img

শ্রীমঙ্গলে অবৈধ বালু উত্তোলনের দৌরাত্ম্য: পুলিশের অভিযানে ৬ ট্রাক আটক, তবুও সক্রিয় সিন্ডিকেট

প্রকাশিত :  ১১:২৭, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে অবৈধ বালু উত্তোলনের দৌরাত্ম্য: পুলিশের অভিযানে ৬ ট্রাক আটক, তবুও সক্রিয় সিন্ডিকেট

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকলেও থামছে না সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। সর্বশেষ অভিযানে ৬টি ট্রাক আটক করা হলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ভোররাতে উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নে পরিচালিত অভিযানে বালুবিহীন ৬টি ট্রাক জব্দ করে পুলিশ। শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম মুন্না গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, আটককৃত ট্রাকগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান চলমান থাকবে।

তবে একই দিন সকালে দৈনিক কালের কণ্ঠের স্থানীয় প্রতিনিধি মোহাম্মদ আল-আমিন তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও পোস্ট করে পরিস্থিতির ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, “দেখুন তাদের দুঃসাহস! সিন্দুরখান ইসলামপুর বটতলা এলাকার প্রধান সড়কের পাশেই প্রকাশ্যে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। আগে যেখানে আড়ালে-আবডালে এ কাজ হতো, এখন তা একেবারে প্রকাশ্যেই চলছে।” দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানান তিনি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর শ্রীমঙ্গল—পাহাড়, বনাঞ্চল, চা বাগান আর অসংখ্য ছড়া-নদীতে সমৃদ্ধ এই জনপদ—আজ অবৈধ বালু উত্তোলনের চাপে বিপর্যস্ত। প্রতিদিন ছড়া ও ছোট নদীগুলো থেকে নির্বিচারে বালু তুলে ট্রাকে করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে।

এই অবৈধ কর্মকাণ্ড শুধু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে না, বাড়িয়ে তুলছে জননিরাপত্তার ঝুঁকিও। ইতোমধ্যে বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় ভুনবীর ইউনিয়নের পাত্রীকুল ও সিন্দুরখান ইউনিয়নের বাজার এলাকায় এক শিক্ষার্থী ও এক শিশুকন্যাসহ কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কিছুদিন পরই পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে চক্রটি।

অভিযোগ রয়েছে, শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে দি হেলদি চয়েজ এন্ড ফুড বেভারেজ ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের পূর্ব পাশের জাগছড়া এলাকায় রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে ট্রাকে করে শিল্পপতি সিরাজুল ইসলাম হারুন মিয়া, শুকুর নমঃশূদ্র, অঞ্জু বর্মন ও শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর ভূমির উপর দিয়ে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। এই কাজে স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজনের সম্পৃক্ততার কথাও শোনা যাচ্ছে। একই গ্রামে অঞ্জু বর্মনের ভূমির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া জাগছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে পাশেই মজুদ করে রাখা হয় এবং সেখান থেকেই সরবরাহ করা হয় বলে জানা গেছে। এমনকি স্থানীয় এক নারী সদস্যের নেতৃত্বে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে ট্রাক, চালক, হেলপার কিংবা শ্রমিকরা আটক হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন অধরা। ফলে বন্ধ হচ্ছে না এই অবৈধ ব্যবসা।

এদিকে স্থানীয় সাংবাদিক মো. সাইফুল ইসলাম তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দাবি করেছেন, অবৈধ বালু বাণিজ্যের পেছনে প্রভাবশালী একটি মহল কাজ করছে, যেখানে স্থানীয় এক প্রভাবশালী সাংবাদিক তদবিরে জড়িত ।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে—অভিযান আর আটকের মধ্যেই কি সীমাবদ্ধ থাকবে প্রশাসনের ভূমিকা, নাকি এবার ভেঙে ফেলা হবে অবৈধ বালু সিন্ডিকেটের শক্ত ঘাঁটি? শ্রীমঙ্গলের পরিবেশ, জননিরাপত্তা এবং আইনের শাসন রক্ষায় কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপের দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

স্বপ্নপূরণের পথে চা শিল্পাঞ্চলের ছয় কন্যা

প্রকাশিত :  ১৯:৫৯, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: চা-বাগানের শ্রমজীবী পরিবারে বেড়ে ওঠা মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষা এখনো অনেকটাই কঠিন পথ। সীমিত আয়, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা আর সুযোগের অভাব—সব মিলিয়ে সেই পথ প্রায়ই থমকে যায় মাঝপথে। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে অতিক্রম করে এবার সিলেট বিভাগের বিভিন্ন চা-বাগান এলাকা থেকে উঠে আসা ছয়জন কন্যা স্বনামধন্য Asian University for Women (AUW)-এ ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন, তাও আবার পূর্ণ বৃত্তিতে।

এই অর্জন শুধু ছয়জন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং চা-বাগানভিত্তিক একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য আশার আলো।

নতুন সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীরা হলেন— মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার লংলা চা বাগানের শ্রাবনী কৈরী, শ্রাবন্তী কৈরী, লাকি নাইডু ও পুনম লোহার; জুড়ী উপজেলার ধামাই চা বাগানের অনিমা রানী পাল এবং হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার চাকলাপুঞ্জি চা বাগানের সৃষ্টি চাষা। এদের মধ্যে চারজন কুলাউড়া উপজেলার, একজন জুড়ী এবং একজন চুনারুঘাট উপজেলা এলাকার।

ইতোমধ্যে তাদের প্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। আগামী মাসে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নতুন শিক্ষাজীবন শুরু করবেন।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া একটি ধারাবাহিক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য ছিল চা-বাগান এলাকার পিছিয়ে পড়া মেয়েদের উচ্চশিক্ষার আওতায় আনা। শুরুতে মাত্র সাতজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এই কর্মসূচির আওতায় ৮৫ জন শিক্ষার্থী Asian University for Women-এ ফুল স্কলারশিপে পড়াশোনা করছেন।

এ পর্যন্ত ১৫ জন শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ৩ জন স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, আবার কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন—যার মধ্যে ফ্রান্সের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গাও রয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষাবিদদের মতে, এই স্কলারশিপ কর্মসূচি কেবল শিক্ষার সুযোগই তৈরি করছে না, বরং চা-বাগান সমাজে ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের পথও উন্মুক্ত করছে। মেয়েদের শিক্ষায় আগ্রহ বাড়ছে, পরিবারগুলোর মানসিকতা বদলাচ্ছে, এবং ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে আত্মবিশ্বাসী এক নতুন প্রজন্ম।

সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল উপজেলার সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও লেখক মোঃ একরামুল কবির এই তথ্যগুলো তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এই অর্জন প্রমাণ করে—সুযোগ ও সহায়তা পেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মেয়েরাও উচ্চশিক্ষায় নিজেদের জায়গা করে নিতে সক্ষম।

চা-বাগানের এই ছয় কন্যার পথচলা তাই কেবল একটি সাফল্যের গল্প নয়; এটি সম্ভাবনার নতুন দরজা খোলার গল্প—যা আগামী দিনে আরও অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর