img

কমলগঞ্জে চুরির অপবাদে যুবককে বেঁধে নির্যাতন: ভাইরাল ভিডিওতে ক্ষোভ, ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো

প্রকাশিত :  ০৯:১৪, ০৬ মে ২০২৬

কমলগঞ্জে চুরির অপবাদে যুবককে বেঁধে নির্যাতন: ভাইরাল ভিডিওতে ক্ষোভ, ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় চুরির অপবাদ তুলে এক যুবককে হাত-পা বেঁধে লোহার রডের সঙ্গে আটকে রেখে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চালানো এই সহিংসতার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে গত ১ মে, শুক্রবার সন্ধ্যা প্রায় ৭টার দিকে, পতনঊষার ইউনিয়নের শহীদনগর বাজারের রয়েল ওয়ার্কশপে।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীর পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পতনঊষার গ্রামের বাসিন্দা মিছবাউর রহমানের ছেলে ইমদাদুল হক ইমন (২৮), পেশায় সিএনজি-অটোরিকশা চালক। সম্প্রতি তিনি ওই ওয়ার্কশপে গেলে মালিকপক্ষের সাড়ে ৭ হাজার টাকা চুরির অভিযোগে তাকে আটকে রাখা হয়। অভিযোগ, সন্ধ্যার পর ওয়ার্কশপের কয়েকজন কর্মচারীসহ ৪–৫ জন তাকে বাজার থেকে ধরে নিয়ে যায়।

এরপর ইমনকে হাত-পা বেঁধে লোহার রডের সঙ্গে আটকে মাটিতে ফেলে রাখা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্লাস্টিকের কেবল দিয়ে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের একপর্যায়ে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় এবং ৪ হাজার ২০০ টাকা নিয়ে নেওয়া হয়।

ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় ইউপি সদস্য তোয়াবুর রহমান ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় ইমনকে কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন।

ভুক্তভোগীর ভাই খালেদুর রহমান বলেন, “আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। তাকে অবৈধ কাজে যুক্ত করতে না পেরে মিথ্যা অভিযোগ তুলে নির্যাতন করা হয়েছে। উদ্ধার করতে গেলে আমাকেও মারধর করা হয় এবং জোর করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।”

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত জয়নাল মিয়া বলেন, “ইমদাদুল হক একজন পরিচিত চোর। অনেকেই তাকে মারধর করেছে। আমি সামান্য আঘাত করেছি।” তিনি আরও দাবি করেন, আসন্ন বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় তাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করতে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে।

ইউপি সদস্য তোয়াবুর রহমান বলেন, “পরিবারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে হাত বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করি। তখন পুরো ঘটনা জানা যায়নি, পরে শুনেছি কিছু টাকা লেনদেনের বিষয়ও ছিল।”

পতনঊষার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অলি আহমদ খান জানান, উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে উভয় পক্ষকে ডেকে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। “শিগগিরই বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে,” বলেন তিনি।

কমলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল আউয়াল গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। এখনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি, তবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান ঘটনাটিকে “নিন্দনীয় ও অমানবিক” উল্লেখ করে বলেন, “এ ধরনের ঘটনার কোনো স্থান নেই। প্রয়োজন হলে ভুক্তভোগীদের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।”

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মানবাধিকার সচেতন মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

ঐতিহ্য আর স্থাপত্যের মেলবন্ধন: কেরামত আলী জামে মসজিদে গর্বিত কমলগঞ্জ

প্রকাশিত :  ০৯:২৩, ০৬ মে ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলা শহরের ভানুগাছ বাজারে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এক মহিমান্বিত স্থাপনা—আলহাজ কেরামত আলী জামে মসজিদ। এটি এখন আর কেবল একটি উপাসনালয় নয়; বরং এ অঞ্চলের ইতিহাস, নান্দনিকতা ও ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

১৯৬৭ সালের ১২ ডিসেম্বর মোগল স্থাপত্যশৈলীর আদলে নির্মিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব মো. কেরামত আলী—যিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও দানবীর। তাঁর উদ্যোগেই গড়ে ওঠা এই মসজিদ আজও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও অবদানের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও কেরামত আলীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৪ সালের পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কৃষক শ্রমিক পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং এমএলএ হিসেবে নির্বাচিত হন। তবে একই বছরের ২৪ অক্টোবর, যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মাথায় তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে সরকার বাতিল করে দেয়। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জন নেতাকর্মীর সঙ্গে কেরামত আলীকেও গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালের ৬ জুন তিনি মুক্তি লাভ করেন।

পরবর্তী সময়ে আইয়ুব খান গঠিত কনভেনশন মুসলিম লীগ থেকে মনোনয়ন নিয়ে ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে সিলেট-৩ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক দায়িত্বের পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নয়নে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যার প্রতিফলন এই মসজিদ।

প্রথম দেখাতেই মসজিদের স্থাপত্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। মাঝখানে বৃহৎ একটি গম্বুজ এবং দুপাশে দুটি ছোট গম্বুজের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে দৃষ্টিনন্দন কাঠামো। গম্বুজ ও দেয়ালের অলঙ্করণে ফুটে উঠেছে ইসলামী জ্যামিতিক নকশা, যার সঙ্গে ইরানি ও উপমহাদেশীয় স্থাপত্যশৈলীর মেলবন্ধন স্পষ্ট। নির্মাণে ব্যবহৃত ইরান থেকে আনা পাথর মসজিদটিকে দিয়েছে আলাদা আভিজাত্য। চার কোণায় সুউচ্চ মিনার, টেরাকোটা ও মার্বেলের কারুকাজে স্থাপনাটির সৌন্দর্য আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।

মসজিদের ভেতরে রয়েছে প্রশস্ত নামাজঘর, যেখানে মার্বেল পাথর ও মোজাইক টাইলসের নিপুণ ব্যবহার চোখে পড়ে। দেয়ালে খচিত কোরআনের আয়াত ও নান্দনিক অলঙ্করণ আধ্যাত্মিক আবহকে আরও গভীর করে তোলে। প্যান্ডেল আকৃতির ছাদ ভেতরের পরিবেশকে রাখে শীতল ও আরামদায়ক, যা মুসল্লিদের জন্য প্রশান্তির অনুভূতি এনে দেয়।

মসজিদসংলগ্ন রয়েছে বড় একটি পুকুর, সুশৃঙ্খল ঘাট, আধুনিক অজুখানা এবং ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য আবাসন সুবিধা। প্রায় এক হাজার মুসল্লি একসঙ্গে এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। জুমা ও বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে দূরদূরান্ত থেকে মানুষের সমাগম ঘটে।

স্থানীয় মুসল্লি গোলাম কিবরিয়া শফি বলেন, “এই মসজিদের পরিবেশ ও স্থাপত্য আমাদের গর্বিত করে।” তিনি মনে করেন, সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা গেলে এর ঐতিহ্য আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।

কমলগঞ্জ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও নিয়মিত মুসল্লি গোলাম মুগ্নি মোহিত কামাল মিয়া জানান, “মসজিদের ভেতরের পরিবেশ এমন যে প্রচণ্ড গরমেও শীতলতা অনুভূত হয়।”

অন্যদিকে নিয়মিত মুসল্লি মো. সোলাইমান উদ্দিন বলেন, “প্রতিদিন এখানে নামাজ আদায় করতে এসে আমরা গর্ববোধ করি। তবে জুমার দিনে জায়গা সংকট দেখা দেয়—মসজিদটি সম্প্রসারণ করা জরুরি।”

১৯৬৯ সালের ৩ নভেম্বর আলহাজ্ব মো. কেরামত আলী মৃত্যুবরণ করেন। ৬ নভেম্বর তাঁর প্রতিষ্ঠিত সফাত আলী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণের হিফজখানার পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও এই অঞ্চলের মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত।

স্থানীয়দের মতে, কেরামত আলী জামে মসজিদ এখন শুধু কমলগঞ্জ নয়, পুরো মৌলভীবাজার জেলার একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি ঘিরে গড়ে উঠতে পারে একটি ইসলামিক হেরিটেজ কেন্দ্র—যা ভবিষ্যতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর একটি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে।


সিলেটের খবর এর আরও খবর