তব মানচিত্রে রক্তাক্ত হয়ে উঠছে? আব্রাহাম একর্ড কোনো শান্তির গল্প নয়, বরং এক “নিরব যুদ্ধের নীলনকশা”।

 ইসরায়েল যেখানে ভূমি দখল না করেও নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করছে, আর আমেরিকা সেই নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দিয়ে চলছে, সেখানে মুসলিম বিশ্ব হয়তো বুঝতেই পারেনি “গ্রেটার ইসরায়েল”-এর যাত্রা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, কিতাবি ভাষণে নয়, কূটনৈতিক কলমে।


লেখক - ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।

জাতীয় এর আরও খবর

img

আগামীকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত :  ১৩:৫৮, ১১ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:২৭, ১১ মে ২০২৬

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও টেকসই রূপান্তর নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) জাতীয় কর্মশালা আগামীকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে। কর্মশালার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে দিনব্যাপী এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ।

ইউজিসির জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগ পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান জানান, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করবেন ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ।

তিনি আরো জানান, উদ্বোধনী পর্বের পর পাঁচটি টেকনিক্যাল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। সেসব অধিবেশনে "গ্রাজুয়েটদের কর্মসংযোগযোগ্যতা, সফট স্কিল উন্নয়ন ও চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা; শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা; ডিজিটাল রূপান্তর, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংযোজন; শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণায় উৎকর্ষ এবং আন্তর্জাতিকীকরণ; গভর্ন্যন্স, মান নিশ্চিতকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা করা হবে।

কর্মশালার অংশগ্রহণকারীদের মতামতের ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষা উন্নয়নে বাস্তবায়নযোগ্য নীতিগত পথনকশা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান এই ইউজিসি কর্মকর্তা।