img

সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করলেন অর্থমন্ত্রী

প্রকাশিত :  ১২:৩৭, ০৬ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৩:২৬, ০৬ এপ্রিল ২০২৬

সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করলেন অর্থমন্ত্রী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবম দিনে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

আজ সোমবার (৬ এপ্রিল) এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের (কুমিল্লা-৪) এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান। সংসদে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

অর্থমন্ত্রী সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকাও তুলে ধরেন। তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে-এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লি., এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লি., এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লি., এস আলম কোল্ড রোলেড স্ট্রিলস লি., সোনালী ট্রেডার্স, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লি., গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লি., চেমন ইস্পাত লি., এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লি., ইনফিনাইট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লি., কেয়া কসমেটিকস লি., দেশবন্ধু সুগার মিলস লি., পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট লি., পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্লান্ট লি., প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লি., কেরানীগঞ্জ ফুডস (প্রা.) লি., মুরাদ এন্টারপ্রাইজ, সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি, বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস লি. এবং রংধনু বিল্ডার্স (প্রা.) লিমিটেড।

মন্ত্রী আরও জানান, বর্তমান সংসদ সদস্য ও তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। তবে এর মধ্যে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি।

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলা করে, ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাই বাংলাদেশের অর্থনীতি

প্রকাশিত :  ১১:৫৯, ০১ মে ২০২৬

সিনিয়র রিপোর্টার সৈয়দ আমানউল্লাহ: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন বিএনপি সরকারকে একটি ভঙ্গুর ও চ্যালেঞ্জিং অর্থনীতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে, দেশের অর্থনীতি একটি মিশ্র ও চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ, খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর অবস্থার উত্তরণের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থিতিশীলতা ফেরার মতো ইতিবাচক প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি মাঝারি প্রবৃদ্ধি (প্রায় ৫%) ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছে । মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করা (প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার) প্রধান লক্ষ্য । এছাড়া, এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণ এবং নতুন সরকার কর্তৃক অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চলছে । 

প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন: ২০২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৫০ শতাংশের আশেপাশে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কৃষি ও শিল্প খাতের ওপর নির্ভরশীল । আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ।

বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (ADB) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া কিছুটা শ্লথ হলেও প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

রিজার্ভ ও বাণিজ্য: ঈদুল ফিতরসহ বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হয়েছে । বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে এবং রিজার্ভ প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল হয়েছে । তবে আমদানিনির্ভরতা এবং ডলারের উচ্চমূল্য এখনো চিন্তার বিষয় ।

মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্য: মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের জন্য অন্যতম বড় চাপ। 

মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও ধীরগতিতে তা কমার প্রবণতা রয়েছে । খাদ্যপণ্যের দাম এখনো কিছুটা বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকার তা কমিয়ে আনতে বিভিন্ন আর্থিক ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

খেলাপি ঋণ:  ব্যাংক খাতে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ (Non-Performing Loans) এবং আর্থিক সুশাসনের অভাব বিগত সরকারের সময় থেকে পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার এসব প্রতিষ্ঠানে সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের কাজ করছে।

রাজস্ব ও বাজেট ঘাটতি: কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাজস্ব আদায় না হওয়ায় এবং ভর্তুকি ও ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ায় সরকারের ব্যাংক ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে।

রপ্তানি খাত: আরএমজি (Ready-Made Garments) বা তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি, যা মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪% নিশ্চিত করে। চীন-এর পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির কারণে কাঁচামাল আমদানি, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম এবং শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় কারখানা গুলোর উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। ডলার সংকটের কারণে অনেক কারখানার সময়মতো এলসি খুলতে সমস্যা হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সময়মতো পণ্য ডেলিভারি ও পেমেন্টে। শ্রমিক অসন্তোষ এর কারণে অনেক কারখানা বন্ধ, বকেয়া বেতন এবং কাজের পরিবেশ নিয়ে মাঝে মাঝেই কিছু কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভ দেখা যায়। এছাড়া বর্ধিত খরচের চাপে কিছু ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করে, তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ: কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষিত তরুণ ও যুবকদের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সাথে সাথে নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

রেমিট্যান্স (Remittance): এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত (প্রথম ৪ মাসে) বাংলাদেশে মোট ১২.৫ বিলিয়ন (১,২৫০ কোটি) মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ।  

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই চার মাসে আসা রেমিট্যান্সের মাসিক হিসাব অনুযায়ী 

জানুয়ারি মাসে এসেছে ৩.১৭ বিলিয়ন (৩১৭ কোটি) ডলার, ফেব্রুয়ারি মাসে এসেছে ৩.০২ বিলিয়ন (৩০২ কোটি) ডলার, মার্চ মাসে এসেছে ৩.৭৫ বিলিয়ন (৩৭৫ কোটি) ডলার, (যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ মাসিক রেকর্ড)। এপ্রিল মাসের প্রথম ২৮ দিনে ২.৯১ বিলিয়ন (২৯১ কোটি) ডলার এসেছে । মাস শেষে এই সংখ্যাটি আনুমানিক ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। মোট প্রবাহ, এই সময়ে প্রবাসীরা প্রায় ১২.৮৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রায় ১৬% থেকে ২০% প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ।

বাজেট ও চ্যালেঞ্জ: সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বড় বাজেট প্রণয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে । মূল চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি । 

সার্বিকভাবে, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির ক্ষত ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন সরকারের যাত্রা কিছুটা কঠিন হলেও ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সরকার কাঠামোগত সংস্কার ও আর্থিক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেছে। ২০২৬ সালটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি \"পরীক্ষার বছর\", বলা যেতে পারে।