img

হাওরের বুকজুড়ে দুঃসহ ঋতু: অকাল বন্যা, বজ্রপাত আর বেঁচে থাকার লড়াই

প্রকাশিত :  ০৫:২৬, ০৫ মে ২০২৬

হাওরের বুকজুড়ে দুঃসহ ঋতু: অকাল বন্যা, বজ্রপাত আর বেঁচে থাকার লড়াই

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর জনপদ—মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—প্রকৃতির এক অনন্য দান। বর্ষায় এ অঞ্চল পরিণত হয় বিস্তীর্ণ জলরাশিতে, আর শুষ্ক মৌসুমে সবুজ ধানের সমারোহে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে প্রতি বছরই লুকিয়ে থাকে এক গভীর অনিশ্চয়তা, যা কৃষকের জীবনে নিয়ে আসে দুঃসহ সংগ্রাম।

চলতি বছরের অকাল বন্যা যেন সেই পুরনো ক্ষতকে আবার নতুন করে উসকে দিয়েছে। পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টির চাপে হাওরের ফসল তলিয়ে গেছে সময়ের আগেই। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের নিচু হাওরগুলোতে বোরো ধান কাটার আগেই পানির নিচে হারিয়ে গেছে কৃষকের বছরের একমাত্র ভরসা। অনেক জায়গায় যেখানে ধান কাটা হয়েছিল, সেখানেও নতুন বিপদ—ভেজা ধান সংরক্ষণের সংকট।

হাওরের ভৌগোলিক বাস্তবতা এখানে বড় বাধা। শুকনো খলা নেই, নেই আধুনিক শুকানোর ব্যবস্থা। ফলে কাটা ধান আর্দ্রতায় পচে যায়, কখনও অঙ্কুরিত হয়ে পড়ে। কৃষক বাধ্য হন কম দামে ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে সাইলো ও মেকানিক্যাল ড্রায়ার স্থাপন করা গেলে এই ক্ষতির বড় অংশই রোধ করা সম্ভব।

এদিকে আরেকটি নীরব আতঙ্ক ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে—বজ্রপাত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতের হার বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকদের জন্য এটি এখন এক প্রাণঘাতী ঝুঁকি। সুনামগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলে প্রায় প্রতি মৌসুমেই বজ্রপাতে প্রাণহানির খবর আসে। উঁচু গাছ বা নিরাপদ আশ্রয় না থাকায় কৃষকরা প্রায় নিরুপায়। বজ্রনিরোধক টাওয়ার এবং আগাম সতর্কবার্তা প্রযুক্তি চালু করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ে মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যেও। পচা ফসল পানিতে মিশে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি করে, ফলে মাছের মৃত্যু ঘটে। বৈশাখ মাস মাছের প্রজননের সময় হওয়ায় পোনা মাছের ক্ষতি ভবিষ্যৎ উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে পশুখাদ্যের সংকটে গবাদি পশুও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

এই বহুমাত্রিক সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করেন হাওরের কৃষকরা। মৌলভীবাজার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত একই গল্প—ঋণ নিয়ে চাষ, তারপর প্রাকৃতিক দুর্যোগে সব হারানো। অনেকেই এনজিও বা মহাজনের চড়া সুদের ফাঁদে আটকে পড়েন। ফসলহানির পর যখন সহায়তা দেরিতে পৌঁছায়, তখন অনেক কৃষক বাধ্য হন গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হতে।

তবু হাওরের মানুষ থেমে থাকে না। তারা জানে, এই জমিই তাদের বাঁচার শেষ আশ্রয়। তাই প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা নতুন করে স্বপ্ন বোনে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওর রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া বিকল্প নেই। নদী ও খাল খননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা, আগাম জাতের ধান চাষ বাড়ানো, পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপন এবং শস্য বীমা চালু—এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। একই সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতা বুঝে কৃষি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।

হাওর শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়—এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম স্তম্ভ। এখানকার কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশের কৃষি, আর কৃষি বাঁচলে টিকে থাকবে আমাদের অর্থনীতি। তাই হাওরের কান্না থামাতে এখন প্রয়োজন সহানুভূতির চেয়ে বেশি—দরকার কার্যকর, সময়োপযোগী এবং টেকসই উদ্যোগ।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

শ্রীমঙ্গলে রান্নাঘর থেকে জীবিত কোবরা সাপ উদ্ধার

প্রকাশিত :  ০৭:২৬, ১৩ মে ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: চায়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গলে এবার লোকালয়ের একটি বাড়ির রান্নাঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একটি অত্যন্ত বিষধর কোবরা সাপ। হঠাৎ রান্নাঘরে ফণা তুলে থাকা সাপ দেখে আতঙ্কে চিৎকার শুরু করেন ঘরের নারীরা। পরে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের তৎপরতায় প্রায় ২০ মিনিটের অভিযানে সাপটিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুর আনুমানিক ১টা ২০ মিনিটে শ্রীমঙ্গল উপজেলার জানাউড়া গ্রামে তারেক আহমেদের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। 

পরিবার সূত্রে জানা যায়, রান্নাঘর পরিষ্কার করার সময় ঘরের নারীরা আচমকা ফোঁসফোঁস শব্দ শুনতে পান। শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে তারা দেখতে পান, রান্নাঘরের একটি ইঁদুরের গর্তে ফণা তুলে বসে আছে ভয়ংকর এক কোবরা সাপ। মুহূর্তেই পুরো বাড়িতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

চিৎকার শুনে বাড়ির মালিক তারেক আহমেদ ঘটনাস্থলে ছুটে এসে সাপটিকে কুচা দিয়ে মারার চেষ্টা করেন। তবে সাপটির হিংস্র ভঙ্গি ও ফণা তোলা অবস্থা দেখে তিনি আর এগোতে সাহস পাননি।

পরে স্থানীয় সাংবাদিক আল আমিন বিষয়টি বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে জানালে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ। তারা গিয়ে দেখতে পান, সাপটি গর্তের ভেতরে অবস্থান করছে এবং এটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী বিষধর কোবরা, যা সাধারণত লোকালয়ে খুব কম দেখা যায়।

দীর্ঘ প্রায় ২০ মিনিটের সতর্ক অভিযানের পর সাপটিকে কোনো ক্ষতি ছাড়াই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। পরে উদ্ধারকৃত কোবরা সাপটি শ্রীমঙ্গল বনবিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পরিবেশকর্মীরা জানান, শ্রীমঙ্গল উপজেলা পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও বিস্তীর্ণ জঙ্গলবেষ্টিত হওয়ায় এটি বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বনভূমি দখল, অবৈধ বসতি স্থাপন এবং বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ ও খাদ্যসংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।

স্থানীয়দের মতে, জানাউড়া গ্রামের ঘটনাটি কেবল একটি সাপ উদ্ধারের ঘটনা নয়; বরং এটি বন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার একটি বাস্তব চিত্রও তুলে ধরেছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর