দুই শত বছরের ঐতিহ্যে চড়ক উৎসব: কমলগঞ্জে সম্প্রীতির মহামিলন
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ১নং রহিমপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ছয়চিরি দিঘীর পাড়ে দুই শত বছরের প্রাচীন চড়ক পূজা ও গ্রামীণ মেলা বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত এ উৎসব ঘিরে কয়েকদিন ধরেই ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ, যার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৫ এপ্রিল বিকেলে চড়কপূজার মধ্য দিয়ে।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল থেকেই ছয়চিরি দিঘীর চারপাশে মানুষের ঢল নামে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থী, পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের পদচারণায় পুরো এলাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
চড়ক উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল তান্ত্রিক রীতিনীতি ও রোমাঞ্চকর আচার-অনুষ্ঠান। প্রায় ১০-১২ দিন ব্রত পালন শেষে ৪০ থেকে ৫০ জন সন্ন্যাসী অংশ নেন নানা কৃচ্ছ্রসাধনে। জ্বলন্ত আগুনের ওপর ‘কালীনাচ’ এবং ধারালো দা’র ওপর ‘শিব শয্যা’র মতো রোমাঞ্চকর আচার উপস্থিত হাজারো দর্শককে মুগ্ধ করে।
ঐতিহ্যবাহী দিঘীর উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ পাড়ে স্থাপিত চারটি চড়ক গাছে সন্ন্যাসীদের পিঠে বড়শি গেঁথে ঘোরানোর দৃশ্য দেখতে ভিড় জমে দেশ-বিদেশের পর্যটক ও ভক্তদের। ভক্তরা ফুল, দুধ ও চিনি নিবেদন করে পূজা অর্চনা করেন।
পূজাকে কেন্দ্র করে দিঘীর চারপাশ জুড়ে বসে বিশাল গ্রামীণ মেলা। নাগরদোলা, মাটির তৈজসপত্র, বাঁশ-বেতের সামগ্রী এবং খৈ-বাতাসার দোকানে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়।
চড়ক পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অনিরুদ্ধ প্রসাদ রায় চৌধুরী বলেন, “এই উৎসব এখন আর শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।”
উৎসবটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মেলা প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পাশাপাশি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য দুরুদ আহমদ, সাবেক পৌর কাউন্সিলর স্বাগত কিশোর দাস চৌধুরী, উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্যামল চন্দ্র দাশ, সাধারণ সম্পাদক প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ, উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি শংকর লাল সাহাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা মেলা পরিদর্শন করে পূজারীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, র্যাব ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী সক্রিয় ছিল।
এদিকে একই দিন কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী মাধবপুর ইউনিয়নের পাত্রখোলা চা বাগান মাঠেও অনুষ্ঠিত হয় চড়ক পূজা ও মেলা। উভয় স্থানে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
দুই দিনব্যাপী এই বর্ণিল আয়োজন আবারও প্রমাণ করেছে—গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন এখনো অটুট রয়েছে কমলগঞ্জের মাটিতে।



















