img

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী অস্ত্রভাণ্ডারের মজুত সংকটে

প্রকাশিত :  ০৬:২২, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী অস্ত্রভাণ্ডারের মজুত সংকটে

চলমান ইরান যুদ্ধের ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বৈশ্বিক গোলাবারুদের মজুত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। 

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভাণ্ডারের একটি বিশাল অংশ এই যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে, যা পেন্টাগনকে তাদের এশিয়া ও ইউরোপীয় কমান্ডের সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাতে বাধ্য করছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই পরিস্থিতির ফলে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করা ওয়াশিংটনের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদিও হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট ব্যয় সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব দেননি, তবে দুটি স্বাধীন গবেষণা সংস্থা দাবি করেছে যে যুদ্ধের খরচ ২৮ বিলিয়ন থেকে ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে পৌঁছেছে। 

এই হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের নিচে ব্যয় করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের এই বিশাল ব্যয় এবং সরঞ্জামের ঘাটতি মার্কিন প্রশাসনের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশেষ করে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদে সক্ষম প্রিসিশন-স্ট্রাইক মিসাইল, এটিএসিএমএস গ্রাউন্ড-ভিত্তিক মিসাইল এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যয়বহুল সমরাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

এই ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলোর উৎপাদন প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী হওয়ায় স্বল্প সময়ে এই শূন্যতা পূরণ করা কঠিন বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে গিয়ে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গোলাবারুদের এই ঘাটতি কেবল যুদ্ধের ময়দানেই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। এশিয়া ও ইউরোপ থেকে সরঞ্জাম সরিয়ে আনার ফলে ওই অঞ্চলগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

পেন্টাগন বর্তমানে এই ঘাটতি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা উৎপাদন শিল্পকে আরও গতিশীল করার চেষ্টা করছে, তবে বর্তমান চাহিদার তুলনায় তা কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। পুরো বিশ্ব এখন নজরে রাখছে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের এই সামরিক ও আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠে।

সূত্র: দ্য মিডল ইস্ট আই


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর

আলজাজিরার প্রতিবেদন

img

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুরক্ষায় আস্থার সংকট, ‘নতুন বলয়’ গড়ে তুলছে জাপান

প্রকাশিত :  ১২:০৩, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুরক্ষার ওপর আস্থা কমে যাওয়ায় নতুন করে বলয় গড়ে তুলছে জাপান। দেশটি তাদের দক্ষিণাঞ্চলের সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাচ্ছে। এজন্য সুদুরপ্রসারি পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে। এমনকি উল্লেখযোগ্যহারে সামরিক ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপ আগ্নেয়গিরিময় প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং টনকাতসু রামেনের জন্য পরিচিত। কিন্তু এই জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রই এখন ১৯৪৭ সালের পর জাপানের প্রতিরক্ষা কৌশলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ওই বছরে জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক বিরোধ মেটানোর উপায় হিসেবে ত্যাগ করেছিল।

চলতি বছরের মার্চের শেষদিকে জাপান কুমামোটো প্রিফেকচারের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে। আগের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তুলনায় এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো চীনে আঘাত হানতে সক্ষম। ২০১৯ সাল থেকে জাপান চীনকে তার সবচেয়ে বড় জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে। এমনকি উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার থেকেও বেশি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাপান এখন সবচেয়ে জটিল ও কঠিন নিরাপত্তা পরিবেশের মুখোমুখি। আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা মবাড়াতে হবে।

আলজাজিরা জানিয়েছে, ‘সাউদার্ন শিল্ড’ নামে পরিচিত এই নতুন প্রতিরক্ষা কৌশলে জাপান সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সেস (জেএসডিএফ) দক্ষিণ জাপান ও তার দক্ষিণ-পশ্চিম দ্বীপগুলোতে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং বিমান শক্তি মোতায়েন করছে।

টোকিওর ইনস্টিটিউট অব জিওইকোনমিক্সের পরিচালক কাজুতো সুজুকি বলেন, পরিস্থিতির ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। প্রতিরক্ষা কৌশল পুরোপুরি দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী হয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের গুরুত্ব কমে গেছে।

২০২৬ অর্থবছরে জাপানের প্রতিরক্ষা বাজেট রেকর্ড ৫৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর বড় অংশই এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে ব্যয় হচ্ছে। এই কৌশলের মূল ফোকাস নানসেই বা রিউকিউ দ্বীপমালায় রাখা হয়েছে। এ অঞ্চলটি কিউশু থেকে তাইওয়ানের ১০০ কিলোমিটারের মধ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দ্বীপগুলো পূর্ব চীন সাগর ও ফিলিপাইন সাগরের মাঝে একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দেয়াল গড়ে তুলেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর লক্ষ্য চীনের সামরিক বাহিনীকে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ থেকে বাধা দেওয়া।

আলজাজিরা জানিয়েছে, এই কৌশলের সূচনা শীতল যুদ্ধের সময় হয়েছিল। টোকিও এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালি নিয়ে জাপানের ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জনাথন পিং জানান, এই ‘সাউদার্ন শিল্ড’ কৌশলের লক্ষ্য হলো প্রবেশ-বাধা বা এলাকা-নিয়ন্ত্রণ স্তর তৈরি করা। ফলে চীন তাইওয়ান বা পূর্ব চীন সাগরের কাছে সামরিক অভিযান চালাতে গেলে তা তাদের জন্য জটিল হয়ে পড়বে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের দখলদারিত্বের সময়ে জাপানের সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার প্রেক্ষাপটে জেএসডিএফ গড়ে ওঠে। শুরুতে এটি মূলত পুলিশ বাহিনীর সম্প্রসারণ ছিল এবং সদস্যদের ‘বিশেষ সরকারি কর্মচারী’ হিসেবে গণ্য করা হতো। শীতল যুদ্ধের সময় পর্যন্ত তারা মূলত মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কাজ করত। তবে গালফ যুদ্ধের সময় জাপান যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক সহায়তা দিতে না পারায় দেশটির রাজনৈতিক নেতারা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। এরপর থেকেই জেএসডিএফের ভূমিকা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে।

গত এক দশকে জাপান সরকার সংবিধান পরিবর্তন না করেই এর ব্যাখ্যা বদলে জেএসডিএফের ক্ষমতা বাড়িয়েছে। ২০১৪ সালের এক সিদ্ধান্তে বলা হয়, জাপান তার মিত্রদের ‘সম্মিলিত আত্মরক্ষা’র অংশ হিসেবে সহায়তা করতে পারে। ২০২২ সালে জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ‘প্রতিআক্রমণ সক্ষমতা’ যুক্ত করা হয়। এর অংশ হিসেবে জাপান ৪০০টি মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে, যা সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজ থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়।

আলজাাজিরা জানিয়েছে, জাপান শিগগিরই ২০২৬-২০৩০ সময়কালের জন্য নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করবে। এতে ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইরানের অভিজ্ঞতা থেকে ড্রোন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে শিক্ষা নেওয়া হবে। এছাড়া জাপান সম্প্রতি প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে এবং নিজস্ব ড্রোন শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।

২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, জাপানের ৭৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক সংকটে জাপানকে রক্ষা করবে না। এই কারণে জাপান এখন ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর