img

ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়লো আরও ৩ সপ্তাহ

প্রকাশিত :  ০৬:০২, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়লো আরও ৩ সপ্তাহ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বলে ঘোষণা দিয়েছেন যে, ইসরায়েল এবং লেবানন তাদের মধ্যকার চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও তিন সপ্তাহ বাড়াতে সম্মত হয়েছে। 

আজ বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) হোয়াইট হাউসে দুই দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে এক বৈঠকের পর ট্রাম্প এই তথ্য জানান। 

তিনি বলেন, ইসরায়েলি ও লেবাননি প্রতিনিধিদের মধ্যকার এই আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে ওয়াশিংটনে সরাসরি বৈঠকে বসার আশা করছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক প্রতিবেদনে এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতির বিস্তারিত জানানো হয়েছে।

হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এই বৈঠকে ট্রাম্পের সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের এক পর্যায়ে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হলেও শান্তি প্রতিষ্ঠায় এই সংলাপ একটি বড় পদক্ষেপ। 

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আক্রান্ত হলে ইসরায়েলের নিজেকে রক্ষা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদে মোয়াদ এই উদ্যোগের জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার বিখ্যাত স্লোগানের আদলে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় লেবাননকে আবারও মহান করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে এটিই কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম কোনো সরাসরি কূটনৈতিক সংলাপ।

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন জানিয়েছেন, এই বর্ধিত যুদ্ধবিরতির লক্ষ্য হলো ইসরায়েলি আক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ করা এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করা।

এ ছাড়া ইসরায়েলে বন্দি লেবাননিদের মুক্তি এবং সীমান্তে লেবাননি সেনা মোতায়েনসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করার ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন। তবে হিজবুল্লাহ এই আলোচনার তীব্র বিরোধিতা করছে এবং গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক পরিষদের উচ্চপদস্থ সদস্য ওয়াফিক সাফা জানিয়েছেন, তারা এই সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে হওয়া কোনো চুক্তি মেনে নেবে না। গত ২ মার্চ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে লেবাননে এ পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুদিন পর হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা চালায়। এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননে ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযান শুরু করে এবং বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতরে একটি বাফার জোন তৈরি করে অবস্থান করছে। 

ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডন সার দাবি করেছেন, হিজবুল্লাহই দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী শান্তি ও স্বাভাবিক সম্পর্কের পথে একমাত্র বাধা। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও বুধবার দক্ষিণ লেবাননে আমাল খলিল নামে এক প্রখ্যাত লেবাননি সাংবাদিক ইসরায়েলি হামলায় নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই উত্তেজনার মধ্যেই আগামী তিন সপ্তাহের এই অতিরিক্ত সময় দুই দেশের জন্য একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সূত্র: এনডিটিভি

আন্তর্জাতিক এর আরও খবর

আলজাজিরার প্রতিবেদন

img

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুরক্ষায় আস্থার সংকট, ‘নতুন বলয়’ গড়ে তুলছে জাপান

প্রকাশিত :  ১২:০৩, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুরক্ষার ওপর আস্থা কমে যাওয়ায় নতুন করে বলয় গড়ে তুলছে জাপান। দেশটি তাদের দক্ষিণাঞ্চলের সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাচ্ছে। এজন্য সুদুরপ্রসারি পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে। এমনকি উল্লেখযোগ্যহারে সামরিক ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপ আগ্নেয়গিরিময় প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং টনকাতসু রামেনের জন্য পরিচিত। কিন্তু এই জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রই এখন ১৯৪৭ সালের পর জাপানের প্রতিরক্ষা কৌশলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ওই বছরে জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক বিরোধ মেটানোর উপায় হিসেবে ত্যাগ করেছিল।

চলতি বছরের মার্চের শেষদিকে জাপান কুমামোটো প্রিফেকচারের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে। আগের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তুলনায় এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো চীনে আঘাত হানতে সক্ষম। ২০১৯ সাল থেকে জাপান চীনকে তার সবচেয়ে বড় জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে। এমনকি উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার থেকেও বেশি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাপান এখন সবচেয়ে জটিল ও কঠিন নিরাপত্তা পরিবেশের মুখোমুখি। আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা মবাড়াতে হবে।

আলজাজিরা জানিয়েছে, ‘সাউদার্ন শিল্ড’ নামে পরিচিত এই নতুন প্রতিরক্ষা কৌশলে জাপান সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সেস (জেএসডিএফ) দক্ষিণ জাপান ও তার দক্ষিণ-পশ্চিম দ্বীপগুলোতে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং বিমান শক্তি মোতায়েন করছে।

টোকিওর ইনস্টিটিউট অব জিওইকোনমিক্সের পরিচালক কাজুতো সুজুকি বলেন, পরিস্থিতির ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। প্রতিরক্ষা কৌশল পুরোপুরি দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী হয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের গুরুত্ব কমে গেছে।

২০২৬ অর্থবছরে জাপানের প্রতিরক্ষা বাজেট রেকর্ড ৫৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর বড় অংশই এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে ব্যয় হচ্ছে। এই কৌশলের মূল ফোকাস নানসেই বা রিউকিউ দ্বীপমালায় রাখা হয়েছে। এ অঞ্চলটি কিউশু থেকে তাইওয়ানের ১০০ কিলোমিটারের মধ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দ্বীপগুলো পূর্ব চীন সাগর ও ফিলিপাইন সাগরের মাঝে একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দেয়াল গড়ে তুলেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর লক্ষ্য চীনের সামরিক বাহিনীকে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ থেকে বাধা দেওয়া।

আলজাজিরা জানিয়েছে, এই কৌশলের সূচনা শীতল যুদ্ধের সময় হয়েছিল। টোকিও এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালি নিয়ে জাপানের ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জনাথন পিং জানান, এই ‘সাউদার্ন শিল্ড’ কৌশলের লক্ষ্য হলো প্রবেশ-বাধা বা এলাকা-নিয়ন্ত্রণ স্তর তৈরি করা। ফলে চীন তাইওয়ান বা পূর্ব চীন সাগরের কাছে সামরিক অভিযান চালাতে গেলে তা তাদের জন্য জটিল হয়ে পড়বে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের দখলদারিত্বের সময়ে জাপানের সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার প্রেক্ষাপটে জেএসডিএফ গড়ে ওঠে। শুরুতে এটি মূলত পুলিশ বাহিনীর সম্প্রসারণ ছিল এবং সদস্যদের ‘বিশেষ সরকারি কর্মচারী’ হিসেবে গণ্য করা হতো। শীতল যুদ্ধের সময় পর্যন্ত তারা মূলত মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কাজ করত। তবে গালফ যুদ্ধের সময় জাপান যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক সহায়তা দিতে না পারায় দেশটির রাজনৈতিক নেতারা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। এরপর থেকেই জেএসডিএফের ভূমিকা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে।

গত এক দশকে জাপান সরকার সংবিধান পরিবর্তন না করেই এর ব্যাখ্যা বদলে জেএসডিএফের ক্ষমতা বাড়িয়েছে। ২০১৪ সালের এক সিদ্ধান্তে বলা হয়, জাপান তার মিত্রদের ‘সম্মিলিত আত্মরক্ষা’র অংশ হিসেবে সহায়তা করতে পারে। ২০২২ সালে জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ‘প্রতিআক্রমণ সক্ষমতা’ যুক্ত করা হয়। এর অংশ হিসেবে জাপান ৪০০টি মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে, যা সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজ থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়।

আলজাাজিরা জানিয়েছে, জাপান শিগগিরই ২০২৬-২০৩০ সময়কালের জন্য নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করবে। এতে ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইরানের অভিজ্ঞতা থেকে ড্রোন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে শিক্ষা নেওয়া হবে। এছাড়া জাপান সম্প্রতি প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে এবং নিজস্ব ড্রোন শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।

২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, জাপানের ৭৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক সংকটে জাপানকে রক্ষা করবে না। এই কারণে জাপান এখন ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর