এমপি হিসেবে শপথ নিতে পারবেন না ঋণ খেলাপি আসলাম চৌধুরী
প্রকাশিত :
০৫:৪২, ৩০ জুন ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বেসরকারিভাবে জয়ী বিএনপির আসলাম চৌধুরী ঋণ খেলাপি হওয়ায় শপথ নিতে পারবেন না বলে রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ আজ মঙ্গলবার এ রায় দেন।
এর ফলে তাঁর নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না। অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে ১৫ জুন শুনানি শেষে রায়ের জন্য ৩০ জুন দিন ধার্য করেছিলেন আপিল বিভাগ। আজ আদালতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে ছিলেন জ্যৈষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ও ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। আসলাম চৌধুরীর পক্ষে ছিলেন জ্যৈষ্ঠ আইনজীবী মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী ও ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এমপি।
ঋণ খেলাপির অভিযোগ থাকা আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে আপিল শুনানি চলতি বছর ১৮ জানুয়ারি বৈধ ঘোষণা করা হয়। সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে ব্যাংকের করা রিট হাইকোর্ট খারিজ করে দেন। এরপর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী মো. আনোয়ার সিদ্দিকী লিভ টু আপিল করেন। ৩ ফেব্রুয়ারি আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহালের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন আপিল বিভাগ। ফলে আসলাম চৌধুরী নির্বাচন করার সুযোগ পান। কিন্তু আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল ঘোষণা স্থগিত থাকবে এবং তা প্রকাশ যাবে না বলে আদেশ দেওয়া হয়।
এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসলাম চৌধুরী বিজয়ী হন। কিন্তু আদালতের আদেশের কারণে ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
বিদেশি ঋণ গ্রহণে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় তারা এসব বিষয় উত্থাপন করেন।
সংসদে ৫৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা মঞ্জুরি দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশ মঞ্জুরি দাবির বিরুদ্ধে বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতীকী ছাঁটাই প্রস্তাব দেন। মোট ৪৩ জন সংসদ সদস্য ১ হাজার ৪৩টি ছাঁটাই প্রস্তাব জমা দিলেও সবগুলোর ওপর আলোচনা হয়নি। বিরোধী দলের সম্মতি এবং সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু প্রস্তাব আলোচনার বাইরে থাকে এবং কিছু নোটিশ প্রত্যাহার করা হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো ছাঁটাই প্রস্তাবই গৃহীত হয়নি।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করে এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বিদেশি ঋণের অর্থ এমন অনেক প্রকল্পে ব্যয় হয়, যেখানে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রকল্পে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ কার্যকর তদারকি করতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি দাবি করেন, ভবিষ্যতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ, শর্ত এবং কোন দেশ থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে- এসব তথ্য সংসদে উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি যেসব প্রকল্পে বিদেশি ঋণ ব্যবহার হবে, সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য সুফল এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরে ঋণসংক্রান্ত কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, তাও প্রকাশের দাবি জানান তিনি।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মঞ্জুরি দাবির আলোচনায় আখতার হোসেন বলেন, অতীতের বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারিতে এ বিভাগের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। হল-মার্ক, জনতা ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব ঘটনায় বিভাগীয় কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ঋণ পুনঃতফসিল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এ বিভাগের দায়িত্বের সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
পরিকল্পনা বিভাগের মঞ্জুরি দাবির আলোচনায় খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন বলেন, অনেক উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং জনগণের অর্থের অপচয় হচ্ছে। তিনি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দক্ষতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. আমির হামজা প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধি বন্ধের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ না করার দাবি জানান।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের মঞ্জুরি দাবির আলোচনায় রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল বারী সরদার বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ চিহ্নিত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে বারবার প্রকল্প সংশোধন এবং ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেন তিনি।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের মঞ্জুরি দাবির আলোচনায় পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী অভিযোগ করেন, করের আওতা বাড়ানোর নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সৎ করদাতারাও অডিটের নামে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবির আলোচনায় সংসদ সদস্য আল ফারুক আবদুল লতিফ বলেন, নিম্ন আদালত পৃথক হলেও পদোন্নতি ও বদলিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকায় বিচার বিভাগ পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, দেশে বর্তমানে ২৫ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন বিচারক নিয়োগ এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বিচার বিভাগের বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে বলেন, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করতে শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থা অপরিহার্য।
ছাঁটাই প্রস্তাবের সমালোচনা করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, একই বরাদ্দ নিয়ে কেউ বলছেন বেশি, আবার কেউ বলছেন কম—দুই ক্ষেত্রেই প্রতীকীভাবে এক টাকা কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, আইন বিভাগের বাজেট যদি এক টাকায় নামিয়ে আনা হয়, তাহলে বিচার বিভাগের প্রয়োজনই থাকবে না।
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রতীকীভাবে এক টাকায় নামিয়ে আনার অর্থ হবে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস কার্যত অচল হয়ে যাওয়া। এতে প্রবাসীদের সেবা ব্যাহত হবে, জাতিসংঘে চাঁদা পরিশোধও সম্ভব হবে না এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।