img

শ্রীমঙ্গলের শংকরটিলা লেক: প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্যে আরেকটি প্রাণহানি

প্রকাশিত :  ১৮:০৮, ০৮ মে ২০২৬

শ্রীমঙ্গলের শংকরটিলা লেক: প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্যে আরেকটি প্রাণহানি

সংগ্রাম দত্ত: চা-বাগানের সবুজ ঢেউ, পাহাড়ি টিলা, ঘন বনাঞ্চল আর নিস্তব্ধ লেক—সব মিলিয়ে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া চা বাগান যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব ক্যানভাস। কিন্তু সেই মনোমুগ্ধকর পরিবেশ বৃহস্পতিবার বিকেলে পরিণত হলো শোকের ঘটনায়। ভাড়াউড়া চা বাগান এলাকার শংকরটিলা সংলগ্ন লেকে পানিতে ডুবে মারা গেছেন শ্রী অন্তর সাহা (২৬) নামে এক টমটম চালক।

নিহত অন্তর সাহা উপজেলার শাহজীবাজারের দক্ষিণ উত্তরসূর এলাকার বাসিন্দা। তার পিতা দীলিপ সাহা (কালু)।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার (৭ মে)  বিকেলে অন্তর সাহা শংকরটিলায় অবস্থিত একটি মন্দির পরিদর্শনে যান। পরে পাশের লেকে স্নান করতে নামলে তিনি পানিতে তলিয়ে যান। দীর্ঘ সময় তাকে খুঁজে না পেয়ে আশপাশের লোকজন উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন।

বাগানের এক পাহারাদার বিষয়টি প্রথমে বাগান কর্তৃপক্ষকে জানান। পরে খবর পেয়ে শ্রীমঙ্গল ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। ডুবুরি দলের সহায়তায় সন্ধ্যার দিকে লেক থেকে অন্তরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহ শ্রীমঙ্গল থানায় নেওয়া হয়।

ঘটনার পর এলাকায় নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে অন্তরের টমটম গাড়ির ব্যাটারি নিয়ে সন্দেহের কথা উঠেছিল। তবে পরে নিশ্চিত হওয়া যায়, গাড়ির ব্যাটারি সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে এবং টমটমটিও উদ্ধার করা হয়েছে।

উদ্ধার অভিযানে থাকা এসআই দীপঙ্করের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

প্রকৃতির সৌন্দর্যের আড়ালে রহস্যঘেরা লেক

শংকরটিলা লেক স্থানীয়দের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত এক নৈসর্গিক স্থান হিসেবে। চারদিকে সবুজ চা বাগান, উঁচুনিচু পাহাড়ি টিলা, বনাঞ্চলের নির্জনতা এবং শান্ত জলরাশি মিলিয়ে এটি দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় এক গন্তব্য।

তবে স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই লেকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অতীতের কিছু বেদনাদায়ক স্মৃতিও। কয়েক দশক আগে একই লেক থেকে এক চা-বাগান ম্যানেজারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। 

জানা যায়, সাঁতার কাটতে নেমে দুর্ঘটনাবশত তার মৃত্যু হয়েছিল।

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা হলেও লেকটির কিছু অংশ বেশ গভীর এবং ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সতর্কতামূলক নির্দেশনার অভাবও এখানে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।

শোকের ছায়া

অন্তর সাহার মৃত্যুতে তার পরিবার ও এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিচিতজনদের ভাষ্য, তিনি ছিলেন শান্ত ও পরিশ্রমী একজন তরুণ। জীবিকার তাগিদে টমটম চালিয়ে পরিবারকে সহায়তা করতেন।

শ্রীমঙ্গলের অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু আবারও প্রশ্ন তুলেছে—পর্যটন ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় সংশ্লিষ্টদের আরও কার্যকর উদ্যোগ কতটা জরুরি।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

হারিয়ে যাচ্ছে শ্রীমঙ্গলের প্রাণরেখা গোপলা নদী, ভরাট আর অবহেলায় মৃতপ্রায় এক ঐতিহাসিক জলপথ

প্রকাশিত :  ১০:২৫, ০৯ মে ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: এক সময় যেখানে স্টিমার-জাহাজ চলত, আজ সেখানে জন্মেছে ধানক্ষেত। কোথাও কচুরিপানার স্তূপ, কোথাও শুকনো মাটি। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার একমাত্র নদী গোপলা এখন যেন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ লড়াই করছে।

চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন, ভূনবীর, মির্জাপুর ও সদর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত গোপলা নদী একসময় ছিল খরস্রোতা ও প্রাণচঞ্চল। বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা পানি এই নদী দিয়েই প্রবাহিত হয়ে হাইল হাওড়ে গিয়ে মিলত। নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল কৃষি, মৎস্য এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের এক সমৃদ্ধ জনপদ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপে আজ সেই নদী প্রায় মৃত।

ইতিহাস বলছে, বিলাশছড়া ও উদনাছড়া মতিগঞ্জ এলাকায় এসে মিলিত হওয়ার পর নদীটি ‘গোপলা’ নাম ধারণ করে। একসময় এ নদীপথে স্টিমার ও জাহাজ চলাচল করত। চা বাগানের মালামাল এবং ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহন হতো এই নদীপথে। নদীর তীরে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য নির্মিত জেটির স্মৃতি এখনও বহন করছে সদর ইউনিয়নের ‘জেটি রোড’ নামের এলাকা।

কিন্তু সেই নদীর আজ করুণ দশা। সরেজমিনে জিলাদপুর ও উত্তর উত্তরসুর এলাকায় দেখা গেছে, রাবারড্যামের পর থেকে গোপলা নদী তার পুরোনো গতিপথ হারিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গরুরদ্বারা হয়ে সেই পানি হাইল হাওড়ে গিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে নদীর মূল অংশ প্রায় মৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

কোথাও নদীর বুক শুকিয়ে ফেটে গেছে, কোথাও কচুরিপানায় ঢেকে আছে জলপথ। আবার কোথাও নদীর জমি দখল করে তৈরি হয়েছে মাছের খামার, বসতবাড়ি কিংবা ধানক্ষেত। এমনকি কোনো কোনো স্থানে নদী ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে চলাচলের রাস্তা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদী দখল ও ভরাট চললেও তা রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একইভাবে নদী খনন করে পুরোনো গতিপথ ফিরিয়ে আনতেও নেওয়া হয়নি কোনো বড় প্রকল্প।

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মানিক সরকার বলেন,

“প্রায় ত্রিশ বছর আগে নদীর গতিপথ বদলে যায়। এরপর থেকেই অনেক মানুষ জমি হারিয়েছেন। নদীর দুই পাশের প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমি এখন অনাবাদি পড়ে থাকে।”

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা কবির মিয়া জানান,

“রাবারড্যাম থেকে কালেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার নদী এখন মৃত। এর প্রভাব পড়েছে হাওড়ের বিলগুলোতে। দিঘালীয়াবিল, রাতারবিল, কুঞ্জবেরী, ঘোড়ামারা, আগুড়া, কুচবিল, চণ্ডীবিল, ছড়াডুবা, ধইলডুবাবিল, পাত্রবেরী ও নাইফতাডুবাবিল ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীনের পথে রয়েছে ডুমরবিল ও বাধাইবিল।”

তার মতে, নদীটি পুনঃখনন করে পুরোনো গতিপথ ফিরিয়ে আনা গেলে আবারও দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরতে পারে হাওড়াঞ্চলে।

মতিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা বলাল আহম্মেদ বলেন,

“নদীর নতুন গতিপথের কারণে আমার প্রায় বারো বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। বর্তমানে নদীটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এর প্রশস্ততাও কমে গেছে। পুরোনো গতিপথ খনন করা গেলে নদী আবার নাব্য ফিরে পাবে।”

গোপলা নদী রক্ষার দাবি অবশ্য নতুন নয়। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে জেলার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। সেই সভায় শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও রাজনীতিবিদ রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী গোপলা নদী পুনঃখননের জোর দাবি তোলেন।

তিনি রাষ্ট্রপতির সামনে তুলে ধরেছিলেন নদীটির গুরুত্ব, এর ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে এর সম্ভাবনার কথা। একইসঙ্গে তিনি বালিশিরা পাহাড়কে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণার দাবিও জানান। জানা যায়, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ মনোযোগ দিয়ে তার বক্তব্য শোনেন এবং বলেন, “নোট করে রাখা হলো।”

রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর সেই বক্তব্য তৎকালীন রেডিও বাংলাদেশ, সিলেট কেন্দ্র থেকেও একাধিকবার প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু চার দশক পেরিয়ে গেলেও গোপলা নদী পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন, “গোপলা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সমীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আমরা কাজ করব।”

প্রকৃতি, কৃষি, মৎস্য ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা গোপলা নদী এখন শুধুই এক মৃতপ্রায় জলধারা নয়; এটি শ্রীমঙ্গলের পরিবেশগত সংকটেরও প্রতীক। দ্রুত পুনঃখনন ও দখলমুক্ত করার উদ্যোগ না নিলে একদিন হয়তো এই নদীর অস্তিত্ব থাকবে শুধু মানচিত্রে, স্মৃতিতে আর ইতিহাসের পাতায়।