রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জী: চা–শ্রমিক সমাজের অগ্নিঝরা সংগ্রামের অক্লান্ত সেনানী
সংগ্রাম দত্ত
বাংলাদেশের চা–শিল্পাঞ্চলের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেরা ছিলেন স্বল্পস্বচ্ছল, কিন্তু নেতৃত্ব দিয়েছেন হাজারো মানুষের অধিকার আন্দোলনকে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ফুলছড়া চা বাগানের সন্তান রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জী সেই অগ্নিপুরুষদের একজন—যাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় সংগ্রাম, ত্যাগ ও নেতৃত্বের দীপ্তিতে উজ্জ্বল।
তাঁর ৮৬ বছরের জীবন কেবল একজন শ্রমিক নেতার জীবন নয়; এটি চা–শ্রমিক সমাজের জাগরণের ইতিহাস, আত্মমর্যাদার ইতিহাস, আর বিরুদ্ধ স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অদম্য সাহসের ইতিহাস।
অদম্য ইচ্ছাশক্তির উৎস: ফুলছড়া বাগান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৪০ সালের ২০ নভেম্বর ফুলছড়া চা বাগানে জন্ম নেওয়া রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জী এক সময় হয়ে ওঠেন পূর্ব বাংলার চা–শ্রমিক সম্প্রদায়ের প্রথম উচ্চশিক্ষিত প্রতিনিধি। বাবার নাম দাসিয়া সরদার—যিনি নিজেও শ্রমিক সমাজের কষ্ট-দুঃখ দেখেছেন খুব কাছে থেকে। আর এই সমাজ থেকেই উঠে এলেন রাজেন্দ্র, নিজের মেধা ও দৃঢ়তায় ভেঙে দিলেন শিক্ষার সব অদৃশ্য দেয়াল।
১৯৬০ সালে শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে তিনি ভর্তি হন সিলেট এমসি কলেজে। এরপর ১৯৬৫ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে তিনি ইতিহাস গড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে (এলএলবি) ভর্তি হন—চা শ্রমিক সমাজের প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে।
তারপর ১৯৬৮ সালে সরকারি শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রে শ্রমকল্যাণ সংগঠক পদে যোগদান করেন মাত্র ১৫০ টাকা বেতনে। কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকে অন্য জায়গায়—চা–শ্রমিক সমাজের মুক্তির সংগ্রামে।
শৈশবেই নেতৃত্বের বীজ: প্রথম ছাত্র সংগঠন গঠনের গল্প
১৯৪৮ সালের ৩ জুন মৌলভীবাজার মহকুমার কুলাউড়া থানায় প্রতিষ্টা করেন শ্রীহট্ট চা শ্রমিক ইউনিয়ন। প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হলেন পূর্ণেন্দু কিশোর সেনগুপ্ত, এমএলএ, সহসভাপতি জীবন সাওতাল, সাধারণ সম্পাদক নিকুঞ্জ বিহারী চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক দর্গেশ দেব।
১৯৫৪ সালে কুলাউড়ায় চা–শ্রমিক ইউনিয়নের এক সভায় বাবার সঙ্গে গিয়ে প্রথমবারের মতো ইউনিয়ন নেতাদের কাছ থেকে সরাসরি শ্রমিক অধিকার নিয়ে কথা শুনেন সপ্তম শ্রেণির এই কিশোর। সেই সভাই তাঁকে প্রশ্ন করায়—শ্রমিকদের ইউনিয়ন থাকলে ছাত্রদের কেন থাকবে না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন—‘শ্রীহট্ট জেলা চা–শ্রমিক ছাত্র ইউনিয়ন’, যা পরে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ভ্যালির বাগানে।
সংগঠন ও রাজনীতির কঠিন বাস্তব: সুলেমানের রোষানল থেকে গণআন্দোলনের উত্থান
স্টুডেন্ট ইউনিয়নের দাবি–দাওয়া তুলে ধরতে গিয়ে তৎকালীন চা–শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা এম. সুলেমানের বিরোধিতার মুখেও রাজেন্দ্র দলকে সংঘবদ্ধ রাখেন।
১৯৬৯ সালের আন্দোলনে চা–শ্রমিকরা প্রথম সরকারি ন্যূনতম মজুরির স্বীকৃতি পায়—যা শ্রমিক রাজনীতিতে বড় মাইলফলক।
উত্থানের শীর্ষে রাজেন্দ্র গ্রুপ: আধুনিক চা–শ্রমিক ইউনিয়নের জন্ম
১৯৭০ সালে এম. সুলেমানের পলায়নের পর শ্রীমঙ্গলের ঐতিহাসিক রেলওয়ে মাঠে হাজারো শ্রমিকের উপস্থিতিতে যে নেতৃত্ব গঠিত হয়—সেখানেই জন্ম নেয় আধুনিক চা–শ্রমিক ইউনিয়ন, এবং সর্বসম্মতিক্রমে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জী।
যুদ্ধ, নির্যাতন ও আত্মগোপন: ১৯৭১–এর ভয়াল দিনগুলো
মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথম আঘাত আসে চা–শ্রমিকদের ওপর।
১৯৭১ সালের ৬ জুলাই রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জীকে ফুলছড়া বাগানের ঘর থেকে ধরে সিন্দুরখান ক্যাম্পে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়।
১৯৭২ সালের চা শ্রমিক আন্দোলন ও বসন্ত হত্যাকাণ্ড
১৯৭২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর চা–শিল্পাঞ্চলের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় দিন।
সেদিন চা শ্রমিক নেতা বসন্ত বুনার্জীকে ধরে এনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জী, সুরেন্দ্র চন্দ্র বুনার্জী ও তাঁদের সহযোগীরা তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেননি।
এরপর শুরু হয় রাজনৈতিক সংঘর্ষ, লাল বাহিনীর উত্থান, এবং শ্রমিক ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ দখলের চক্রান্ত।
এই সংঘর্ষের আগুনে ঘরবাড়ি পুড়ে যায় ফুলছড়া, কালীঘাট, খেজুরিছড়া ও সিন্দুরখানে। অপহৃত হয় লক্ষ্মী নামে এক শ্রমিক মেয়ে।
রাজেন্দ্র আত্মরক্ষার জন্য শ্রমিকদের নিয়ে তীরন্দাজ বাহিনী গঠন করেন। এর নেতৃত্বে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মোহন লাল সোম ও সীতারাম নাইডু।
কিন্তু ক্ষমতাসীন মহল এটিকে নকশাল কার্যক্রম হিসেবে চিত্রিত করে।
পরিস্থিতি শান্ত করতে রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জী বিশাল সমাবেশ আহ্বান করেন। দায়িত্ব দেওয়া হয় ১৮ বছর বয়সী ছাত্রনেতা বসন্ত বুনার্জীকে।
সেই দায়িত্ব পালন শেষ করে ফেরার পথে তাঁকে অপহরণ, নির্যাতন ও অবশেষে হত্যা করা হয়।
বসন্ত হত্যার পর শ্রমিক বিস্ফোরণ
৩ অক্টোবর বসন্তের মৃতদেহ উদ্ধার হলে শ্রমিক সমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
৪ অক্টোবর শ্রমিকদের ঢলে শ্রীমঙ্গল অচল হয়ে যায়।
ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ও ছাত্র ইউনিয়নের সরল দত্ত দেবু অসাধারণ ভূমিকা রাখেন উত্তেজনা প্রশমনে। কিন্তু বিচার হয়নি। সাক্ষীরা ভয় পেয়েছেন, প্রভাবশালী মহলের চাপ ছিল, মামলা ভেস্তে যায়।
বসন্ত বুনার্জী আজও চা শ্রমিক আন্দোলনের অমর শহীদ
প্রতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্যোগে তাঁর শহীদ দিবস পালিত হয়।
দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব: ২০০৫ সাল পর্যন্ত অদম্য পথচলা
পরবর্তীতে রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জী ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা নেতৃত্ব দেন—যা আজও চা–শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে বিস্ময়কর এক অধ্যায়।
তিনি ছিলেন চা–শ্রমিক সমাজের প্রথম উচ্চশিক্ষিত, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা।
আজ বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও তাঁর বাড়ি ও স্মৃতি চা–শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস বহন করে চলেছে।



















