ভেন্টিলেটরে কালনাগিনী: শ্রীমঙ্গলে আতঙ্ক, বন উজাড়ে জীববৈচিত্র্য সংকটের নতুন সতর্কবার্তা
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টাফ কোয়ার্টারের এক ডাক্তারের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটের একটি ভেন্টিলেটর ভেঙে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা একটি বিষধর কালনাগিনী সাপ উদ্ধার করেছেন। ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন আতঙ্কের সৃষ্টি করেনি; স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বসবাসরত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য সেবাকর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ অঞ্চলের বন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্রমাবনতির বাস্তবতা।
সোমবার (৬ এপ্রিল) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে স্টাফ কোয়ার্টারের তৃতীয় তলায় শ্রাবণ পালের বাসায় প্রথমে সাপটি দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। মুহূর্তেই তারা আতঙ্কিত হয়ে তৃতীয় তলা ভবন থেকে নিচে নেমে পড়েন । ঘটনার খবর পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনতিয়া তাসমিম দ্রুত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সীতেশ রঞ্জন দেবকে অবহিত করেন। পরে ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল এবং পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভবনের তৃতীয় তলা ফ্ল্যাটের ভেন্টিলেটরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সাপটিকে শনাক্ত করেন। পরিচালক স্বপন কুমার দেব সজল ভেন্টিলেটরের কিছু অংশ ভেঙ্গে প্রায় আধাঘণ্টার সতর্ক প্রচেষ্টায় তারা সাপটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে সেটি শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে অবমুক্তির জন্য হস্তান্তর করা হয়।
স্থানীয়ভাবে ঘটনাটি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করলেও পরিবেশবিদরা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিবেশগত অব্যবস্থাপনারই প্রতিফলন।
‘চায়ের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল উপজেলা চারপাশে হাওর, পাহাড়, বনাঞ্চল ও চা বাগানে ঘেরা এক সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক অঞ্চল। কিন্তু গত কয়েক দশকে অবাধ বন উজাড়, দখল এবং অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো নির্মাণের ফলে এই অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংরক্ষিত বনভূমির বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বসতি, রিসোর্ট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। এতে করে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল দ্রুত সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত দুই দশকে তারা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারেরও বেশি বন্যপ্রাণী—সাপ, অজগর, পাখি ও অন্যান্য জীবজন্তু—উদ্ধার করে স্থানীয় বন বিভাগের কাছে অবমুক্তির জন্য হস্তান্তর করেছে। এই পরিসংখ্যানই ইঙ্গিত দেয়, বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে প্রবেশ এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং ক্রমবর্ধমান একটি প্রবণতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বনভূমি ধ্বংস ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারানোর ফলে বন্যপ্রাণীরা খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মানুষের বসতিতে ঢুকে পড়ছে। ফলে মানুষ ও প্রাণী—উভয়ের জন্যই ঝুঁকি বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত পাঁচ দশকে বন উজাড় করে সঙ্ঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠী বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসব বিষয় উঠে এলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়ে গেছে।
রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে বন সংরক্ষণ কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভেন্টিলেটরে আশ্রয় নেওয়া কালনাগিনী যেন একটি প্রতীক—প্রকৃতি তার নিজস্ব ভারসাম্য হারালে তার প্রতিক্রিয়া মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বন উজাড় বন্ধ, দখলমুক্তকরণ এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল পুনরুদ্ধারে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটবে।
শ্রীমঙ্গলের এই ঘটনাটি তাই শুধু একটি সাপ উদ্ধারের খবর নয়; এটি আমাদের পরিবেশ, উন্নয়ন ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দেয়।



















