টেকনো ড্রাগসে বিনিয়োগে বিপুল সম্ভাবনা, আইপিও আবেদন শুরু ৯ জুন
ওষুধ উৎপাদন ও রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠান টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের আবেদন ও চাঁদা গ্রহণ ৯ জুন শুরু হয়ে চলবে ১৩ জুন পর্যন্ত। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কোম্পানিটি আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টাকা তুলবে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় জন্মনিরোধক পিল ও ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটির কাট অফ প্রাইস নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ টাকা। কাট অফ প্রাইসের ৩০ শতাংশ কম দামে ২৪ টাকা করে আবেদনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা প্রতিটি শেয়ার কিনতে পারবে। কোম্পানিটির শেয়ার বিক্রির নিলাম (বিডিং) বিপুল সাড়া পেয়ে নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়েছে। কোম্পানির আইপিওতে প্রতিটি বিও হিসেবে ১০ হাজার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আবেদন করতে পারবে বিনিয়োগকারীরা।
কোম্পানির প্রসপেক্টাস অনুসারে সর্বশেষ নয় মাসে (১ জুলাই ২০২৩- ৩১ মার্চ ২০২৪) কোম্পানিটির ইপিএস (শেয়ার প্রতি আয়) দাঁড়িয়েছে ২.৫৮ টাকা। যা আগে বছরে একই সময়ের চেয়ে ৩৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেশি। বিগত ১ জুলাই ২০২২ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৩ পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি আয় ছিল ১.৯০ টাকা। এর আগে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ৯০২তম কমিশন সভায় টেকনো ড্রাগস লিমিটেডকে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিওর মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, টেকনো ড্রাগস কোম্পানিটি বাংলাদেশের ওষুধের বাজারে এক অনন্য নাম। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কোম্পানিটি বাংলাদেশের বাজারে দুষ্পাপ্য ও অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছে। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যুহার কমানো এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে। আর সেটি সম্ভব হয়েছে টেকনো ড্রাগসের কারণে। কারণ বাংলাদেশ সরকার জন্মনিরোধকসহ যেসব অতীব প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনে থাকে। তার সিংহভাগই উৎপাদন করে থাকে টেকনো ড্রাগস লিমিটেড।
টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের কোম্পানি সচিব দেবাশীষ দাশ গুপ্ত বলেন, বাংলাদেশ সরকার জন্মনিয়ন্ত্রণে যেসব ওষুধ সরকারি ক্রয়াদেশের মাধ্যমে কিনে থাকে তার মধ্যে টেকনো ড্রাগস দুই তৃতীয়াংশ ওষুধের ক্রয়াদেশ পেয়ে থাকে। সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস সরকারের পুরো চাহিদা পূরণ করতে পারে না। মূলত টেকনো ড্রাইসই ব্যতিক্রমধর্মী এবং জনসেবামূলক এইসব ওষুধ উৎপাদনের মাধ্যমে সরকারকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করে আসছে। জন্মনিরোধক এসব ওষুধ ছাড়াও কোম্পানিটির বাংলাদেশের বাজারের জন্য ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদন করে আসছে। বাংলাদেশে মাত্র দুইটি কোম্পানি বিকন ফার্মা ও টেকনো ড্রাগস মরণব্যাধি ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদন করে থাকে।
তিনি বলেন, কোম্পানিটি বর্তমানে ভ্যাটেনারি ওষুধ তৈরি করছে। এই ওষুধ উৎপাদনের মাধ্যমে কোম্পানিটি বাংলাদেশে আমিষের চাহিদাপূরণ এবং খামারিদের লাভবান করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। কারণ বাংলাদেশের জনসংখ্যার বৃদ্ধির পাশাপাশি অতীব প্রয়োজনীয় আমিষের চাহিদা বেড়েছে। অধিকহারে মানুষ বেড়ে যাওয়ায় অল্প জমিতে বা খামারে বেশি পরিমাণ মাংস ও ডিম উৎপাদনের প্রয়োজন পড়ছে। সেই কারণে টেকনো ড্রাগ জনমানুষের চাহিদার কথা মাথায় রেখে নতুন নতুন ওষুধ উৎপাদনে নজর দিচ্ছে। এভাবেই কোম্পানিটি ওষুধ শিল্পে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
এর আগে গত ২১ এপ্রিল বিকেল ৪টা থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত কোম্পানিটির বিডিং (নিলাম) অনুষ্ঠিত হয়। নিলামে টেকনো ড্রাগসের কাট-অব প্রাইস (প্রান্তঃসীমা মূল্য) নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ টাকা। তবে আইপিও আবেদনে ৩০ শতাংশ কমে অর্থাৎ ২৪ টাকা করে সাধারণ শেয়ার পাবেন বিনিয়োগকারীরা। সেটিরই আবেদন ৯ জুন থেকে।
বর্তমানে টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের গাজীপুর ও নরসিংদীতে দুইটি ফ্যাক্টরি রয়েছে। যার আয়তন ১৩১৭.৫০ ডেসিম্যাল। ফ্যাক্টরি দুইটিতে পৃথক পৃথক প্রোডাক্টের ধরন অনুসারে পেনিসিলিন বিল্ডিং, হরমোন বিল্ডিং এবং জেনারেল প্রোডাকশন বিল্ডিং, সেফালোস্পোরিন বিল্ডিং, মেডিকেল ডিভাইস এন্ড বায়োটেক বিল্ডিং, এন্টি-টিউবার ক্লোসিস বিল্ডিং, এনিমেল হেলথ বিল্ডিং ও অনকোলজি প্রোডাকশন বিল্ডিংসহ মোট ৯টি ভবন রয়েছে। কোম্পানিটি পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয়, নরসিংদী ফ্যাক্টরির ব্যালেন্সিং মডার্নাইজেশন রেনোভেশন অ্যান্ড এক্সপেনশন (বিএমআরই), গাজীপুর ফ্যাক্টরির ভবন নির্মাণ এবং আংশিক ঋণ পরিশোধে ব্যয় করবে। এতে কোম্পানিটির উৎপাদন ও বিক্রয় বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে বিনিয়োগকারী ও স্টেকহোল্ডাররা লাভবান হবেন।
উল্লেখ্য, টেকনো ড্রাগস লিমিটেড ২০০৯ সালে প্রাইভেট কোম্পানি হিসেবে আরজেএসসিতে নিবন্ধিত হয়। তবে, ২০১০ সালের ১ জুলাই কোম্পানিটি বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে যাত্রা শুরু করে ভেটেনারি প্রোডাক্ট দিয়ে। দেশে ভেটেনারি প্রোডাক্টের প্রবর্তক টেকনো ড্রাগস। পরবর্তীতে মানব স্বাস্থ্যের ওষুধ নিয়ে কাজ শুরু করে। কোম্পানিটি ২০১৪ সালে ওষুধ রপ্তানিতে চতুর্থ স্থান অর্জন করে। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে তৃতীয় স্থান অর্জন করে। কোম্পানিটি ২০০৯ সালে প্রাইভেট কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় এবং ২০১৯ সালে প্রাইভেট কোম্পানি থেকে পাবলিক কোম্পানিতে রুপান্তরিত হয়।
বর্তমানে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৯৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা। যার মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ৬৩ শতাংশসহ পরিচালনা পর্ষদের কাছে ৮৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ জালাল উদ্দিন আহমেদ একজন ফার্মাসিস্ট এবং দেশের সবোর্চ্চ বিদ্যাপিট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। কোম্পানির পরিচালক মেহেরিন আহমেদ বিদেশ থেকে অনকোলজিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। আরেক পরিচালক আরেফিন রাফি আহমেদ অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটি থেকে বিএসসি (আইসিটি) ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি প্রায় ১২ বছর যাবৎ কোম্পানির মার্কেটিং, ব্যবস্থাপনা, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ দক্ষতার সাথে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া কোম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছে মিসেস খালেদা আক্তার খান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জীব বিজ্ঞানে অনার্স এবং ফিসারিজ বিষয়ে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্যাংকিং খাতে ২৫ বছরের কর্ম অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। সর্বশেষ হিসাববছরে কোম্পানিটি ১৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে। ২০২৩ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাববছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, পুনর্মূল্যায়নসহ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) ২৭ টাকা ৭৪ পয়সা এবং পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া ২২ টাকা ৫৭ পয়সা। এ সময় কোম্পানির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ২ টাকা ৮ পয়সা। বিগত ৫ বছরের ভারিত গড় হারে শেয়ারপ্রতি মুনাফা ৩ টাকা ২৫ পয়সা। কোম্পানিটির ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ইম্পেরিয়াল ক্যাপিটাল লিমিটেড ও ইবিএল ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড। এছাড়া অন্ডাররাইটার হিসেবে যৌথভাবে কাজ করছে ইবিএল ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড এবং বিএমএসএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহজালাল উদ্দিন আহমেদের ৪০ বছরের অধিক কর্মঅভিজ্ঞতা সাথে একঝাঁক পেশাদার কর্মকর্তা, গবেষণা ও উন্নয়ন কাজের গভীরতা, দেশি-বিদেশি মার্কেটে ব্যবসা বিস্তার এবং সর্বপরি ওষুধ তৈরিতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ইত্যাদি টেকনো ড্রাগস লিমিটেডকে বাংলাদেশের প্রথম সারির লাভজনক ওষুধ কোম্পানিতে পরিণত হবে বলে প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের।



















