img

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি শুরু? ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত ও এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা

প্রকাশিত :  ১৮:২৪, ০৭ এপ্রিল ২০২৬

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি শুরু? ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত ও এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা

লেখক: ওমর খৈয়াম, সিনিয়র প্রতিবেদক, দ্য গ্লোবাল ক্রাইসিস অবজারভেটরি, তেহরান

অনুবাদ: রেজুয়ান আহম্মেদ

তেহরান থেকে সরাসরি, ৭ এপ্রিল ২০২৬ — মানব সভ্যতার ইতিহাসে ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল এক ভয়াবহতম দিন হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ আজ তার ৩৯তম দিনে পদার্পণ করেছে। এই মুহূর্তে পুরো বিশ্ব এক গভীর অনিশ্চয়তা ও সম্ভাব্য মহাপ্রলয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এমন এক বিন্দুতে এসে ঠেকেছে, যেখানে কূটনীতির ভাষা স্তব্ধ হয়ে গেছে এবং বারুদের গন্ধই হয়ে উঠেছে একমাত্র বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া এক চরম আল্টিমেটাম এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অনমনীয় অবস্থান কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, বরং একটি প্রাচীন সভ্যতার অস্তিত্ব বিলুপ্তির হুমকি তৈরি করেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষায়, \"একটি আস্ত সভ্যতা আজ রাতে মারা যাবে, যা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।\" এই প্রতিবেদনটি বর্তমান সংকটের গভীরতা, সামরিক অভিযানের গতিপ্রকৃতি, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব এবং এই যুদ্ধের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছে।

চূড়ান্ত সময়সীমা ও অস্তিত্বের লড়াই: ডোনাল্ড ট্রাম্পের মহাহুমকি

৭ এপ্রিল ২০২৬, মঙ্গলবার। ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় রাত ৮টা (জিএমটি মধ্যরাত) ইরানের জন্য চূড়ান্ত সময়সীমা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক অভাবনীয় বার্তায় ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, যদি এই সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না করা হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো এমনভাবে ধ্বংস করবে যে দেশটি ‘পাথর যুগে’ ফিরে যেতে বাধ্য হবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই হুমকির গভীরতা অনুধাবন করলে দেখা যায়, এটি কেবল একটি সামরিক কৌশল নয়, বরং একটি জাতির অস্তিত্বের মূলে চরম আঘাত। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে ইরানের প্রতিটি সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ধ্বংস করে দেওয়া হবে। হোয়াইট হাউসের এক ব্রিফিংয়ে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা এমন পর্যায়ে রয়েছে যে তারা চাইলে এক রাতের মধ্যেই পুরো ইরানকে মানচিত্র থেকে মুছে দিতে পারে।

ট্রাম্পের আল্টিমেটামের মূল দিকগুলো হলো: চূড়ান্ত সময়সীমা ৭ এপ্রিল রাত ৮টা (ইএসটি) বা জিএমটি মধ্যরাত; মূল লক্ষ্য হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্তকরণ এবং মার্কিন শর্ত মেনে নেওয়া; হুমকির প্রকৃতি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সেতু, রেলপথ ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা; সামরিক অবস্থান ‘এক রাতেই পুরো দেশ শেষ হয়ে যেতে পারে’; এবং আইনি অবস্থান যুদ্ধাপরাধ বা জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘনের বিষয়ে ভ্রুক্ষেপহীনতা।

প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ট্রাম্পের এই ভাষাকে ‘যুদ্ধাপরাধের স্পষ্ট উস্কানি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি এই ধরনের কোনো আন্তর্জাতিক বা মানবিক আইনের তোয়াক্কা করেন না; তার একমাত্র লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালী মুক্ত করে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহ নিশ্চিত করা।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও ‘পাথর যুগ’ তত্ত্ব

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ‘পাথর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি কেবল সামরিক নয়, বরং এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ। তিনি দাবি করেছেন যে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানি সাধারণ মানুষের কথোপকথন আড়ি পেয়ে শুনেছে, যেখানে তারা নাকি মার্কিন বোমা হামলাকে সমর্থন করছে—এটি একটি অত্যন্ত বিতর্কিত দাবি। ট্রাম্পের এই কৌশলের পেছনে ইরান সরকারকে ভেতর থেকে দুর্বল করার এক গভীর পরিকল্পনা কাজ করছে। তিনি ইরানি জনগণকে তাদের সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন, যা প্রকারান্তরে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দিকেই ইঙ্গিত করে।

তবে তেহরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই হুমকির প্রভাব অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এক তরুণ শিক্ষিকা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, যদি ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে আধুনিক ইরান সত্যিই ট্রাম্পের ভাষায় পাথর যুগে ফিরে যাবে। এই উদ্বেগ কেবল ইরানের ভেতরেই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে, যারা এই সংঘাতের ফলে এক বিশাল মানবিক সংকটের আশঙ্কা করছে।

হরমুজ প্রণালী: বৈশ্বিক অর্থনীতির শ্বাসরোধ ও জ্বালানি সংকট

বর্তমান যুদ্ধের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী। ইরান এই জলপথটি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে এক নজিরবিহীন ধস নেমেছে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই অবরোধের ফলে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে এবং কোনো কোনো বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তা ১৯০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরল এই সংকটকে ১৯৭৩ সালের আরব তেল নিষেধাজ্ঞা, ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব এবং ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মিলিত সংকটের চেয়েও ভয়াবহ বলে অভিহিত করেছেন। হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং ১৪০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যাতায়াত করত, যা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

যুদ্ধের পূর্বের অবস্থায় (জানুয়ারি ২০২৬) ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬১ ডলার; বর্তমানে তা ১১৮ থেকে ১২৬ ডলারে উঠেছে। মার্কিন পেট্রোলের পাম্প মূল্য গ্যালনপ্রতি প্রায় ৩.০০ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৯৯ ডলারে। ডিজেলের গড় দাম ৪.০০ ডলার থেকে বেড়ে ৫.৪০ ডলার হয়েছে। প্রতিদিন যেখানে প্রায় ১৩৫টি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে এখন ট্যাঙ্কার চলাচল ৭০ শতাংশ কমে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। যুদ্ধকালীন বীমা প্রিমিয়াম গড়ে ৪ থেকে ৬ গুণ বেড়ে ০.১২৫ শতাংশ থেকে ০.৪ শতাংশের বেশি হয়েছে। আর এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক, যা আগে ঊর্ধ্বমুখী ছিল, এখন নিম্নমুখী সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রায় রয়েছে।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ফলে কেবল তেল নয়, মিথানল, অ্যালুমিনিয়াম, সালফার, গ্রাফাইট এবং সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহও চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ ইউরিয়া এবং ২০-৩০ শতাংশ অ্যামোনিয়া রপ্তানি করে থাকে, যা এখন আটকা পড়ে আছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর এক বিশাল হুমকি তৈরি হয়েছে। কাতার ইতিমধ্যেই গ্যাস সরবরাহে ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ ঘোষণা করেছে এবং কুয়েত তাদের তেল উৎপাদন নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিয়েছে, কারণ তেলের গুদামগুলো পূর্ণ হয়ে গেছে কিন্তু জাহাজ চলাচল করতে পারছে না। ইরাকের তেল উৎপাদন ৪ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৯০০ হাজার ব্যারেলে। এই অর্থনৈতিক স্থবিরতা বিশ্বকে এক দীর্ঘস্থায়ী মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

৩৯তম দিনের যুদ্ধক্ষেত্র: সামরিক অভিযানের স্বরূপ

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হয়েছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ওপর নজিরবিহীন বিমান হামলা চালায়। প্রথম কয়েক দিনেই ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং কমান্ড সেন্টারগুলো লক্ষ্য করে প্রায় ৯০০টি বিমান হামলা চালানো হয়। ৩৯ দিন পর আজ এই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু বেসামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর দিকে ঘুরে গেছে।

আজকের (৭ এপ্রিল) বিশেষ সামরিক ঘটনাবলির মধ্যে প্রথমটি হলো খার্গ দ্বীপে ভয়াবহ হামলা। ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই হামলার লক্ষ্য ছিল দ্বীপের সামরিক অবকাঠামো, বাংকার এবং রানওয়ে ধ্বংস করা। তবে হামলার ফলে দ্বীপের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত, সেতু ও রেল নেটওয়ার্কে আঘাত। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বীকার করেছেন যে তাদের বিমান বাহিনী ইরানের আটটি প্রধান সেতু এবং গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ ধ্বংস করেছে। ইসরাইলের দাবি অনুযায়ী এই সেতুগুলো অস্ত্র পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হতো। তেহরান, কারাজ, তাবরিজ এবং কোম শহরের সংযোগকারী এই সেতুগুলো ধ্বংস হওয়ায় ইরানের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

তৃতীয়ত, আবাসিক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি। আলবোরজ প্রদেশে মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় ১৮ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে। তেহরান প্রদেশের শাহরিয়ার শহরে একটি আবাসিক ভবনে প্রজেক্টাইল আঘাত হানলে ৯ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হন।

চতুর্থত, পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টে হামলা। ইসরাইল ইরানের বৃহত্তম পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স (যা সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডের সঙ্গে যুক্ত) এবং শিরাজ শহরের একটি নাইট্রিক অ্যাসিড উৎপাদনকারী প্লান্টে হামলা চালিয়েছে।

মার্কিন বিমানসেনার উদ্ধার অভিযান: একটি কৌশলগত বিজয়

গত ২ এপ্রিল ইরানের আকাশসীমায় একটি মার্কিন এফ-১৫ ই স্ট্রাইক ঈগল বিমান ভূপাতিত হয়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড দাবি করেছিল যে তারা একাধিক মার্কিন বিমান ধ্বংস করেছে এবং পাইলটদের বন্দী করেছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেস এক দুঃসাহসিক অভিযানের মাধ্যমে ভূপাতিত দুই বিমানসেনাকে উদ্ধার করেছে। এই উদ্ধার অভিযানে ১৫০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান অংশ নেয় এবং ইরানের ভেতরে একটি অস্থায়ী রানওয়ে তৈরি করা হয়। ৩৯ দিনের যুদ্ধে এটি মার্কিন সামরিক সক্ষমতার এক বড় প্রদর্শনী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যদিও ইরান এই দাবিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি: প্রতিরোধ, জাতীয়তাবাদ ও ‘মানব ঢাল’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রবল আক্রমণের মুখে ইরানের সাধারণ মানুষ এবং সরকার এক অভূতপূর্ব ঐক্যের ডাক দিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দাবি করেছেন যে দেশের ১৪ মিলিয়ন নাগরিক স্বেচ্ছায় যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করার জন্য নাম নিবন্ধন করেছেন।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মানব ঢাল গঠন করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছেন, তখন ইরানের বিপ্লবী গার্ড এবং সরকার দেশের তরুণ সমাজ, ছাত্র ও অ্যাথলেটদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর চারপাশে ‘মানব ঢাল’ তৈরি করে। তেহরান ও কারাজের প্রধান বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সামনে শত শত মানুষ হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আহভাজ শহরের ঐতিহাসিক ‘হোয়াইট ব্রিজ’-এর ওপর বিশাল মানব শৃঙ্খল তৈরি করা হয়েছে। মুম্বাই ও আর্মেনিয়ায় বিদেশের ইরানি দূতাবাসগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসীরাও এই প্রতীকী প্রতিরোধের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছে।

ইরানি নাগরিকদের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে ট্রাম্পের হুমকি কেবল ভয়ই সৃষ্টি করেনি, বরং এটি ইরানিদের মধ্যে এক তীব্র মার্কিন-বিরোধী জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা তৈরি করেছে। তবে সমালোচকদের মতে, বেসামরিক মানুষকে সামরিক নিশানার সামনে দাঁড় করানো একটি ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল, যা প্রাণহানি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিচার বিভাগ ও অভ্যন্তরীণ কঠোরতা

যুদ্ধের ডামাডোলে ইরানের ভেতরে কোনো ধরনের ভিন্নমত বা নাশকতা দমন করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিচার বিভাগ। বিচার বিভাগীয় প্রধান গোলাম হোসেন মোহসেনি এজি বিচারকদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত বা বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, গত কয়েক সপ্তাহে ইরানে রাজনৈতিক বন্দীদের ফাঁসি দেওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

নেতৃত্বের পরিবর্তন ও ক্ষমতার বিবর্তন

যুদ্ধের শুরুতেই (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ায় ইরানের ক্ষমতা কাঠামোতে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তার পুত্র মোজতাবা খামেনি। মোজতাবার এই নিয়োগকে অনেকে ‘পারিবারিক শাসন’ হিসেবে সমালোচনা করলেও বর্তমান সংকটে বিপ্লবী গার্ড তাকেই পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে।

ক্ষমতার এই পরিবর্তনের ফলে ইরানের নীতি আরও কট্টর হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়ে এখন আইআরজিসি-র জেনারেলরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। তুলনামূলক মধ্যপন্থী এবং ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির স্থপতি আলী লারিজনি ১৭ মার্চ নিহত হওয়ায় আলোচনার পথ আরও সংকুচিত হয়ে গেছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের আক্রমণ বন্ধ করছে, ততক্ষণ তারা কোনোভাবেই হরমুজ প্রণালী খুলে দেবেন না।

কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব

৭ এপ্রিলের চূড়ান্ত সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান এবং চীনের মধ্যস্থতায় শেষ মুহূর্তের একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হয়। ইরান পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি ‘১০ দফা শান্তি প্রস্তাব’ পাঠায়।

এই প্রস্তাবের মূল শর্তাবলি ছিল: যুদ্ধের স্থায়ী অবসান—কোনো সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি; ইরানকে ভবিষ্যতে আর আক্রমণ করা হবে না—এই গ্যারান্টি; ইরানের ওপর আরোপিত সকল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া; হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলি হামলা অবিলম্বে বন্ধ করা; হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা, তবে প্রতি জাহাজে ২ মিলিয়ন ডলার ট্রানজিট ফি; এই ফির আয়ের একটি অংশ ওমানকে প্রদান করা; ট্রানজিট ফির মাধ্যমে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা; হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা; প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অ-আক্রমণ চুক্তি; এবং যুদ্ধকালীন বন্দিদের মুক্তি প্রদান।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই প্রস্তাবকে ‘একটি বড় পদক্ষেপ’ বললেও শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, ইরানের এই দাবিগুলো ‘বাস্তবসম্মত নয়’ এবং ‘যথেষ্ট ভালো নয়’। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান নিঃশর্তভাবে প্রণালী খুলে দিক এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করুক। অন্যদিকে, চীন ও পাকিস্তান একটি ‘৫ দফা উদ্যোগ’ পেশ করেছে যা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির ওপর জোর দেয়, কিন্তু ওয়াশিংটন তাতে কর্ণপাত করছে না।

আঞ্চলিক প্রসারণ: লেবানন ও লোহিত সাগরের ফ্রন্ট

এই যুদ্ধ কেবল ইরানের ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের প্রক্সি বাহিনীগুলো—বিশেষ করে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিরা—একযোগে আক্রমণ শুরু করেছে।

ইসরাইল গত ২ মার্চ থেকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে স্থল অভিযান শুরু করেছে। হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধে লেবাননের পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়: ১.২ মিলিয়ন মানুষ (লেবাননের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ) বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছেন; অন্তত ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩৫০ জন শিশু রয়েছে। হিজবুল্লাহ দাবি করেছে যে তারা প্রথমবারের মতো ইসরাইলি যুদ্ধজাহাজে অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর মতে, হিজবুল্লাহ প্রতিদিন গড়ে ২০০টি রকেট ও ড্রোন নিক্ষেপ করার সক্ষমতা আরও ৫ মাস বজায় রাখতে পারবে।

লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালী নিয়েও হুমকি এসেছে। ইরান হুথিদের মাধ্যমে জানিয়েছে যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস করে, তবে তারা লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব এল-মান্দেব প্রণালীও বন্ধ করে দেবে। এটি ঘটলে বিশ্ব বাণিজ্য কার্যত অচল হয়ে যাবে, কারণ হরমুজ ও সুয়েজ খাল—উভয় পথই তখন রুদ্ধ থাকবে।

জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া: একটি বিভক্ত বিশ্ব

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই সংকট নিরসনে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। বাহরাইনের সভাপতিত্বে নিরাপত্তা পরিষদে গত ১১ মার্চ একটি রেজোলিউশন (২৮১৭) পাস হয়েছিল, যেখানে ইরানের হামলার নিন্দা জানানো হয়। এই প্রস্তাবের পক্ষে ১৩টি ভোট পড়লেও রাশিয়া ও চীন ভোটদানে বিরত ছিল।

বর্তমান অচলাবস্থার চিত্রটি স্পষ্ট: ৭ এপ্রিল রাশিয়া ও চীন হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য আনা মার্কিন সমর্থিত একটি রেজোলিউশনে ভেটো প্রদান করেছে। তাদের মতে, এই রেজোলিউশন ভারসাম্যহীন এবং এটি ইরানের ওপর মার্কিন হামলাকে বৈধতা দিচ্ছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদেশনীতি প্রধান কাজা ক্যালাস ইরানের ‘পে-টু-পাস’ (টাকা দিয়ে যাতায়াত) পদ্ধতি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন যে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী একটি টোলমুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ।

যুদ্ধের ফলে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারতীয় সামুদ্রিক খাদ্য রপ্তানিকারকরা প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পাকিস্তান তার অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে গণপরিবহন ব্যবস্থা বিনামূল্যে করে দিতে বাধ্য হয়েছে।

গভীরতর ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

প্রথমত, বেসামরিক অবকাঠামো বনাম সামরিক লক্ষ্যবস্তু — প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকির ফলে সামরিক কৌশলে এক ভয়ংকর বিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রচলিত যুদ্ধে সাধারণত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়, কিন্তু ট্রাম্পের ‘সভ্যতা ধ্বংসের’ পরিকল্পনা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সেতুর মতো বেসামরিক লাইফলাইনকে প্রধান নিশানায় পরিণত করেছে। এটি কেবল যুদ্ধের আইন বা জেনেভা কনভেনশনকেই চ্যালেঞ্জ করছে না, বরং আধুনিক নগর সভ্যতার ওপর এক ধরনের সন্ত্রাসবাদী চাপ সৃষ্টি করছে। যদি সত্যিই আজ রাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা হয়, তবে ৮ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন এক মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে, যার প্রভাব কয়েক প্রজন্ম ধরে বজায় থাকবে।

দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সাম্রাজ্যবাদ ও নতুন বাণিজ্যিক মডেল — ইরানের প্রস্তাবিত ২ মিলিয়ন ডলার ট্রানজিট ফি বিশ্ব বাণিজ্যের এক নতুন এবং বিপজ্জনক মডেলের ইঙ্গিত দেয়। যদি একটি রাষ্ট্র ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক জলপথে কর বসাতে সফল হয়, তবে মালাক্কা প্রণালী বা জিব্রাল্টার প্রণালীর মতো অন্যান্য চোকপয়েন্টগুলোতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। ট্রাম্পের মতে এটি এক ধরনের ‘গাঁশার’ বা ভাগ্যের চাকা যা যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, কিন্তু এটি আসলে মুক্ত বাণিজ্যের ধারণাকে কবর দেওয়ার শামিল।

তৃতীয়ত, লাভ ও ক্ষতির অসম বণ্টন — অদ্ভুতভাবে এই যুদ্ধ কিছু রাষ্ট্রের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। তেলের দাম বাড়ায় রাশিয়ার অর্থনীতি এক নতুন প্রাণশক্তি পেয়েছে এবং মার্কিন তেল ও গ্যাস খাত যুদ্ধের ফলে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের পথে রয়েছে। পক্ষান্তরে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো—যেমন ভারত, পাকিস্তান বা ইউরোপের দেশগুলো—ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি ও মন্দার শিকার হচ্ছে। এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অসম মেরুকরণ তৈরি করছে।

চতুর্থত, মনস্তাত্ত্বিক ঘেরাও কৌশল — ইরান, হিজবুল্লাহ এবং হুথিরা মিলে ৬ এপ্রিল যে সমন্বিত হামলা চালিয়েছে, তা ইসরাইলি নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের ‘চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে যাওয়ার’ আতঙ্ক তৈরি করার জন্য নকশা করা হয়েছে। যদিও এই হামলার সামরিক ক্ষয়ক্ষতি সীমিত, কিন্তু একসঙ্গে একাধিক ফ্রন্ট থেকে মিসাইল আসার বিষয়টি ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং সাধারণ মানুষের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে।

প্রলয়ের প্রতীক্ষা

২০২৬ সালের ৭ এপ্রিলের এই শেষ মুহূর্তগুলো এক চরম অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউস থেকে তেহরানের রাজপথ—সবই এখন স্তব্ধ হয়ে আছে রাত ৮টার (ইএসটি) মহাপ্রলয়ের অপেক্ষায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার আল্টিমেটামে অনড়, অন্যদিকে ইরান তার ‘মানব ঢাল’ এবং ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার নিয়ে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিচার করলে, এই যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের সংঘাত নয়, এটি আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার এক নগ্ন দলিল। জাতিসংঘের নিষ্ক্রিয়তা, শক্তিশালী দেশগুলোর ভেটো যুদ্ধ এবং একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বিশ্বকে ১৯৩০-এর দশকের মতো একটি অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে। আজ রাতে যদি সত্যিই ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সেতুগুলো ধূলিসাৎ হয়, তবে কেবল একটি সভ্যতাই নয়, বরং মানবতা ও আন্তর্জাতিক আইনের অবশিষ্ট গৌরবও বিলুপ্ত হবে।

ইতিহাস হয়তো এই ৩৯তম দিনটিকে মনে রাখবে একটি সভ্যতার অন্তিম শয়ান হিসেবে, অথবা হয়তো শেষ মুহূর্তের কোনো ‘বিপ্লবী বিস্ময়’ পৃথিবীকে রক্ষা করবে এক মহাপ্রলয় থেকে। তবে যেভাবেই আজ রাতের অবসান ঘটুক না কেন, মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। বারুদের ধোঁয়া আর তেলের আগুনের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে বহু দশকের শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বপ্ন।

আন্তর্জাতিক এর আরও খবর

img

ইরান যুদ্ধ : যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ

প্রকাশিত :  ১০:২৭, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং এর প্রভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি গ্যাস ও পেট্রোলজাত গ্যাসোলিনের দাম বেড়েছে। বর্তমানে দেশটিতে প্রতি গ্যালন (৩ দশমিক ৭৮ লিটার) গ্যাস-গ্যাসোলিনের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৮ ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস-গ্যাসোলিনের এই দাম গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে দেশটিতে গ্যাসের দাম ৪ ডলারের বেশি উঠেছিল ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর। সেবার প্রতি গ্যালন গ্যাস বিক্রি হয়েছিল ৪ দশমিক ১৫ ডলারে।

এক বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাস-গ্যাসোলিন বিক্রি হয়েছে ৩ দশমকি ১৫ ডলারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যে অবশ্য গ্যাসের দাম সমান নয়। যেসব রাজ্যে তেল কিংবা গ্যাসের খনি আছে, যেমন টেক্সাস— সেসব রাজ্যে প্রতি গ্যালন গ্যাস বা গ্যাসোলিনের দাম প্রতি গ্যালন ৩ দশমিক ৭৮ ডলার। আবার যেসব রাজ্যে খনি নেই— যেমন ক্যালিফোর্নিয়া— সেসব রাজ্যে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিন ৫ দশমিক ৯৬ ডলারেও বিক্রি হচ্ছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের জেরে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ জারি করেছে ইরান। বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ জ্বালানি পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।

যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত; কিন্তু ইরানি অবরোধের জেরে বর্তমানে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করছে গড়ে ৮ থেকে ১০টি জাহাজ।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান, গাল্ফ নিউজ

আন্তর্জাতিক এর আরও খবর