১৩ এপ্রিল ২০২৫: শেয়ার বাজারে সম্ভাবনার আলো না কি অনিশ্চয়তার ছায়া?
রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের শেয়ার বাজার যেন অনেকটা এক দীর্ঘ রেলপথ—কখনো বেগবান, কখনো ধীর; কখনো আলোয় উদ্ভাসিত, আবার কখনো কুয়াশাচ্ছন্ন। সেই শেয়ার বাজার এখন নতুন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। পেছনে ১৯৯৬ ও ২০১০-এর মতো স্মরণীয় অভিজ্ঞতা, সামনে দাঁড়িয়ে আছে সম্ভাবনার সঙ্গে অনিশ্চয়তার দোলাচল।
আগামীকাল রবিবার, ১৩ এপ্রিল। সপ্তাহের প্রথম লেনদেন দিনে দেশের দুই প্রধান শেয়ার বাজার—ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)—আবারও খোলার অপেক্ষায়। বিনিয়োগকারীদের চোখে-মুখে যেমন কৌতূহল, তেমনি আছে অজানা এক শঙ্কার রেখা। প্রশ্ন একটাই—বাজার কি নতুন গতি পাবে, না কি একই অস্থির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে?
অর্থনীতির অবস্থা: আশার ইঙ্গিত, না দ্বিধার প্রতিধ্বনি?
২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে দেশের অর্থনীতি পাঠিয়েছে মিশ্র বার্তা। একদিকে তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানিতে কিছুটা অগ্রগতি, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারে মূল্যস্ফীতি ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে চাপ কম নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক কড়া মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, সুদের হার নতুনভাবে নির্ধারণ করেছে, আর ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে। রিজার্ভও কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে—২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি—যা কিছুটা হলেও বিনিয়োগকারীদের মনোবল ফিরিয়ে আনছে।
তবে চিন্তার জায়গাও স্পষ্ট। এখনও মূল্যস্ফীতি আট শতাংশের গণ্ডি পেরিয়ে ৮.৫-এর কাছাকাছি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের খরচের চাপ বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজারে খরিদ্দারির উপরেও।
রাজনীতি ও বৈশ্বিক চিত্র: সামনে কি ঝড়?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল হলেও সামনে স্থানীয় নির্বাচন আর শ্রমিক আন্দোলনের গুঞ্জন কিছুটা অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধি এবং চীনের পুনরুদ্ধারমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা আমাদের রপ্তানি ও বৈদেশিক বিনিয়োগে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
সূচকের ভাষা: বাজার কী বলছে?
বর্তমানে ডিএসইএক্স সূচক ঘুরছে ৫,২০০ পয়েন্টের আশপাশে। গত সপ্তাহে সূচকটি ৫,১৫০ পয়েন্টে ঠেকলেও সেখান থেকে সামান্য ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা দেখা গেছে। কিন্তু বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী গতি আনতে হলে ৫,৩০০ পয়েন্টের রেজিস্ট্যান্স লেভেল পার হতে হবে।
৫০ দিনের মুভিং এভারেজ: ৫,১৮০ পয়েন্ট
২০০ দিনের মুভিং এভারেজ: ৫,১০০ পয়েন্ট
আরএসআই: ৫৫ (একটি নিরপেক্ষ অবস্থা নির্দেশ করে)
দৈনিক লেনদেন: ৪০০-৫০০ কোটি টাকার মধ্যে
বলিঞ্জার ব্যান্ড: সূচক এখন মধ্যম ব্যান্ড ছুঁয়েছে। যদি ঊর্ধ্বসীমা ছাড়িয়ে যায় (৫,৩৫০), তবে বাজার আরও গতি পেতে পারে।
কোন খাতে ভরসা রাখা যায়?
ব্যাংকিং খাত: ব্যাংকগুলোর মধ্যে নন-পারফর্মিং লোন কমাতে কিছু উদ্যোগ ইতিমধ্যে ফল দিচ্ছে। প্রাইভেট ব্যাংকগুলোর মুনাফা তুলনামূলক ভালো।
ওষুধ শিল্প: রপ্তানিতে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। নতুন প্রোডাক্ট বা রপ্তানি চুক্তির খবরে এই খাত বাজারে গতি আনতে পারে।
গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল: চাহিদা আছে, কিন্তু শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকছেই।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: আমদানির খরচ বাড়লেও নবায়নযোগ্য প্রকল্পে ভরসা। সামিট পাওয়ার, টাইটাস গ্যাস ইত্যাদির দিকে নজর রাখা যেতে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তি: ফ্রিল্যান্সিং ও সফটওয়্যার রপ্তানির কল্যাণে এই খাতে আগ্রহ বাড়ছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য বার্তা: আবেগ নয়, বিশ্লেষণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—বাজারে লাভের আশায় হুটহাট সিদ্ধান্ত নয়, বরং সময় নিয়ে খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ করাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ পথ। কেউ যদি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী হন, তাহলে এখনই কৌশল নির্ধারণ করার সময়।
আগামীকাল বাজারে কোনো বড় রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ধাক্কা না এলে ডিএসইএক্স সূচক ৫,১৫০ থেকে ৫,৩৫০ পয়েন্টের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, খাদ্যপণ্যের সরবরাহ, আইপিও সংক্রান্ত ঘোষণা কিংবা সরকারের যেকোনো প্রণোদনা হঠাৎ করে দিক পরিবর্তন করে দিতে পারে।
শেয়ার বাজারের প্রতিটি দিন যেন একটি নতুন গল্পের সূচনা। ১৩ এপ্রিল—এই রবিবার হয়তো একটি আর্থিক পালাবদলের সূচনা, অথবা চলমান বাস্তবতার আরেকটি অনুরণন। আপনি যদি বিনিয়োগকারী হন, তাহলে এটাই সময়—গভীরভাবে ভাবুন, পর্যবেক্ষণ করুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন। কারণ এই বাজারে ধৈর্যশীলরাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হন।


















