হাওরের বুকজুড়ে দুঃসহ ঋতু: অকাল বন্যা, বজ্রপাত আর বেঁচে থাকার লড়াই
সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর জনপদ—মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—প্রকৃতির এক অনন্য দান। বর্ষায় এ অঞ্চল পরিণত হয় বিস্তীর্ণ জলরাশিতে, আর শুষ্ক মৌসুমে সবুজ ধানের সমারোহে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে প্রতি বছরই লুকিয়ে থাকে এক গভীর অনিশ্চয়তা, যা কৃষকের জীবনে নিয়ে আসে দুঃসহ সংগ্রাম।
চলতি বছরের অকাল বন্যা যেন সেই পুরনো ক্ষতকে আবার নতুন করে উসকে দিয়েছে। পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টির চাপে হাওরের ফসল তলিয়ে গেছে সময়ের আগেই। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের নিচু হাওরগুলোতে বোরো ধান কাটার আগেই পানির নিচে হারিয়ে গেছে কৃষকের বছরের একমাত্র ভরসা। অনেক জায়গায় যেখানে ধান কাটা হয়েছিল, সেখানেও নতুন বিপদ—ভেজা ধান সংরক্ষণের সংকট।
হাওরের ভৌগোলিক বাস্তবতা এখানে বড় বাধা। শুকনো খলা নেই, নেই আধুনিক শুকানোর ব্যবস্থা। ফলে কাটা ধান আর্দ্রতায় পচে যায়, কখনও অঙ্কুরিত হয়ে পড়ে। কৃষক বাধ্য হন কম দামে ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে সাইলো ও মেকানিক্যাল ড্রায়ার স্থাপন করা গেলে এই ক্ষতির বড় অংশই রোধ করা সম্ভব।
এদিকে আরেকটি নীরব আতঙ্ক ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে—বজ্রপাত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতের হার বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকদের জন্য এটি এখন এক প্রাণঘাতী ঝুঁকি। সুনামগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলে প্রায় প্রতি মৌসুমেই বজ্রপাতে প্রাণহানির খবর আসে। উঁচু গাছ বা নিরাপদ আশ্রয় না থাকায় কৃষকরা প্রায় নিরুপায়। বজ্রনিরোধক টাওয়ার এবং আগাম সতর্কবার্তা প্রযুক্তি চালু করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ে মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যেও। পচা ফসল পানিতে মিশে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি করে, ফলে মাছের মৃত্যু ঘটে। বৈশাখ মাস মাছের প্রজননের সময় হওয়ায় পোনা মাছের ক্ষতি ভবিষ্যৎ উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে পশুখাদ্যের সংকটে গবাদি পশুও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এই বহুমাত্রিক সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করেন হাওরের কৃষকরা। মৌলভীবাজার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত একই গল্প—ঋণ নিয়ে চাষ, তারপর প্রাকৃতিক দুর্যোগে সব হারানো। অনেকেই এনজিও বা মহাজনের চড়া সুদের ফাঁদে আটকে পড়েন। ফসলহানির পর যখন সহায়তা দেরিতে পৌঁছায়, তখন অনেক কৃষক বাধ্য হন গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হতে।
তবু হাওরের মানুষ থেমে থাকে না। তারা জানে, এই জমিই তাদের বাঁচার শেষ আশ্রয়। তাই প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা নতুন করে স্বপ্ন বোনে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওর রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া বিকল্প নেই। নদী ও খাল খননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা, আগাম জাতের ধান চাষ বাড়ানো, পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপন এবং শস্য বীমা চালু—এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। একই সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতা বুঝে কৃষি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
হাওর শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়—এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম স্তম্ভ। এখানকার কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশের কৃষি, আর কৃষি বাঁচলে টিকে থাকবে আমাদের অর্থনীতি। তাই হাওরের কান্না থামাতে এখন প্রয়োজন সহানুভূতির চেয়ে বেশি—দরকার কার্যকর, সময়োপযোগী এবং টেকসই উদ্যোগ।



















