img

ভেন্টিলেটরে কালনাগিনী: শ্রীমঙ্গলে আতঙ্ক, বন উজাড়ে জীববৈচিত্র্য সংকটের নতুন সতর্কবার্তা

প্রকাশিত :  ১৯:৩৩, ০৬ এপ্রিল ২০২৬

ভেন্টিলেটরে কালনাগিনী: শ্রীমঙ্গলে আতঙ্ক, বন উজাড়ে জীববৈচিত্র্য সংকটের নতুন সতর্কবার্তা

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টাফ কোয়ার্টারের এক ডাক্তারের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটের একটি ভেন্টিলেটর ভেঙে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা একটি বিষধর কালনাগিনী সাপ উদ্ধার করেছেন। ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন আতঙ্কের সৃষ্টি করেনি; স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বসবাসরত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য সেবাকর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ অঞ্চলের বন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্রমাবনতির বাস্তবতা।

সোমবার (৬ এপ্রিল) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে স্টাফ কোয়ার্টারের তৃতীয় তলায় শ্রাবণ পালের বাসায় প্রথমে সাপটি দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। মুহূর্তেই তারা আতঙ্কিত হয়ে  তৃতীয় তলা ভবন থেকে নিচে নেমে পড়েন । ঘটনার খবর পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনতিয়া তাসমিম দ্রুত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সীতেশ রঞ্জন দেবকে অবহিত করেন। পরে ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল এবং পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভবনের তৃতীয় তলা ফ্ল্যাটের ভেন্টিলেটরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সাপটিকে শনাক্ত করেন। পরিচালক স্বপন কুমার দেব সজল ভেন্টিলেটরের কিছু অংশ ভেঙ্গে প্রায় আধাঘণ্টার সতর্ক প্রচেষ্টায় তারা সাপটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে সেটি শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে অবমুক্তির জন্য হস্তান্তর করা হয়।

স্থানীয়ভাবে ঘটনাটি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করলেও পরিবেশবিদরা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিবেশগত অব্যবস্থাপনারই প্রতিফলন।

‘চায়ের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল উপজেলা চারপাশে হাওর, পাহাড়, বনাঞ্চল ও চা বাগানে ঘেরা এক সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক অঞ্চল। কিন্তু গত কয়েক দশকে অবাধ বন উজাড়, দখল এবং অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো নির্মাণের ফলে এই অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংরক্ষিত বনভূমির বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বসতি, রিসোর্ট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। এতে করে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল দ্রুত সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত দুই দশকে তারা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারেরও বেশি বন্যপ্রাণী—সাপ, অজগর, পাখি ও অন্যান্য জীবজন্তু—উদ্ধার করে স্থানীয় বন বিভাগের কাছে অবমুক্তির জন্য হস্তান্তর করেছে। এই পরিসংখ্যানই ইঙ্গিত দেয়, বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে প্রবেশ এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং ক্রমবর্ধমান একটি প্রবণতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বনভূমি ধ্বংস ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারানোর ফলে বন্যপ্রাণীরা খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মানুষের বসতিতে ঢুকে পড়ছে। ফলে মানুষ ও প্রাণী—উভয়ের জন্যই ঝুঁকি বাড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত পাঁচ দশকে বন উজাড় করে সঙ্ঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠী বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসব বিষয় উঠে এলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়ে গেছে।

রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে বন সংরক্ষণ কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভেন্টিলেটরে আশ্রয় নেওয়া কালনাগিনী যেন একটি প্রতীক—প্রকৃতি তার নিজস্ব ভারসাম্য হারালে তার প্রতিক্রিয়া মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বন উজাড় বন্ধ, দখলমুক্তকরণ এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল পুনরুদ্ধারে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটবে।

শ্রীমঙ্গলের এই ঘটনাটি তাই শুধু একটি সাপ উদ্ধারের খবর নয়; এটি আমাদের পরিবেশ, উন্নয়ন ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দেয়।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

কোদালিছড়া বন্ধ, শহর বন্দী: জলাবদ্ধতায় মৌলভীবাজার শহর ও শহরতলী

প্রকাশিত :  ১৮:৩৮, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারে গ্রীষ্মের শেষভাগ মানেই এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা—বর্ষা পুরোপুরি না নামলেও হঠাৎ ঝড়, দমকা হাওয়া আর বজ্রসহ বৃষ্টিতে শহরের প্রকৃত চিত্র বারবার উন্মোচিত হয়। সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই যখন একটি শহর পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন সেটি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের গল্প থাকে না; হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা আর অবহেলার নির্মম প্রতিচ্ছবি।

গত সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তুলনামূলক স্বল্প সময়ের বৃষ্টিতেই মৌলভীবাজার পৌর শহরের রাস্তাঘাট ডুবে যায়, দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে, অসংখ্য পরিবারের ঘরে প্রবেশ করে বৃষ্টির পানি। কারো ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারো আসবাবপত্র নষ্ট হয়েছে, কারো জীবনের সঞ্চয় এক রাতেই ভেসে গেছে। অথচ এই দৃশ্য নতুন নয়—বরং বছর ঘুরে ঘুরে ফিরে আসা এক চেনা দুর্ভোগ।

এই সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে কোদালিছড়া—পৌরসভার পানি নিষ্কাশনের প্রধান এবং কার্যত একমাত্র মাধ্যম। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে পানির প্রবাহ থাকার কথা, সেখানে এখন দেখা যায় স্থির, বদ্ধ পানি। ছড়ার বুকে ভাসে পলিথিন, ময়লা-আবর্জনা; বাতাসে ছড়ায় দুর্গন্ধ। আশপাশের মানুষের জন্য এটি শুধু অসুবিধাই নয়, এক ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিরও নাম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছড়ার ভাটিতে তৈরি হওয়া কয়েকটি অস্থায়ী বাঁধই এই সংকটের অন্যতম মূল কারণ। এসব বাঁধ পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে, ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারছে না। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে বহুবার সতর্ক করা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কিছু এলাকায় আংশিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হলেও সমস্যার মূল জায়গাগুলো অরক্ষিতই থেকে গেছে।

ড্রেনেজ ব্যবস্থার অবস্থাও কম করুণ নয়। শহরের অনেক ড্রেন ময়লা ও প্লাস্টিকে ভরে গেছে; কোথাও কোথাও ড্রেনের অস্তিত্বই বোঝা যায় না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং নাগরিক অসচেতনতা—সব মিলিয়ে একটি অচল ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে, যার খেসারত দিচ্ছে পুরো শহর।

একসময় অবশ্য এই পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিল।

২০১৮ সালে কোদালিছড়া সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থাও ছিল। নাগরিকদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে প্রতিদিন ছড়ার পরিচর্যা করা হতো। সেই উদ্যোগের ফলে কয়েক বছর জলাবদ্ধতার তীব্রতা কমে এসেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে। প্রশ্ন উঠছে—যে অর্থ এখনো নাগরিকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে, তার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি?

বর্তমানে পৌরসভায় কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় শহর পরিচালিত হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় দ্রুততা ও জবাবদিহিতার অভাব স্পষ্ট। সম্ভাব্য নেতৃত্বের কথা শোনা গেলেও এই সংকটকালে তাদের দৃশ্যমান ভূমিকা খুব একটা চোখে পড়ে না।

তবে দায় শুধু প্রশাসনের নয়। নাগরিক হিসেবেও দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। ড্রেনে ময়লা ফেলা, প্লাস্টিক ব্যবহারে উদাসীনতা—এসব আচরণ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। টেকসই সমাধানের জন্য তাই দরকার সমন্বিত উদ্যোগ—প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোদালিছড়াকে সচল করা, ভাটির বাঁধগুলো দ্রুত অপসারণ, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার—এই চারটি পদক্ষেপ এখন জরুরি। নইলে সামনে আসা পূর্ণ বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখানো হয়েছে বহুবার। কিন্তু একটি শহর যদি নিজের বৃষ্টির পানি সামলাতে না পারে, তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

২৭ এপ্রিলের রাত যেন আরেকটি সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। এখনো সময় আছে—সঠিক সিদ্ধান্ত আর কার্যকর উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। কারণ একটি শহর শুধু অবকাঠামোর সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বপ্ন আর টিকে থাকার প্রতিচ্ছবি।


সিলেটের খবর এর আরও খবর