শ্রীমঙ্গলে অবৈধ বালু উত্তোলনের দৌরাত্ম্য: পুলিশের অভিযানে ৬ ট্রাক আটক, তবুও সক্রিয় সিন্ডিকেট
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকলেও থামছে না সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। সর্বশেষ অভিযানে ৬টি ট্রাক আটক করা হলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ভোররাতে উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নে পরিচালিত অভিযানে বালুবিহীন ৬টি ট্রাক জব্দ করে পুলিশ। শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম মুন্না গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, আটককৃত ট্রাকগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান চলমান থাকবে।
তবে একই দিন সকালে দৈনিক কালের কণ্ঠের স্থানীয় প্রতিনিধি মোহাম্মদ আল-আমিন তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও পোস্ট করে পরিস্থিতির ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, “দেখুন তাদের দুঃসাহস! সিন্দুরখান ইসলামপুর বটতলা এলাকার প্রধান সড়কের পাশেই প্রকাশ্যে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। আগে যেখানে আড়ালে-আবডালে এ কাজ হতো, এখন তা একেবারে প্রকাশ্যেই চলছে।” দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানান তিনি।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর শ্রীমঙ্গল—পাহাড়, বনাঞ্চল, চা বাগান আর অসংখ্য ছড়া-নদীতে সমৃদ্ধ এই জনপদ—আজ অবৈধ বালু উত্তোলনের চাপে বিপর্যস্ত। প্রতিদিন ছড়া ও ছোট নদীগুলো থেকে নির্বিচারে বালু তুলে ট্রাকে করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে।
এই অবৈধ কর্মকাণ্ড শুধু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে না, বাড়িয়ে তুলছে জননিরাপত্তার ঝুঁকিও। ইতোমধ্যে বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় ভুনবীর ইউনিয়নের পাত্রীকুল ও সিন্দুরখান ইউনিয়নের বাজার এলাকায় এক শিক্ষার্থী ও এক শিশুকন্যাসহ কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কিছুদিন পরই পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে চক্রটি।
অভিযোগ রয়েছে, শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে দি হেলদি চয়েজ এন্ড ফুড বেভারেজ ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের পূর্ব পাশের জাগছড়া এলাকায় রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে ট্রাকে করে শিল্পপতি সিরাজুল ইসলাম হারুন মিয়া, শুকুর নমঃশূদ্র, অঞ্জু বর্মন ও শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর ভূমির উপর দিয়ে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। এই কাজে স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজনের সম্পৃক্ততার কথাও শোনা যাচ্ছে। একই গ্রামে অঞ্জু বর্মনের ভূমির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া জাগছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে পাশেই মজুদ করে রাখা হয় এবং সেখান থেকেই সরবরাহ করা হয় বলে জানা গেছে। এমনকি স্থানীয় এক নারী সদস্যের নেতৃত্বে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে ট্রাক, চালক, হেলপার কিংবা শ্রমিকরা আটক হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন অধরা। ফলে বন্ধ হচ্ছে না এই অবৈধ ব্যবসা।
এদিকে স্থানীয় সাংবাদিক মো. সাইফুল ইসলাম তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দাবি করেছেন, অবৈধ বালু বাণিজ্যের পেছনে প্রভাবশালী একটি মহল কাজ করছে, যেখানে স্থানীয় এক প্রভাবশালী সাংবাদিক তদবিরে জড়িত ।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে—অভিযান আর আটকের মধ্যেই কি সীমাবদ্ধ থাকবে প্রশাসনের ভূমিকা, নাকি এবার ভেঙে ফেলা হবে অবৈধ বালু সিন্ডিকেটের শক্ত ঘাঁটি? শ্রীমঙ্গলের পরিবেশ, জননিরাপত্তা এবং আইনের শাসন রক্ষায় কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপের দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।



















