img

চায়ের স্বর্গে বৃষ্টির দাপট: লাউয়াছড়ায় গাছধসে ৬ ছয় ঘণ্টা সড়ক যোগাযোগ বন্ধ , বিপর্যস্ত জনজীবন

প্রকাশিত :  ১৮:০৯, ০২ মে ২০২৬

চায়ের স্বর্গে বৃষ্টির দাপট: লাউয়াছড়ায় গাছধসে ৬ ছয় ঘণ্টা সড়ক যোগাযোগ বন্ধ , বিপর্যস্ত জনজীবন

সংগ্রাম দত্ত: পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল—সবুজ চা-বাগান আর শান্ত প্রকৃতির জন্য পরিচিত এই জনপদে টানা বর্ষণ যেন ভিন্ন এক চিত্র এঁকেছে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলজুড়ে শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দিনভর থেমে থেমে ভারী বৃষ্টিতে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ডও উঠে এসেছে এই অঞ্চল থেকে—মাত্র ৩০ ঘণ্টায় ১৬০ দশমিক ৬ মিলিমিটার।

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান শনিবার (২ মে) দুপুরে জানান, শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই বিপুল বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, আগামী কয়েক দিন এই অঞ্চলে বৃষ্টির ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।

এই অবিরাম বর্ষণের মধ্যেই শনিবার সকালে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ‘গাড়িভাঙা’ এলাকায় টিলা ধসে বড় গাছ সড়কের ওপর ভেঙে পড়ে। এতে কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল আঞ্চলিক সড়কে প্রায় ৩ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে বনবিভাগ ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে গাছ অপসারণ করা হলে যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।

তবে পরিস্থিতি এখানেই থেমে থাকেনি। দুপুরের দিকে কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে একই এলাকায় আবারও একাধিক বড় গাছ উপড়ে পড়ে। এতে টানা প্রায় ৬ ঘণ্টা সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। উভয় পাশে আটকা পড়ে শত শত যানবাহন—দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত গাড়ি—সবকিছুই থমকে যায় প্রকৃতির কাছে।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের শ্রীমঙ্গল রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নামজুল হক গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, আকস্মিক ঝড়ো বৃষ্টিতে বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বড় গাছ উপড়ে পড়ে। ফলে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। উদ্ধারকাজে বনবিভাগ, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ একযোগে কাজ করলেও বড় আকারের গাছ এবং দুর্গম অবস্থানের কারণে কাজ ধীরগতিতে এগোয়।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়ক থেকে গাছ সরিয়ে যোগাযোগ স্বাভাবিক করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

অন্যদিকে, টানা বৃষ্টিতে শুধু সড়ক যোগাযোগই নয়, পুরো জনজীবনেই নেমে এসেছে বিপর্যয়। উপজেলার বিভিন্ন বাজারে পানি জমে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, অনেক নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সকাল থেকে বাজারে মানুষের উপস্থিতি প্রায় নেই, ফলে বেচাকেনা একপ্রকার বন্ধ।

কৃষিখাতেও পড়েছে এর সরাসরি প্রভাব। কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, উপজেলায় ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে আকস্মিক পানিতে ৭০ হেক্টর সম্পূর্ণ এবং ৩৫০ হেক্টর আংশিক তলিয়ে গেছে। ধলাই নদীর পানি এখনও বিপদসীমার নিচে থাকলেও পাহাড়ি ছড়াগুলোর পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চলে ঢুকে পড়ছে।

এদিকে, অব্যাহত বৃষ্টিপাতে জেলার বিভিন্ন টিলায় ধসের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া অফিস ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে।

সবুজে ঘেরা লাউয়াছড়ার এই সড়কটি সাধারণত পর্যটকদের কাছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। কিন্তু টানা বর্ষণ আর ঝড়ের তাণ্ডবে সেই পথই এখন দুর্ভোগের প্রতীক। প্রকৃতির রূপ যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি তার রুদ্ররূপও যে কতটা কঠিন—এই কয়েক ঘণ্টার ঘটনাই যেন তার স্পষ্ট প্রমাণ।



সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

ভাঙনের মুখে সুরমা চা বাগানের সেতু—সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়, দ্রুত সংস্কারের দাবি

প্রকাশিত :  ১৬:৩২, ০৩ মে ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: পর্যটনের অপার সম্ভাবনা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা সিলেট বিভাগে প্রবেশের অন্যতম পথ মাধবপুরের সুরমা চা বাগান। ঢাকা থেকে সড়কপথে সিলেটে ঢোকার সময় এই বাগান যেন এক সবুজ দরজা—যা স্বাগত জানায় পাহাড়, টিলা আর চায়ের সারি-সারি বাগানের সৌন্দর্যে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মাঝেই এখন দেখা দিয়েছে এক গুরুতর সংকট। বাগানে প্রবেশের প্রধান সেতুটি ভাঙনের মুখে, যা স্থানীয়দের জন্য ক্রমেই বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটির বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পর্যটকসহ সাধারণ মানুষ। সামান্য একটি দুর্ঘটনাও বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কা এখন সবার মনে।

সুরমা চা বাগান শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাগানের উৎপাদন, শ্রমিকদের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনের প্রধান ভরসা এই সেতু। সেতুটি অচল হয়ে পড়লে বাগানের সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে চা উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। একই সঙ্গে ভূমিধস বা কাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।

এদিকে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। Nature’s Notebook নামের একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পর মুহূর্তের মধ্যেই তা ভাইরাল হয়ে পড়ে। অসংখ্য মন্তব্য, শেয়ার ও প্রতিক্রিয়ায় ভরে ওঠে অনলাইন জগৎ। অনেকেই সেতুটির বর্তমান অবস্থার ছবি তুলে ধরে দ্রুত সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন, কেউ কেউ সম্ভাব্য দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

পর্যটন শিল্পের দিক থেকেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। সিলেটগামী পর্যটকদের কাছে এই পথটি এক আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণে নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হলে পর্যটকদের আগ্রহ কমে যেতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

মাধবপুর উপজেলার অধিবাসীরা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি, সরকারি অনুদান অথবা চা বাগান কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে সেতুটির সংস্কার জরুরি ভিত্তিতে সম্পন্ন করতে হবে। সময়মতো উদ্যোগ না নিলে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ হারানোর পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সবুজের এই প্রবেশদ্বারকে টিকিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়ন। নইলে সুরমা চা বাগানের এই সেতু শুধু একটি কাঠামো নয়—এটি হয়ে উঠতে পারে এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয়ের প্রতীক।



সিলেটের খবর এর আরও খবর