খেলাপি ঋণ ইস্যু

img

লভ্যাংশ দিতে পারেনি অর্ধেকের বেশি ব্যাংক

প্রকাশিত :  ০৬:২৫, ০১ মে ২০২৬

লভ্যাংশ দিতে পারেনি অর্ধেকের বেশি ব্যাংক

‘খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ বা তার বেশি হলে মুনাফা থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারবে না’—বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন নীতিমালার কারণে চলতি বছরে খেলাপি ঋণ দুই অঙ্কের ঘরে থাকা কোনো ব্যাংককে ২০২৫ সালের জন্য লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। মূলধন বা প্রভিশন ঘাটতি নিয়েও কোনো কোনো ব্যাংক ওই বছরের লভ্যাংশ দিতে পারেনি। এতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে কেবল ১৬টি লভ্যাংশ দিতে পেরেছে। দেশীয় ৫২টি ব্যাংকের মধ্যে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭টি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দুরবস্থায় পড়া ব্যাংক খাতের আর্থিক ভিত্তি শক্ত করতে গত বছরের ১৩ মার্চ শেয়ারের বিপরীতে লভ্যাংশ ঘোষণার নীতিমালা শীর্ষক একটি বিধান করা হয়। সেখানে বলা হয়, কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ হলে ওই ব্যাংক আর লভ্যাংশ দিতে পারবে না। বর্তমানে ২৯টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রয়েছে ২৯ শতাংশের ওপরে। এর মধ্যে ১৭টি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। আবার মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি থাকলেও লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ নেই। আগে প্রভিশন সংরক্ষণে বাড়তি সময় নিয়েছে এরকম ব্যাংকও লভ্যাংশ দিতে পারেনি। গভর্নর পদে পরিবর্তন আসায় শেষ পর্যন্ত এই কঠোর নীতি থাকবে কিনা তা নিয়ে অনেকেই আলোচনা তুলেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কঠোর নীতি অনুসরণ করা হয়েছে।

আবার মূলধন ভিত্তি সবচেয়ে ভালো এবং রেকর্ড মুনাফা করা ব্যাংকেও সর্বোচ্চ লভ্যাংশের সীমা বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একটি ব্যাংক কোনো অবস্থায় পরিশোধিত মূলধনের ৩০ শতাংশ কিংবা নিট মুনাফার ৫০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিতে পারবে না। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, পরবর্তী বছরের ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০২৫ সালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার শেষ দিন ছিল গতকাল। শেষ দিনে একীভূত হওয়া দুর্বল পাঁচ ব্যাংকে আটকে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকের অর্থের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণে বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত বছরও কঠোর নীতি করা হয়। যে কারণে গত বছর নির্ধারিত সময়ে আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করতে পেরেছিল না অধিকাংশ ব্যাংক। ফলে এক মাস সময় বাড়ানো হয়েছিল। এবার নির্ধারিত তারিখে সব ব্যাংক আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করেছে।

লভ্যাংশ দিয়েছে যেসব ব্যাংক

ব্যাংক খাতের নানা সংকটের মধ্যেও বেসরকারি খাতের ৬টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবার সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ অনুমোদন করেছে। নগদ ও স্টক মিলে এ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়। এ তালিকায় রয়েছে–ব্র্যাক, সিটি, পূবালী, ডাচ্‌-বাংলা, প্রাইম ও উত্তরা ব্যাংক। লভ্যাংশ বিতরণে পরের অবস্থানে থাকা যমুনা ব্যাংক দিয়েছে ২৯ শতাংশ। এর পরে রয়েছে যথাক্রমে ইস্টার্ন ব্যাংক ২৮ শতাংশ, এনসিসি ২৫, ব্যাংক এশিয়া ১৭, শাহ্‌জালাল ইসলামী ১৩, ট্রাস্ট ব্যাংক ১৩, এমটিবি ১২, সাউথইস্ট ব্যাংক ১০, ঢাকা ১০ এবং মিডল্যান্ড ৬ শতাংশ। পুঁজিবাজারে তালিকভুক্ত এসব ব্যাংকের বাইরে এবার কমিউনিটি ব্যাংকও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিয়েছে।

লভ্যাংশ দিতে পারেনি যেসব ব্যাংক

বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে কোনো লভ্যাংশ দিতে না পারার তালিকায় রয়েছে–ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। এক সময় ‘এ’ ক্যাটেগরি থেকে ব্যাংকটি এবার ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে নেমে এসেছে। এ তালিকায় রয়েছে আইএফআইসি, স্ট্যান্ডার্ড, ইউসিবি, মার্কেন্টাইল, এবি, আল-আরাফাহ ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক, ন্যাশনাল, এনআরবি, এনআরবিসি, ওয়ান, প্রিমিয়ার, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক। একীভূত হওয়ার কারণে পুঁজিবাজারের তালিকা থেকে বাদ পড়া এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোস্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক রয়েছে এ তালিকায়। এসব ব্যাংক একীভূত করে অকার্যকর ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূলত বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে ‘নস্ট্রো’ অ্যাকাউন্ট পরিচালনার সুবিধার্থে ব্যাংকগুলোর এখনও লাইসেন্স বাতিল করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন ব্যাংকের মধ্যে লভ্যাংশ দিতে পারেনি–বাংলাদেশ কমার্স, মেঘনা, বেঙ্গল, মধুমতি, পদ্মা, সীমান্ত ও সিটিজেনস ব্যাংক। সরকারি ব্যাংকের মধ্যে রূপালী, সোনালী, জনতা, অগ্রণী, বিডিবিএল, বেসিক, বিকেবি, রাকাব ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক সরকারকে লভ্যাংশ দিতে পারেনি।


অর্থনীতি এর আরও খবর

img

বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলা করে, ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাই বাংলাদেশের অর্থনীতি

প্রকাশিত :  ১১:৫৯, ০১ মে ২০২৬

সিনিয়র রিপোর্টার সৈয়দ আমানউল্লাহ: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন বিএনপি সরকারকে একটি ভঙ্গুর ও চ্যালেঞ্জিং অর্থনীতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে, দেশের অর্থনীতি একটি মিশ্র ও চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ, খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর অবস্থার উত্তরণের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থিতিশীলতা ফেরার মতো ইতিবাচক প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি মাঝারি প্রবৃদ্ধি (প্রায় ৫%) ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছে । মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করা (প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার) প্রধান লক্ষ্য । এছাড়া, এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণ এবং নতুন সরকার কর্তৃক অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চলছে । 

প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন: ২০২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৫০ শতাংশের আশেপাশে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কৃষি ও শিল্প খাতের ওপর নির্ভরশীল । আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ।

বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (ADB) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া কিছুটা শ্লথ হলেও প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

রিজার্ভ ও বাণিজ্য: ঈদুল ফিতরসহ বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হয়েছে । বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে এবং রিজার্ভ প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল হয়েছে । তবে আমদানিনির্ভরতা এবং ডলারের উচ্চমূল্য এখনো চিন্তার বিষয় ।

মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্য: মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের জন্য অন্যতম বড় চাপ। 

মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও ধীরগতিতে তা কমার প্রবণতা রয়েছে । খাদ্যপণ্যের দাম এখনো কিছুটা বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকার তা কমিয়ে আনতে বিভিন্ন আর্থিক ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

খেলাপি ঋণ:  ব্যাংক খাতে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ (Non-Performing Loans) এবং আর্থিক সুশাসনের অভাব বিগত সরকারের সময় থেকে পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার এসব প্রতিষ্ঠানে সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের কাজ করছে।

রাজস্ব ও বাজেট ঘাটতি: কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাজস্ব আদায় না হওয়ায় এবং ভর্তুকি ও ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ায় সরকারের ব্যাংক ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে।

রপ্তানি খাত: আরএমজি (Ready-Made Garments) বা তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি, যা মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪% নিশ্চিত করে। চীন-এর পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির কারণে কাঁচামাল আমদানি, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম এবং শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় কারখানা গুলোর উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। ডলার সংকটের কারণে অনেক কারখানার সময়মতো এলসি খুলতে সমস্যা হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সময়মতো পণ্য ডেলিভারি ও পেমেন্টে। শ্রমিক অসন্তোষ এর কারণে অনেক কারখানা বন্ধ, বকেয়া বেতন এবং কাজের পরিবেশ নিয়ে মাঝে মাঝেই কিছু কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভ দেখা যায়। এছাড়া বর্ধিত খরচের চাপে কিছু ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করে, তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ: কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষিত তরুণ ও যুবকদের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সাথে সাথে নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

রেমিট্যান্স (Remittance): এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত (প্রথম ৪ মাসে) বাংলাদেশে মোট ১২.৫ বিলিয়ন (১,২৫০ কোটি) মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ।  

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই চার মাসে আসা রেমিট্যান্সের মাসিক হিসাব অনুযায়ী 

জানুয়ারি মাসে এসেছে ৩.১৭ বিলিয়ন (৩১৭ কোটি) ডলার, ফেব্রুয়ারি মাসে এসেছে ৩.০২ বিলিয়ন (৩০২ কোটি) ডলার, মার্চ মাসে এসেছে ৩.৭৫ বিলিয়ন (৩৭৫ কোটি) ডলার, (যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ মাসিক রেকর্ড)। এপ্রিল মাসের প্রথম ২৮ দিনে ২.৯১ বিলিয়ন (২৯১ কোটি) ডলার এসেছে । মাস শেষে এই সংখ্যাটি আনুমানিক ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। মোট প্রবাহ, এই সময়ে প্রবাসীরা প্রায় ১২.৮৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রায় ১৬% থেকে ২০% প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ।

বাজেট ও চ্যালেঞ্জ: সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বড় বাজেট প্রণয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে । মূল চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি । 

সার্বিকভাবে, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির ক্ষত ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন সরকারের যাত্রা কিছুটা কঠিন হলেও ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সরকার কাঠামোগত সংস্কার ও আর্থিক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেছে। ২০২৬ সালটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি \"পরীক্ষার বছর\", বলা যেতে পারে।