শ্রীমঙ্গলে বালুর নীরব সাম্রাজ্য: অভিযানেও থামছে না অবৈধ উত্তোলন, আড়ালে প্রভাবশালী চক্র
সংগ্রাম দত্ত: প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা বাগান ও বনাঞ্চলের জন্য পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা। পাহাড়, টিলা, ছড়া ও সবুজ প্রকৃতিতে ঘেরা এই পর্যটননির্ভর জনপদে সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র ছড়া ও কৃষিজমির আশপাশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। প্রশাসনের অভিযানে বালু জব্দ হলেও মূল হোতারা ধরা পড়ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার পারের টং গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় ছড়া ও ফসলি জমির কাছ থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান। এতে পরিবেশের ক্ষতি, কৃষিজমির ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এবং গ্রামীণ সড়ক ব্যবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও বিভিন্ন তথ্যের মাধ্যমে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। স্থানীয় সাংবাদিক ও বাসিন্দাদের পোস্টে ছড়া ও কৃষিজমির পাশ থেকে বালু উত্তোলনের দৃশ্য উঠে আসে। এসব পোস্ট দ্রুতই জনমনে আলোচনার জন্ম দেয় এবং প্রশাসনের নজরদারি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
দৈনিক কালের কণ্ঠের শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি মো. আল আমিন এবং দৈনিক খবরের কাগজের প্রতিনিধি মো. এহসানুল হক তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ও সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিষয়টি তুলে ধরেন। পাশাপাশি দৈনিক কালের কণ্ঠ ও দৈনিক বাংলা ট্রিবিউনের মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি মো. সাইফুল ইসলাম তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে উল্লেখ করেন, নতুন সরকার গঠনের পর শ্রীমঙ্গলে মব এবং অবৈধ বালু লুটের সঙ্গে জড়িত একটি চক্র আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠছে। এ ছাড়া ইতিপূর্বে শ্রীমঙ্গলের অবৈধ বালু ব্যবসার সাথে তদবিরে এক প্রভাবশালী সাংবাদিক জড়িত বলে তিনি এক পোস্টে উল্লেখ করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সংঘবদ্ধ একটি চক্র নিয়মিতভাবে বিভিন্ন স্থান থেকে বালু উত্তোলন করছে এবং তা পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে ভারী ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন। এসব যান চলাচলের কারণে গ্রামীণ সড়ক দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্ষাকালে কাদা জমে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থী, কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রতিদিনের চলাচলে ভোগান্তি বাড়ছে।
অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের ফলে কৃষিজমির স্বাভাবিক গঠনও পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, এতে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা, ভূমিক্ষয় ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে দি হেলদি চয়েজ অ্যান্ড ফুড বেভারেজ ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের পূর্ব পাশে জাগছড়াগামী সড়কের ডানদিকে একটি স্থান থেকেও অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, জাগছড়া এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির নেতৃত্বে ওই স্থান থেকে বালু উত্তোলন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিল্পপতি সিরাজুল ইসলাম হারুন মিয়া, অঞ্জু বর্মন এবং শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর জমির ওপর দিয়ে ট্রাক ব্যবহার করে বিভিন্ন সময় বালু পাচার করা হয়েছে। এছাড়া কিছুদিন পরপর ওই স্থান থেকে পুনরায় বালু উত্তোলন ও পাচারের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করে। সোমবার (২ মার্চ )সহকারী কমিশনার ভূমি মো. মহিবুল্লাহ আকনের নির্দেশনায় লাহারপুর ভূমি অফিসের তহসিলদার কনিকা দেবের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ২০ গাড়ি বালু জব্দ করা হয়। প্রশাসন জানিয়েছে, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, অনেক সময় শ্রমিক বা ট্রাকচালক আটক হলেও প্রকৃত পরিকল্পনাকারীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। ফলে অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও আবারও একই কার্যক্রম শুরু হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ইতিপূর্বে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বালু পরিবহনের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজনের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার পর প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করলেও দীর্ঘমেয়াদে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু বালু জব্দ করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অবৈধ উত্তোলনের উৎস চিহ্নিত করে মূল পরিকল্পনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও কৃষিজমি পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য খ্যাত শ্রীমঙ্গলের পরিবেশ ও অবকাঠামো রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণের ভারসাম্য বজায় রাখাই এই অঞ্চলের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।



















