img

সিলেটে বন দখল ও বন্যপ্রাণীর সংকট: ছায়া অর্থনীতি, আইনের ফাঁক ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

প্রকাশিত :  ০৬:২২, ০৮ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:৪৩, ০৮ এপ্রিল ২০২৬

সিলেটে বন দখল ও বন্যপ্রাণীর সংকট: ছায়া অর্থনীতি, আইনের ফাঁক ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

সংগ্রাম দত্ত: সিলেটের বনভূমি আজ বহুমুখী চাপে বিপর্যস্ত। একদিকে প্রভাবশালী দখলদারদের আগ্রাসন, অন্যদিকে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও আইনি জটিলতা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল সংকট। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে মোট ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭১৪ একর বনভূমির মধ্যে প্রায় ৫৮ হাজার একরই বর্তমানে অবৈধ দখলে। গোয়াইনঘাট উপজেলায় সবচেয়ে বেশি—২০ হাজার একরেরও বেশি জমি বেদখলে রয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ এবং অপ্রকাশিত দখলের পরিমাণ আরও বেশি।

দখলের ছায়া অর্থনীতি: প্রভাব, পুঁজি ও দালাল চক্র

বনভূমি দখল এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়ম নয়; এটি একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক কার্যক্রমে রূপ নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থবল এবং স্থানীয় দালাল নেটওয়ার্কের সহায়তায় বনভূমি দখল করে তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

চা বাগান, পর্যটন রিসোর্ট, কৃষিজমি এবং বসতবাড়ি—সবকিছুই গড়ে উঠছে বনভূমির ভেতরে। মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, যা দেশের অন্যতম জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল, সেখানেও দখলের বিস্তার ঘটেছে। বনের ভেতরে বাগমারা গ্রামের বিস্তার এবং পর্যটনের নামে স্থাপনা নির্মাণ এই দখল প্রক্রিয়াকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

কয়েক বছর আগে ব্যারিস্টার সুমন সরেজমিনে লাউয়াছড়ায় গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে প্রভাবশালী দখলদারদের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ তোলেন। তার এই উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে একই ধরনের তথ্য উঠে আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মজিবুর রহমান চৌধুরীও ৭১ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে বনভূমিতে রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।

আইনের ফাঁক ও দীর্ঘসূত্রতা

দখল সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ আইনি জটিলতা। বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার একরের বেশি জমি নিয়ে মামলা বিচারাধীন, যার অনেকগুলো ২০-২২ বছর ধরে নিষ্পত্তিহীন।

দখলদাররা আদালতের আশ্রয় নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে, ফলে দ্রুত উচ্ছেদ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।

এছাড়া ‘প্রস্তাবিত বনভূমি’ বা ৪ ধারা সংক্রান্ত অস্পষ্টতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব জমি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা না হওয়ায় জেলা প্রশাসন অনেক সময় ইজারা প্রদান করে থাকে—যা দখলকে আরও উৎসাহিত করছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সীমিত জনবল, পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাব এবং নজরদারির ঘাটতির কারণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিস্তার

বনভূমি দখলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বালু উত্তোলন সিন্ডিকেট, ভূমিদস্যু এবং দালালচক্র। এই নেটওয়ার্ক অত্যন্ত সংগঠিত এবং প্রভাবশালী।

অভিযোগ রয়েছে, তারা প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জমিও দখল করছে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে অনেকেই আইনি প্রতিকার চাইতে সাহস পান না।

স্থানীয় পর্যায়ে এমন অভিযোগও রয়েছে যে, জনমত প্রভাবিত করতে কিছু ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের একটি অংশকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বন উজাড়ের ফল: লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর হানা

বনভূমি ধ্বংসের ফলে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটছে বন্যপ্রাণীর আচরণে। খাদ্য ও আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় তারা ক্রমেই লোকালয়ের দিকে আসছে।

ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে আতঙ্কিত জনতা প্রাণীগুলোকে হত্যা করছে, আবার অনেক সময় মানুষও ঝুঁকিতে পড়ছে।

গত ৬ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টাফ কোয়ার্টারের তৃতীয় তলার একটি বাসার ভেন্টিলেটরে একটি কালনাগিনী সাপ দেখা গেলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

খবর পেয়ে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাপটি উদ্ধার করে এবং পরে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে।

সংস্থাটির তথ্যমতে, গত দেড় দশকে তারা হাজারেরও বেশি বন্যপ্রাণী—বিশেষ করে অজগর ও বিষাক্ত সাপ—লোকালয় থেকে উদ্ধার করেছে।

তবে বনভূমি উজাড়ের কারণে এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে, যা স্থানীয় জনমনে স্থায়ী আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।

আংশিক সাফল্য, সীমিত অগ্রগতি

বন বিভাগ কিছু ক্ষেত্রে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে জমি উদ্ধার করছে। লাউয়াছড়ায় সম্প্রতি প্রায় পাঁচ একর জমি পুনরুদ্ধার করে সেখানে বনায়ন ও মুর্তা চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে বিশাল দখলকৃত জমির তুলনায় এই সাফল্য খুবই সীমিত, যা সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নয়নে যথেষ্ট নয়।

করণীয়: সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—

বনভূমির সঠিক সীমানা নির্ধারণ ও ডিজিটাল মানচিত্রায়ন

দীর্ঘমেয়াদি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি

প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কার্যকর অভিযান

বন বিভাগের জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি

স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধি

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

শেষকথা

সিলেটের বনভূমি কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের নিরাপদ ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এই বনভূমি রক্ষা করা না গেলে, শুধু গাছপালা নয়—হারিয়ে যাবে অসংখ্য প্রাণ, ভেঙে পড়বে পরিবেশের ভারসাম্য, আর মানুষকে মোকাবিলা করতে হবে এক অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবিষ্যৎ।



সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

হবিগঞ্জে জমির বিরোধ নিয়ে সংঘর্ষে কলেজ ছাত্র নিহত, আহত অন্তত ২০

প্রকাশিত :  ১১:৩৭, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলাস্থ বেগমপুর গ্রামে সরকারী জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মঞ্জুর মিয়া (২৩) নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।

নিহত মঞ্জুর মিয়া ওই গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে এবং নবীগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র।

রবিবার (১৯ এপ্রিল) সকালে উপজেলার করগাঁও ইউনিয়নের বেগমপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৃত আব্দুল হাসিমের ছেলে খলিলুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে সরকারী জমিতে বসবাস করে আসছিলেন। একই গ্রামের হেলাল মিয়া ও মনিরুজ্জামান ওই জমি নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় রবিবার সকালে হেলাল ও মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জমি দখলের চেষ্টা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষে মঞ্জুর মিয়াসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। আহতদের নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মঞ্জুর মিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন সাফি মিয়া (৩২), মুজিবুর রহমান (৩২), শামিম মিয়া (৫০), মামুন মিয়া (৩১), জুনেদ মিয়া (২৮), রুহেল মিয়া (৩৮), ইমন মিয়া (১৭), কাউছার মিয়া (২২), জুয়েল আহমেদ (৩২)সহ আরও অনেকে। বাকিরা বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিয়েছেন।

খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

নিহতের বাবা খলিলুর রহমান অভিযোগ করেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে তারা ওই জমিতে বসবাস করে আসছেন। প্রতিপক্ষ জোরপূর্বক উচ্ছেদের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল এবং ঘটনার দিন ভাড়াটিয়া লোকজন নিয়ে হামলা চালিয়ে তার ছেলেকে হত্যা করা হয়।

এ বিষয়ে থানার ওসি (তদন্ত) দুলাল মিয়া জানান, সরকারী জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর