স্ত্রীকে হত্যার পর মাটিচাপা, নিখোঁজের ‘নাটক সাজিয়ে’ থানায় জিডি স্বামীর
মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলায় স্ত্রীকে হত্যার পর মরদেহ মাটিচাপা দেওয়ার অভিযোগে আলমগীর হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। থানায় গিয়ে নিখোঁজের ‘নাটক’ সাজিয়ে আলমগীর জিডি করেছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে ঘটনার প্রায় ১৬ দিন পরে তার বাড়ির উঠান খুঁড়েই মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। সোমবার (৬ জুলাই) দুপুরে জেলার রাজনগর উপজেলার মুন্সীবাজার ইউনিয়নের করিমপুর গ্রামে আলমগীরের বাড়ির উঠান খুঁড়ে তার স্ত্রী জাহেদা বেগমের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ জুন রাত আনুমানিক ৯টার দিকে পারিবারিক কলহের জেরে আলমগীর হোসেন তার স্ত্রী জাহেদা বেগমকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। হত্যার পর ঘটনাটি গোপন রাখতে গভীর রাতে বসতবাড়ির উঠানের একপাশে গর্ত খুঁড়ে মরদেহ মাটিচাপা দেয় আলমগীর। ঘটনার কয়েকদিন পর সন্দেহ এড়াতে পরিকল্পিতভাবে নতুন নাটক সাজান আলমগীর। রাজনগর থানায় গিয়ে স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার কথা জানিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে চান।
একই সঙ্গে পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে তিনি দাবি করেন, তার স্ত্রী কাউকে না জানিয়ে গোপনে বিদেশে চলে গেছেন। তবে জিডি করতে গিয়ে তার অসংলগ্ন কথাবার্তা ও অস্বাভাবিক আচরণে সন্দেহে হয় কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তার। পরে তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এক পর্যায়ে তিনি ভেঙে পড়েন এবং হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে অপরাধ স্বীকার করেন। পুলিশের কাছে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার রাজনগর থানা পুলিশ আলমগীরের বাড়ির উঠান খুঁড়ে জাহেদা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে।
নিহত জাহেদা বেগম রাজনগর উপজেলার মুন্সিবাজার ইউনিয়নের সুনাটিকি গ্রামের আব্দুল হান্নানের মেয়ে। এঘটনায় স্বামী একই ইউনিয়নের করিমপুর চা বাগানের আলমগীর আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সোমবার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্টেটের উপস্থিতে পুলিশ লাশ উত্তোলন করে মর্গে পাঠায়। তবে কী কারণে তাকে হত্যা করেছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজনগর উপজেলার মুন্সিবাজার ইউনিয়নের সুনাটিকি গ্রামের আব্দুল হান্নানের মেয়ে জায়েদা বেগমের বিয়ে হয়েছিল একই ইউনিয়নের করিমপুর চা বাগানের আলমগীর মিয়ার সাথে। তাদের ঘরে ৬ বছরের একটি ছেলে আছে। গত ১৮ জুন জায়েদা বেগমের স্বামীর বাড়ী (আলমগীর আলীর বাড়ি) থেকে নিখোঁজ হন। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখোঁজি করে তার কোন সন্ধ্যান পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি তদন্তের দায়িত্বপান রাজনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অরূপ সরকার। বিষয়টি তদন্তে নেমে আলমগীরের আচরন সন্দেহজনক মনে হলে তাকে পুলিশ হেফাতে নেয়া হয়। পরে পুলিশের ব্যাপাক জিজ্ঞাসাবাদে আলমগীর জায়েদাকে হত্যা করে লাশ মাটির নিচে পুতে রেখেছে বলে স্বীকার করে। পরে রাজনগর থানার পুলিশ তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জেলা পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম এবং রাজনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্টেট বিপুল সিকদারের উপস্থিতিতে সোমবার আলমগীর আলীর নিজ বাড়ি উঠোনের সামনে ৮ ফুট মাটির নিচ থেকে জায়েদার মরদেহ উত্তোলন করে মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় জায়েদার স্বামী আলমগীর আলী (৪০), জালাল আহমদ, আমিনুল ইসলাম ও নুরুল মিয়াকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
নিহতের পিতা আব্দুল হান্নান বলেন, “আমার মেয়ে সৌদিআরব চলে গেছে বলে জানায়। সে কোন প্রমান দেখাতে না পারলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে আলমগীরকে পুলিশে সুপর্দ করা হয়। পরে সে হত্যার কথা স্বীকার করে। আমরা এর সঠিক বিচার চাই।”
রাজনগর থানার ওসি মো. ফরিদ উদ্দিন আহমদ ভূঁইয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, অভিযুক্ত আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হবে।
মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম বলেন, “জায়েদা বেগম নিখোঁজ হওয়ার পর তার বাবা ৩জুলাই রাজনগর থানায় জিডি করেন। জিডির প্রেক্ষিতে তার স্বামী আলমগীর আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে জায়েদাকে হত্যা করেছে বলে স্বীকার করে। তার দেওয়া তথ্য মতে আজ তার উঠানের সামন থেকে ৮ফুট নিচে পুতে রাখা জায়েদার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দাম্পত্য কলহের কারণে হত্যা হতে পারে। পুরো ঘটনা উদঘাটনে তদন্ত চলছে।



















