img

ঐতিহ্য আর স্থাপত্যের মেলবন্ধন: কেরামত আলী জামে মসজিদে গর্বিত কমলগঞ্জ

প্রকাশিত :  ০৯:২৩, ০৬ মে ২০২৬

ঐতিহ্য আর স্থাপত্যের মেলবন্ধন: কেরামত আলী জামে মসজিদে গর্বিত কমলগঞ্জ

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলা শহরের ভানুগাছ বাজারে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এক মহিমান্বিত স্থাপনা—আলহাজ কেরামত আলী জামে মসজিদ। এটি এখন আর কেবল একটি উপাসনালয় নয়; বরং এ অঞ্চলের ইতিহাস, নান্দনিকতা ও ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

১৯৬৭ সালের ১২ ডিসেম্বর মোগল স্থাপত্যশৈলীর আদলে নির্মিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব মো. কেরামত আলী—যিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও দানবীর। তাঁর উদ্যোগেই গড়ে ওঠা এই মসজিদ আজও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও অবদানের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও কেরামত আলীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৪ সালের পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কৃষক শ্রমিক পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং এমএলএ হিসেবে নির্বাচিত হন। তবে একই বছরের ২৪ অক্টোবর, যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মাথায় তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে সরকার বাতিল করে দেয়। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জন নেতাকর্মীর সঙ্গে কেরামত আলীকেও গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালের ৬ জুন তিনি মুক্তি লাভ করেন।

পরবর্তী সময়ে আইয়ুব খান গঠিত কনভেনশন মুসলিম লীগ থেকে মনোনয়ন নিয়ে ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে সিলেট-৩ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক দায়িত্বের পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নয়নে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যার প্রতিফলন এই মসজিদ।

প্রথম দেখাতেই মসজিদের স্থাপত্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। মাঝখানে বৃহৎ একটি গম্বুজ এবং দুপাশে দুটি ছোট গম্বুজের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে দৃষ্টিনন্দন কাঠামো। গম্বুজ ও দেয়ালের অলঙ্করণে ফুটে উঠেছে ইসলামী জ্যামিতিক নকশা, যার সঙ্গে ইরানি ও উপমহাদেশীয় স্থাপত্যশৈলীর মেলবন্ধন স্পষ্ট। নির্মাণে ব্যবহৃত ইরান থেকে আনা পাথর মসজিদটিকে দিয়েছে আলাদা আভিজাত্য। চার কোণায় সুউচ্চ মিনার, টেরাকোটা ও মার্বেলের কারুকাজে স্থাপনাটির সৌন্দর্য আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।

মসজিদের ভেতরে রয়েছে প্রশস্ত নামাজঘর, যেখানে মার্বেল পাথর ও মোজাইক টাইলসের নিপুণ ব্যবহার চোখে পড়ে। দেয়ালে খচিত কোরআনের আয়াত ও নান্দনিক অলঙ্করণ আধ্যাত্মিক আবহকে আরও গভীর করে তোলে। প্যান্ডেল আকৃতির ছাদ ভেতরের পরিবেশকে রাখে শীতল ও আরামদায়ক, যা মুসল্লিদের জন্য প্রশান্তির অনুভূতি এনে দেয়।

মসজিদসংলগ্ন রয়েছে বড় একটি পুকুর, সুশৃঙ্খল ঘাট, আধুনিক অজুখানা এবং ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য আবাসন সুবিধা। প্রায় এক হাজার মুসল্লি একসঙ্গে এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। জুমা ও বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে দূরদূরান্ত থেকে মানুষের সমাগম ঘটে।

স্থানীয় মুসল্লি গোলাম কিবরিয়া শফি বলেন, “এই মসজিদের পরিবেশ ও স্থাপত্য আমাদের গর্বিত করে।” তিনি মনে করেন, সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা গেলে এর ঐতিহ্য আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।

কমলগঞ্জ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও নিয়মিত মুসল্লি গোলাম মুগ্নি মোহিত কামাল মিয়া জানান, “মসজিদের ভেতরের পরিবেশ এমন যে প্রচণ্ড গরমেও শীতলতা অনুভূত হয়।”

অন্যদিকে নিয়মিত মুসল্লি মো. সোলাইমান উদ্দিন বলেন, “প্রতিদিন এখানে নামাজ আদায় করতে এসে আমরা গর্ববোধ করি। তবে জুমার দিনে জায়গা সংকট দেখা দেয়—মসজিদটি সম্প্রসারণ করা জরুরি।”

১৯৬৯ সালের ৩ নভেম্বর আলহাজ্ব মো. কেরামত আলী মৃত্যুবরণ করেন। ৬ নভেম্বর তাঁর প্রতিষ্ঠিত সফাত আলী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণের হিফজখানার পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও এই অঞ্চলের মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত।

স্থানীয়দের মতে, কেরামত আলী জামে মসজিদ এখন শুধু কমলগঞ্জ নয়, পুরো মৌলভীবাজার জেলার একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি ঘিরে গড়ে উঠতে পারে একটি ইসলামিক হেরিটেজ কেন্দ্র—যা ভবিষ্যতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর একটি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

ইতালির পাঠানোর কথা বলে লিবিয়ায় আটকে যুবককে নির্যাতন: ২৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়

প্রকাশিত :  ১৫:৪৪, ০৬ মে ২০২৬

নবীগঞ্জের অধিবাসী রায়হান চৌধুরী (৩০) নামে যুবককে ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে লিবিয়ায় আটকে রেখে ২৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে। মুক্তিপণ দেয়ার পরেও তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি, বরং আবারও ২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার জন্য মারপিট করে হাতের আঙুল কেটে ফেলেছে চক্রটি। আরও অর্থ না দিলে হাতের কবজি কাটার হুমকিও দিচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর পরিবারের।

নির্যাতন করার পর গত ৪২ দিন ধরে রায়হান নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছে তার পরিবার। হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার বেতাপুর গ্রামের বাসিন্দা রায়হানের বাবা আবু তাহের চৌধুরী বাদী হয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে নবীগঞ্জ থানায় মানবপাচার আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।

ওই দালাল চক্রের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে মামলা করে বিপাকে পড়েছেন—এমন অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার। গতকাল মামলার প্রধান আসামি নজরুল ইসলাম জামিন নেওয়ার চেষ্টা করলে আদালত তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করেছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা বাদীর ছেলে রায়হান চৌধুরীর সহপাঠী—তারা একসঙ্গে লেখাপড়া করেছে। এই সূত্র ধরে মোবাইলে ইতালি থেকে দালাল ও মানবপাচার চক্রের সদস্য শামীম ও তার সহযোগী রাগিব ইতালিতে ফ্রি ভিসায় নেওয়ার কথা বলে তার ছেলেকে প্রলুব্ধ করেন। তাদের প্রলোভনে ইতালি যাওয়ার জন্য সম্মত হয়ে বাদী তাদেরকে পাসপোর্ট প্রদান করেন। এর কয়েকদিন পর মানবপাচার চক্রের সদস্য শামীমের বাবা নজরুল ইসলাম, তার স্ত্রী হাসেনা বেগম, মেয়ে রিনু বেগম, শান্তা বেগম, রুবিনা বেগম তার বাড়িতে এসে বাদীকে জানায় যে তার ভিসা হয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, তাদের কথামতো গতবছরের ১২ সেপ্টেম্বর বাদী তাদেরকে ১০ লাখ টাকা প্রদান করেন। এর কিছুদিন পরে বাদীর ছেলে রায়হান চৌধুরীর পাসপোর্ট দেওয়ার সময় রাকিবের বাড়িতে গিয়ে আরও নগদ ২ লাখ টাকা প্রদান করেন। টাকা পাওয়ার পর মানবপাচার চক্রের সদস্যরা ভিকটিম রায়হান চৌধুরীকে প্রথমে ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব ও পরে মিশর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য শামীম ও রাকিব মিলে রায়হান চৌধুরীকে ইতালি না পাঠিয়ে জিম্মি করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে।

তারা রায়হান চৌধুরীর মা, বাবাসহ আত্মীয়স্বজনকে ফোন করে জানায় যে, বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাইলে কিংবা ইতালি যেতে চাইলে দেশে থাকা তাদের সদস্য নজরুল ইসলামের কাছে আরও ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। তারা ভুক্তভোগীকেকে মারপিট করে ভিডিও কলে দেখায়। তার একটি আঙুল কেটে দিয়ে বলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে হাতের কবজি কেটে দেবে। তাই বাধ্য হয়ে ভিকটিমের বাবা জমি ও সোনা বিক্রি করে ১৫ লাখ টাকা দেশে থাকা পাচারকারী চক্রের সদস্যদের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ও বিকাশের মাধ্যমে প্রদান করেন। তারা মোট ২৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা পাওয়ার পরও ভিকটিমকে দেশে বা ইতালিতে পাঠায়নি।

এখন আবারও রায়হান চৌধুরীকে মারপিট করে ভিডিও করে দেখিয়ে আরও ২৫ লাখ টাকা দাবি করলে তার বাবা নিরুপায় হয়ে নবীগঞ্জ থানায় মানবপাচার আইনে মামলা করেন। মামলা দায়েরের পর থেকে রায়হান চৌধুরী নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে পরিবার।

এ বিষয়ে মামলার বাদী আবু তাহের চৌধুরী বলেন, আমি মামলা করে বিপাকে পড়েছি। আমি এখন আমার ছেলের কোনো সন্ধান পাচ্ছি না। সে কোথায়, কিভাবে আছে আল্লাহ ভালো জানেন। আমাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ও জেল হাজতে থাকা প্রধান আসামি নজরুল ইসলামকে জামিনে নিয়ে আসার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে।

এ বিষয়ে নবীগঞ্জ থানার ওসি মো মোনায়েম মিয়া বলেন, মামলাটি কিছুদিন আগে অধিকতর তদন্তের জন্য হবিগঞ্জ সিআইডির কাছে প্রেরণ করেছি। এখন বিষয়টি সিআইডি তদন্ত করবে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর