img

কোদালিছড়া বন্ধ, শহর বন্দী: জলাবদ্ধতায় মৌলভীবাজার শহর ও শহরতলী

প্রকাশিত :  ১৮:৩৮, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

কোদালিছড়া বন্ধ, শহর বন্দী: জলাবদ্ধতায় মৌলভীবাজার শহর ও শহরতলী

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারে গ্রীষ্মের শেষভাগ মানেই এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা—বর্ষা পুরোপুরি না নামলেও হঠাৎ ঝড়, দমকা হাওয়া আর বজ্রসহ বৃষ্টিতে শহরের প্রকৃত চিত্র বারবার উন্মোচিত হয়। সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই যখন একটি শহর পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন সেটি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের গল্প থাকে না; হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা আর অবহেলার নির্মম প্রতিচ্ছবি।

গত সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তুলনামূলক স্বল্প সময়ের বৃষ্টিতেই মৌলভীবাজার পৌর শহরের রাস্তাঘাট ডুবে যায়, দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে, অসংখ্য পরিবারের ঘরে প্রবেশ করে বৃষ্টির পানি। কারো ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারো আসবাবপত্র নষ্ট হয়েছে, কারো জীবনের সঞ্চয় এক রাতেই ভেসে গেছে। অথচ এই দৃশ্য নতুন নয়—বরং বছর ঘুরে ঘুরে ফিরে আসা এক চেনা দুর্ভোগ।

এই সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে কোদালিছড়া—পৌরসভার পানি নিষ্কাশনের প্রধান এবং কার্যত একমাত্র মাধ্যম। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে পানির প্রবাহ থাকার কথা, সেখানে এখন দেখা যায় স্থির, বদ্ধ পানি। ছড়ার বুকে ভাসে পলিথিন, ময়লা-আবর্জনা; বাতাসে ছড়ায় দুর্গন্ধ। আশপাশের মানুষের জন্য এটি শুধু অসুবিধাই নয়, এক ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিরও নাম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছড়ার ভাটিতে তৈরি হওয়া কয়েকটি অস্থায়ী বাঁধই এই সংকটের অন্যতম মূল কারণ। এসব বাঁধ পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে, ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারছে না। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে বহুবার সতর্ক করা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কিছু এলাকায় আংশিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হলেও সমস্যার মূল জায়গাগুলো অরক্ষিতই থেকে গেছে।

ড্রেনেজ ব্যবস্থার অবস্থাও কম করুণ নয়। শহরের অনেক ড্রেন ময়লা ও প্লাস্টিকে ভরে গেছে; কোথাও কোথাও ড্রেনের অস্তিত্বই বোঝা যায় না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং নাগরিক অসচেতনতা—সব মিলিয়ে একটি অচল ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে, যার খেসারত দিচ্ছে পুরো শহর।

একসময় অবশ্য এই পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিল।

২০১৮ সালে কোদালিছড়া সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থাও ছিল। নাগরিকদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে প্রতিদিন ছড়ার পরিচর্যা করা হতো। সেই উদ্যোগের ফলে কয়েক বছর জলাবদ্ধতার তীব্রতা কমে এসেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে। প্রশ্ন উঠছে—যে অর্থ এখনো নাগরিকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে, তার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি?

বর্তমানে পৌরসভায় কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় শহর পরিচালিত হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় দ্রুততা ও জবাবদিহিতার অভাব স্পষ্ট। সম্ভাব্য নেতৃত্বের কথা শোনা গেলেও এই সংকটকালে তাদের দৃশ্যমান ভূমিকা খুব একটা চোখে পড়ে না।

তবে দায় শুধু প্রশাসনের নয়। নাগরিক হিসেবেও দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। ড্রেনে ময়লা ফেলা, প্লাস্টিক ব্যবহারে উদাসীনতা—এসব আচরণ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। টেকসই সমাধানের জন্য তাই দরকার সমন্বিত উদ্যোগ—প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোদালিছড়াকে সচল করা, ভাটির বাঁধগুলো দ্রুত অপসারণ, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার—এই চারটি পদক্ষেপ এখন জরুরি। নইলে সামনে আসা পূর্ণ বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখানো হয়েছে বহুবার। কিন্তু একটি শহর যদি নিজের বৃষ্টির পানি সামলাতে না পারে, তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

২৭ এপ্রিলের রাত যেন আরেকটি সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। এখনো সময় আছে—সঠিক সিদ্ধান্ত আর কার্যকর উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। কারণ একটি শহর শুধু অবকাঠামোর সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বপ্ন আর টিকে থাকার প্রতিচ্ছবি।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

শ্রীমঙ্গলে রান্নাঘর থেকে জীবিত কোবরা সাপ উদ্ধার

প্রকাশিত :  ০৭:২৬, ১৩ মে ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: চায়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গলে এবার লোকালয়ের একটি বাড়ির রান্নাঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একটি অত্যন্ত বিষধর কোবরা সাপ। হঠাৎ রান্নাঘরে ফণা তুলে থাকা সাপ দেখে আতঙ্কে চিৎকার শুরু করেন ঘরের নারীরা। পরে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের তৎপরতায় প্রায় ২০ মিনিটের অভিযানে সাপটিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুর আনুমানিক ১টা ২০ মিনিটে শ্রীমঙ্গল উপজেলার জানাউড়া গ্রামে তারেক আহমেদের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। 

পরিবার সূত্রে জানা যায়, রান্নাঘর পরিষ্কার করার সময় ঘরের নারীরা আচমকা ফোঁসফোঁস শব্দ শুনতে পান। শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে তারা দেখতে পান, রান্নাঘরের একটি ইঁদুরের গর্তে ফণা তুলে বসে আছে ভয়ংকর এক কোবরা সাপ। মুহূর্তেই পুরো বাড়িতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

চিৎকার শুনে বাড়ির মালিক তারেক আহমেদ ঘটনাস্থলে ছুটে এসে সাপটিকে কুচা দিয়ে মারার চেষ্টা করেন। তবে সাপটির হিংস্র ভঙ্গি ও ফণা তোলা অবস্থা দেখে তিনি আর এগোতে সাহস পাননি।

পরে স্থানীয় সাংবাদিক আল আমিন বিষয়টি বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে জানালে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ। তারা গিয়ে দেখতে পান, সাপটি গর্তের ভেতরে অবস্থান করছে এবং এটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী বিষধর কোবরা, যা সাধারণত লোকালয়ে খুব কম দেখা যায়।

দীর্ঘ প্রায় ২০ মিনিটের সতর্ক অভিযানের পর সাপটিকে কোনো ক্ষতি ছাড়াই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। পরে উদ্ধারকৃত কোবরা সাপটি শ্রীমঙ্গল বনবিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পরিবেশকর্মীরা জানান, শ্রীমঙ্গল উপজেলা পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও বিস্তীর্ণ জঙ্গলবেষ্টিত হওয়ায় এটি বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বনভূমি দখল, অবৈধ বসতি স্থাপন এবং বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ ও খাদ্যসংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।

স্থানীয়দের মতে, জানাউড়া গ্রামের ঘটনাটি কেবল একটি সাপ উদ্ধারের ঘটনা নয়; বরং এটি বন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার একটি বাস্তব চিত্রও তুলে ধরেছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর