img

উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টি: উত্তরাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা

প্রকাশিত :  ০৫:৪৮, ৩০ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:০৭, ৩০ জুন ২০২৬

উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টি: উত্তরাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা ভারী বৃষ্টির প্রভাবে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, জিঞ্জিরাম, অর্জুনডারাসহ জেলার ৩২টি নদনদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যে গতকাল সোমবার দুধকুমার নদের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিপৎসীমার ওপরে দুধকুমার নদের পানি কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গতকাল দুপুরের তথ্য অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে ৫৯ সেন্টিমিটার, তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ৭২ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৩৫ সেন্টিমিটার এবং নুনখাওয়া পয়েন্টে ৫১ সেন্টিমিটার বেড়েছে। দুধকুমার নদের পানি ৫৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় দুধকুমার নদের মুড়িয়ারহাট এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে এবং কিছু স্থানে বাঁধের ওপর দিয়ে পানি উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। এতে বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মালিয়ানী, তেলিয়ানীপাড়া, বড়মানী, মিয়াপাড়া, সেনপাড়া, পাটেশ্বরী, বোয়ালের ডারা, ধনিটারীসহ ২০ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে, নষ্ট হচ্ছে ক্ষেতে থাকা ফসল।

জেলা কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র জানান, সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত জেলায় ১৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণেই জেলার সব নদনদীর পানি বেড়েছে।

কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে মুড়িয়ারহাট এলাকায় দুধকুমার নদের পাড়ে প্রায় ৩০০ মিটার অংশে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ওই অংশ দিয়েই পানি ঢুকেছে। পানি বাড়তে থাকলে জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। নিচু স্থানটিতে জিও ব্যাগ ফেলে পানি ঠেকানোর চেষ্টা করা হবে। 

নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম খোদাদাদ হোসেন বলেন, বাঁধ ভাঙার বিষয়টি জানার পর পাউবোকে অবহিত করা হয়েছে। তারা ভাঙনকবলিত স্থান মেরামত শুরু করেছে। প্রশাসন সবসময় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

ভারতের আসাম ও অরুণাচল প্রদেশে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তার পানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত রোববার রাতে লালমনিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে তিস্তা ব্যারাজের ভাটির চারটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয় এবং ফসলি জমি তলিয়ে যায়। পরে সোমবার সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করে এবং বিকেলে বিপৎসীমার ১৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার রায় বলেন, উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তিস্তা তীরবর্তী বেশ কয়েকটি এলাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। 

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। জেলার পাঁচ উপজেলার জন্য ২২০ টন চাল এবং পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র গতকাল জানিয়েছে, পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে এবং কুড়িগ্রামের দুধকুমার অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া আগামী কয়েক দিনে হাওরাঞ্চল সিলেট, সুনামগঞ্জ, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার কয়েকটি নদনদীর পানিও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। আগামী ২ থেকে ৪ জুলাইয়ের মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া জেলায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবীর জানান, মঙ্গলবার থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে এবং এ বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে টানা তিন থেকে চার দিন। তিনি বলেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হলে বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে, যা উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।



বাংলাদেশ এর আরও খবর

img

বাংলাদেশে উগ্রবাদী শক্তির কোনো জায়গা নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

প্রকাশিত :  ১৮:০০, ০১ জুলাই ২০২৬

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের কোনো জায়গা নেই । এ ব্যাপারে বাংলাদেশের ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেছেন, এ ধরনের শক্তির বাংলাদেশে কোনো স্থান নেই। দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে তাদের কখনোই সুযোগ দেওয়া হবে না।

১০ বছর আগে রাজধানীর গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণে বুধবার এক অনুষ্ঠানে এ একথা বলেন তিনি। ঢাকায় ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রোর বাসভবনে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আদর্শিক বা অন্য কোনো কারণেই সন্ত্রাসবাদকে কখনো ন্যায্যতা দেওয়া যায় না। সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সর্বক্ষেত্রে মোকাবিলায় সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে কূটনৈতিক কোরের ডিন ও ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস. ওয়াই. রমাদান, ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত উপপ্রধান আলবার্ট সিয়া এবং বাংলাদেশ পুলিশের একজন প্রতিনিধি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

বাংলাদেশে ইতালি দূতাবাসের কনস্যুলার শাখার প্রধান লরা স্কেলা অনুষ্ঠানের সূচনা করেন এবং নিহতদের নাম পাঠ করেন। পরে তাদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। নিহতদের স্মরণে উপস্থিত সবাই এক মিনিট নীরবতাও পালন করেন।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত প্রায় পৌনে ৯টার দিকে রাজধানীর গুলশান-২ এলাকার হোলি আর্টিজান বেকারিতে আগ্নেয়াস্ত্র, চাপাতি ও গ্রেনেড নিয়ে ভয়াবহ হামলা চালায় পাঁচ জঙ্গি। হামলাকারীরা ছিলেন মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল এবং শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।

প্রায় ১২ ঘণ্টাব্যাপী জিম্মি সংকট চলাকালে হামলাকারীরা ২০ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন নয়জন ইতালীয় নাগরিক, সাতজন জাপানি নাগরিক, একজন ভারতীয় এবং তিনজন বাংলাদেশি।

জিম্মিদের উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতির সময় জঙ্গিদের ছোড়া বোমার বিস্ফোরণে নিহত হন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম এবং বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন খান।

পরদিন ভোরে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে। অভিযানে পাঁচ হামলাকারী নিহত হয় এবং ১৩ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

এ জঙ্গি হামলায় নিহতদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘দশ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু সেই রাতের ক্ষত এখনো আমাদের জাতীয় চেতনা থেকে মুছে যায়নি। ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলার ছায়া আজও আমাদের স্মৃতিতে রয়ে গেছে। এটি আমাদের জাতির ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়।’

নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘হামলাটি ছিল আশা, মানবতা এবং বিভিন্ন দেশের মানুষের অভিন্ন মূল্যবোধকে স্তব্ধ করে দেওয়ার অপচেষ্টা। বাংলাদেশি নাগরিক এবং ভারত, ইতালি, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। আজ আমরা তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। আমরা শুধু তাদের স্মৃতিকেই নয়, তাদের সাহস, দৃঢ়তা ও সংহতিকেও সম্মান জানাই।’

ওই হামলাকে মানবতার ওপর নির্মম আঘাত হিসেবে বর্ণনা করে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘এটি ছিল আমাদের প্রাণবন্ত, সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজে ভয়, ঘৃণা ও বিভাজন সৃষ্টি করার পরিকল্পিত চেষ্টা। কিন্তু এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির মুখেও বাংলাদেশ অসাধারণ দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছে।’

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনা জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সংহতি এবং অভিন্ন মূল্যবোধ রক্ষায় সম্মিলিত সতর্কতার গুরুত্ব আজও স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই দিনের বেদনাদায়ক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের অভিন্ন মূল্যবোধ রক্ষায় জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সংহতি ও সম্মিলিত সতর্কতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’

অনুষ্ঠানে ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো বলেন, ‘নৃশংস ওই সন্ত্রাসবাদ বাংলাদেশে থাকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর বড় রকমের প্রভাব ফেলেছিল। ওই সন্ত্রাসী হামলা ২৪ জন নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। যারা বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিলেন।’

তিনি এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন।


বাংলাদেশ এর আরও খবর