শ্রীমঙ্গলে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পালিত হলো শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়েছে শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিকেলে উপজেলার সবুজবাগ আবাসিক এলাকার ইসকন মন্দির এবং শহরের হবিগঞ্জ রোডে অবস্থিত শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের আখড়া থেকে পৃথক দুটি বর্ণাঢ্য রথযাত্রা বের করা হয়। এতে শত শত নারী, পুরুষ ও শিশুভক্ত অংশ নেন।
রথযাত্রা উপলক্ষে শ্রীমঙ্গল শহরের প্রধান সড়কগুলোতে মানুষের ঢল নামে। উপজেলার বিভিন্ন চা-বাগান, গ্রামাঞ্চল এবং আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা দর্শনার্থীরা সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে রথ টানার দৃশ্য উপভোগ করেন। অনেক ভক্ত প্রভু জগন্নাথ দেবের কাছে নিজেদের ও পরিবারের মঙ্গল এবং বিশ্বশান্তি কামনা করে প্রার্থনা করেন।
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও জনসাধারণের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। উপজেলা প্রশাসন ও পৌর প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ১৬ জুলাই এক গণবিজ্ঞপ্তিতে হবিগঞ্জ রোডের উভয় পাশে কোনো ধরনের অস্থায়ী দোকান বা স্থাপনা না বসানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে পুলিশ প্রশাসন রথযাত্রা উপলক্ষে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে জগন্নাথ দেব, তাঁর বড় ভাই বলরাম (বলভদ্র) ও বোন সুভদ্রা রথে চড়ে গুন্ডিচা মন্দিরে, যা ‘মাসির বাড়ি’ নামে পরিচিত, গমন করেন। সেখানে নয় দিন অবস্থানের পর উল্টোরথ বা ‘বাহুড়া যাত্রা’র মাধ্যমে তাঁরা শ্রীমন্দিরে ফিরে আসেন। এ বছরের উল্টোরথ নয় দিন পর অনুষ্ঠিত হবে।
রথযাত্রার মূল কেন্দ্র ভারতের ওডিশা রাজ্যের পুরী। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো ভক্ত সেখানে সমবেত হন। পুরীর আদলে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানেও, বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অধ্যুষিত এলাকায়, রথযাত্রা ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয়।
রথযাত্রার উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাস ও ধর্মীয় গ্রন্থে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। ব্রহ্ম, স্কন্দ ও পদ্ম পুরাণসহ বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে এ উৎসবের মাহাত্ম্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার লোকবিশ্বাসে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে কেন্দ্র করে একাধিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। একটি কাহিনিতে বলা হয়, ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীতে জগন্নাথ মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং দেবমূর্তি নির্মাণের দায়িত্ব পান বিশ্বকর্মা। শর্ত ছিল, নির্ধারিত সময়ের আগে কেউ মন্দিরের দরজা খুলতে পারবেন না। কিন্তু কৌতূহলবশত রাজা দরজা খুলে ফেললে বিশ্বকর্মা অন্তর্ধান করেন এবং জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার কাঠের বিগ্রহ অসমাপ্ত অবস্থায় থেকে যায়। পরবর্তীতে সেই বিগ্রহই পূজিত হতে থাকে। এসব বর্ণনা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস ও লোককাহিনির অংশ; এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্নমতও রয়েছে।
ধর্মীয় আচার, ভক্তদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শ্রীমঙ্গলের রথযাত্রা সম্পন্ন হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এই আয়োজন শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সম্প্রীতি, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা।



















