img

চট্টগ্রামে জশনে জুলুসে পদদলিত হয়ে দুজনের মৃত্যু

প্রকাশিত :  ০৯:৩৬, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৫৭, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫

চট্টগ্রামে জশনে জুলুসে পদদলিত হয়ে দুজনের মৃত্যু

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত জশনে জুলুসে পদদলিত হয়ে চট্টগ্রামে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ছয়জন। আজ শনিবার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে নগরের মুরাদপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

পদদলিত হয়ে মারা গেছেন- চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বাসিন্দা আইয়ুব আলী (৬০) ও নগরের কালামিয়া বাজার এলাকার সাইফুল ইসলাম (১৩)।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী ইনচার্জ সোহেল রানা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজনকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

হতাহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নিয়ে যান আঞ্জুমানে রহমানিয়া ট্রাস্টের মেডিকেল টিমের সদস্যরা। তাদের এক সদস্য আমিনুর রহমান বলেন, মানুষের ভিড়ের মধ্যে গরমে অসুস্থ হয়ে বেশ কয়েকজন নিচে পড়ে যান। এ সময় পদদলিত হয়েছেন হতাহতরা। আহত অবস্থায় আটজনকে উদ্ধার করে আমরা হাসপাতালে নিয়ে আসি। এর মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

এর আগে সকাল ১০টার দিকে আলমগীর খানকা শরীফ থেকে ৫৪তম জশনে জুলুসের শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শোভাযাত্রার নিরাপত্তায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ ছাড়া আঞ্জুমানের স্বেচ্ছাসেবক কর্মীরা কাজ করছেন।

ভোর থেকে নগরীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে ট্রাক, মিনি ট্রাক সাজিয়ে জুলুসকে সফল করতে অপেক্ষা করছেন। এর আগে, শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে ষোলশহর জামেয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকায় লাখো মানুষ ভিড় জমান।

ইসলামের প্রবর্তক ও নবী মুহাম্মাদের জন্মদিন উদযাপন করার উদ্দেশে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৩ বছর পর থেকেই প্রতিবছর ইসলামি বর্ষপঞ্জির ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে আঞ্জুমান ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রামে জশনে জুলুস অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

ঐতিহাসিক এ জুলুসের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ (মাদজাল্লাহু আলি)। বিভিন্ন পীর-মাশায়েখ ও আলেম-ওলামারা জুলুসে অংশ নিয়েছেন।

আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ বলেন, জশনে জুলুস হচ্ছে নবীপ্রেমের সোনালি প্রদীপ। লাখো মানুষের এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, মুসলমানরা নবীজির (সা.) ভালোবাসায় সর্বদা ঐক্যবদ্ধ। ১৯৮০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই জুলুস এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সমাবেশে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম আজ ঈমান, ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার মহোৎসবে রূপ নিয়েছে।

পথে পথে দেখা যায় এক অনন্য দৃশ্য। প্রতিটি মোড়ে শরবত, পানি ও তাবাররুকের ব্যবস্থা রেখেছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। ছোট্ট শিশুরাও হাতে শরবতের গ্লাস নিয়ে ভক্তদের আপ্যায়ন করছে। বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও এ সেবায় অংশ নিয়েছে। ফলে পুরো জুলুস রূপ নিয়েছে অতিথি আপ্যায়ন আর ভ্রাতৃত্বের মহা উৎসবে।

চট্টগ্রামে জশনে জুলুস শুরু হয় ১৯৮০ সালে। টানা ৫৪ বছর ধরে আনজুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট এই আয়োজন করে আসছে। ঐতিহ্যবাহী এ জুলুস এখন শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী সুন্নি মুসলমানদের কাছে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রতিবছর লাখো ভক্ত-অনুরাগীর সমাগমে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় শোভাযাত্রায় রূপ নিয়েছে।


জাতীয় এর আরও খবর

img

কাঠগড়ায় মাথা নিচু করে ছিলেন গাজী নজরুল, কাঁদছিলেন প্রথম স্ত্রী

প্রকাশিত :  ১৮:৪৩, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কড়া নিরাপত্তায় আদালতে আনা হয় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম (৭৫) ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে (৬৫)। দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) আত্মহত্যার ঘটনায় প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় তাদের কাঠগড়ায় তোলা হলে শুনানি শেষে গাজী নজরুলের চার দিন এবং স্ত্রী মাকছুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম শুনানি শেষে বেলা ৩টা ৩১ মিনিটে এ আদেশ দেন।

এর আগে বেলা ২টা ২২ মিনিটে পুলিশের একটি সাদা ব্যক্তিগত গাড়িতে করে গাজী নজরুল ও তার স্ত্রীকে আদালতের হাজতখানায় আনা হয়। পরে বেলা ৩টা ৬ মিনিটে তাদের হাজতখানা থেকে বের করে পঞ্চমতলার ৮ নম্বর আদালতের এজলাসে নেওয়া হয়। তাদের হাতে হাতকড়া না থাকলেও ছিল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট। নজরুলের মুখে মাস্ক ও বাঁহাতে সোনালি ঘড়ি দেখা যায়। এজলাসে তোলার পর ৩টা ১২ মিনিটে তাদের হেলমেট ও জ্যাকেট খোলা হয়। ৩টা ১৪ মিনিটে বিচারক এজলাসে পৌঁছান এবং ৩টা ১৫ মিনিটে শুনানির কার্যক্রম শুরু হয়।

শুনানির শুরুতে প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে আসামিদের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গাজী নজরুল মাথা নিচু করেন। এ সময় তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে কাঁদতে দেখা যায়। শুনানির অধিকাংশ সময়ই মাথা নিচু করে ছিলেন সংসদ সদস্য, আর স্ত্রী ছিলেন নিশ্চুপ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুজ্জোহা সরকার আসামিদের সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, মরিয়ম খাতুন যখন গলায় ফাঁস দেন, তখন আসামিরা একই বাসায় উপস্থিত ছিলেন। এই আত্মহত্যার পেছনে তাদের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা বা প্ররোচনা ছিল কি না, তা বিস্তারিত উদ্ঘাটনে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিনের আবেদন জানান আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, আসামি একজন চারবারের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি এবং তার স্ত্রী দুজনেই বয়োবৃদ্ধ ও সম্মানিত ব্যক্তি। এ ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আসামি তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে ভালোবাসতেন। অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা ঘটে গেছে, যার তদন্তে তিনি সহযোগিতা করবেন। ফলে রিমান্ডের কোনো যৌক্তিকতা নেই।

এর তীব্র বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী। তিনি আদালতকে বলেন, মামলার বাদীর শ্যালককে নানা প্রলোভন দেখিয়ে আসামি নজরুল তার মেয়েকে বিয়ে করতে বাধ্য করেছিলেন। পরবর্তীতে তাকে বিভিন্ন হোটেল-মোটেলে নেওয়া হয়। বিয়ের পর থেকে নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মিলে মরিয়মকে তীব্র মানসিক নির্যাতন করতেন, যার প্রমাণ মেলে মরহুমার রেখে যাওয়া সুইসাইড নোটে। মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরেই তিনি এমন পথ বেছে নিয়েছেন। ঘটনার পেছনের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে রিমান্ড আবশ্যক।

শুনানি চলাকালে পিপি জামায়াত সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মন্তব্য করলে বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে মামলার মূল বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দেন। ওই সময় গাজী নজরুল সামান্য মাথা তুলে আইনজীবীর দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করেন এবং স্ত্রীকে কাঁদতে নিষেধ করেন।

উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত গাজী নজরুলের চার দিন এবং মাকছুদা ইসলামের এক দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালতের আদেশ শেষে কাঠগড়া থেকে নামানোর সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম দাবি করেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন না। মরিয়মের আত্মহত্যার কারণও তার জানা নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি। বেলা ৩টা ৩৪ মিনিটে আবারও হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে তাদের হাজতখানায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় আদালতের বারান্দা থেকে কয়েকজন আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে স্লোগান দিতে দেখা যায়।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত হন গাজী নজরুল ইসলাম। এর আগে গত জুলাই মাসে এক তরুণীর সঙ্গে তার একটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তখন নজরুল ইসলাম দাবি করেছিলেন, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম।

রোববার বিকেলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ফ্ল্যাটে সংসদ সদস্য তার দুই স্ত্রীকে নিয়েই থাকতেন। ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসতে বলেন নজরুল। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামের বাসিন্দা ও পেশায় মুদিদোকানি মাসুম বিল্লাহ শ্যালিকাকে নিয়ে ফ্ল্যাটে গিয়ে ভেতর থেকে বন্ধ কক্ষের দরজা ভেঙে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় মেয়ের লাশ দেখতে পান। সেখান থেকে পুলিশ একটি সুইসাইড নোটও উদ্ধার করে।

পরিবারের অভিযোগ, গত জুন মাসে ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ের পর থেকেই ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মিলে বিভিন্ন বিষয়ে মরিয়মের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। এ ঘটনায় রোববার গভীর রাতে মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। মামলায় সংসদ সদস্য ও তার স্ত্রীর পাশাপাশি নজরুলের সাবেক গাড়িচালক ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকেও আসামি করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।