img

২ কোটি টাকার স্কলারশিপ পেলেন চা বাগানের শান্তা

প্রকাশিত :  ০৯:২০, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

২ কোটি টাকার স্কলারশিপ পেলেন চা বাগানের শান্তা

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলা চা বাগানের শ্রমিক লাইনের ছোট্ট একটি ঘরে জন্ম শান্তা যাদবের। সেই শান্তা এখন পড়বেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে। সেখানে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রায় ২ কোটি টাকা সমমূল্যের বৃত্তি পেয়েছেন তিনি।

শান্তার বাবা-মা দুজনই চা শ্রমিক। বাবা-মায়ের মাসিক আয় ১০ হাজার টাকারও কম। সেই সীমিত সামর্থ্যের পরিবার থেকেই উঠে এসে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ‘মাস্টার অব মেডিকেল সায়েন্স ইন গ্লোবাল হেলথ ডেলিভারি’ প্রোগ্রামে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন শান্তা।

শান্তার বাবা লক্ষ্মী নারায়ণ যাদব ও মা রীনা যাদব দুজনই চা শ্রমিক। সীমিত আয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানোই তাঁদের জন্য কঠিন ছিল। এমন পরিস্থিতিতে মেয়ের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করা সহজ ছিল না। তবে ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী শান্তা নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি।

পারিবারি সূত্রে জানা যায়, লংলা চা বাগানের স্থানীয় স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে কুলাউড়ার ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি।

উচ্চশিক্ষার জন্য শান্তা ভর্তি হন চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে। সেখান থেকে জনস্বাস্থ্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি।

হার্ভার্ডে পড়ার সুযোগ পাওয়ার আগে বিশ্বের আরও ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার প্রস্তাব পেয়েছিলেন শান্তা। নিজের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত তিনি হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের প্রোগ্রামটি বেছে নেন। প্রায় ২ কোটি টাকা সমমূল্যের বৃত্তি নিয়ে সেখানে পড়ার সুযোগ তাঁর শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে মনে করেন শান্তা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের পথও খুলছে তাঁর সামনে।

শান্তার কাছে জনস্বাস্থ্য কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়। চা বাগানের শ্রমিকেরা অসুস্থ হলে চিকিৎসা পেতে কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন, তা তিনি কাছ থেকেই দেখেছেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা পেতে দূরে যেতে হওয়া এবং চিকিৎসা গ্রহণের নানা সীমাবদ্ধতা তাঁর নিজের কমিউনিটির মানুষের জীবনের অংশ।

এসব অভিজ্ঞতা থেকেই জনস্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় শান্তার। নিজের এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার আকাঙ্ক্ষা তাঁর ভবিষ্যৎ লক্ষ্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। হার্ভার্ডে পড়াশোনার সুযোগ তাই তাঁর কাছে শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, নিজের কমিউনিটির স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

শান্তার বাবা লক্ষ্মী নারায়ণ যাদব জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর মেয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী ছিল। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে শুরুতে শান্তাকে শহরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সুযোগ হয়নি। তবু মেয়ের মেধা, আগ্রহ ও অধ্যবসায় দেখে তিনি আশাবাদী ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একদিন মেয়ে নিজের যোগ্যতায় ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে।

শান্তার বর্তমান অর্জন সেই আশা এবং পরিবারের দীর্ঘদিনের ত্যাগের প্রতিফলন। মাসে ১০ হাজার টাকারও কম আয়ের একটি পরিবার থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়া দেখিয়ে দিচ্ছে, সীমিত সামর্থ্য সব সময় শিক্ষার্থীর সম্ভাবনার সীমা নির্ধারণ করে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শান্তা নিজের শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি চা বাগানের অন্য শিক্ষার্থীদের নিয়েও ভেবেছেন। চা ছাত্র সংসদের শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে চা বাগানের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেন তিনি।

চা বাগানের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষার পথে আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সুযোগের অভাব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে শান্তার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছানো তাঁদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। তাঁর পথচলা অন্য শিক্ষার্থীদেরও নিজেদের সামর্থ্য ও সুযোগ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে উৎসাহিত করতে পারে।

হার্ভার্ডে পড়াশোনা শেষে নিজের এলাকায় ফিরে চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে চান শান্তা। তাঁর এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শৈশবের অভিজ্ঞতা এবং বেড়ে ওঠা কমিউনিটির মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।

যে চা বাগানের সীমাবদ্ধতা কাছ থেকে দেখে তাঁর জনস্বাস্থ্য নিয়ে পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে, উচ্চশিক্ষার পর সেই এলাকার মানুষের জন্যই কাজ করতে চান তিনি। হার্ভার্ডের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজের কমিউনিটির স্বাস্থ্যসেবায় কীভাবে অবদান রাখা যায়, সেটিই এখন তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শান্তা শুধু নিজের পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। চা ছাত্র সংসদের শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। এ সময় চা বাগানের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করার উদ্যোগও নেন।


শিক্ষা এর আরও খবর

img

ঢাবিতে ৭ শিক্ষার্থী আহতের ঘটনায় প্রক্টর অফিস ঘেরাও, পাঁচ দফা দাবি

প্রকাশিত :  ১০:২৯, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সামনে গাড়িচাপায় সাত শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনায় মামলা দায়েরসহ পাঁচ দফা দাবিতে প্রক্টর অফিস ঘেরাও করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুর ১২টা থেকে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে এ কর্মসূচি শুরু হয়। প্রক্টরকে অফিসে না পাওয়া এবং একাধিকবার ফোন করেও যোগাযোগ করতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা দায়েরের আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করেনি। এ কারণে তারা পুনরায় প্রক্টর অফিসে গিয়ে অবস্থান নেন।

এর আগে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সামনে একটি প্রাইভেটকারের ধাক্কায় সাত শিক্ষার্থী আহত হন। গাড়িটির চালক হিসেবে অভিযুক্ত সাদমান সাকিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশনের শিক্ষার্থী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষক এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য শহিদুল ইসলামের ছেলে।

আহত শিক্ষার্থীদের সহপাঠী জোনায়েদ অভিযোগ করেন, ঘটনার পর প্রক্টর অভিযুক্তের বিষয়ে নমনীয় অবস্থান নেন। তিনি বলেন, ‘গতকাল আমার বিভাগের ছয়জন শিক্ষার্থীর ওপর গাড়ি চাপা দেওয়ার পরও প্রক্টর বলতেছেন, সে ভুলবশত অন্যায় করেছে। আমরা তাৎক্ষণিক বিচারের দাবিতে গেলে প্রক্টর বলেছিলেন, ও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হলে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করতাম। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন জানতে পারেন, ও এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী, তখনই উনি সুর পাল্টে ফেলেন এবং বলেন, তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জোনায়েদ আরও অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীরা ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ চাইলেও প্রশাসনিক নীতিমালার কথা বলে তা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রক্টর অফিসে আন্দোলনের পর অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর নিয়ে তারা প্রশাসনের সঙ্গে থানায় যান। তবে সেখানে শিক্ষার্থীদের বাইরে রেখে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হলেও শেষ পর্যন্ত মামলা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

জোনায়েদ বলেন, ‘আমরা সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই আজকের এই কর্মসূচি দিয়েছি। কিন্তু দেখেন, এখনো প্রক্টরের কোনো খোঁজ নেই। কল দিলেও রিসিভ করেন না। আমরা শিক্ষার্থীরা বলতে চাই, আপনি যদি আপনার দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, আপনি পদত্যাগ করেন। সর্বশেষ, আমরা কোনো নেগোসিয়েশন চাই না, আমরা চাই সঠিক বিচার।’

শিক্ষার্থীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বহন করা; ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ ও প্রকাশ; সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক বিচার; মামলা দায়ের ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ক্যাম্পাসে নিরাপদ যানবাহন চলাচলে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন, নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।

এ বিষয়ে প্রক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহকারী প্রক্টর বলেন, ‘আমি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের চিকিৎসার খরচসহ যাবতীয় দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছি। দ্রুত সময়ের মধ্যেই আইনি প্রক্রিয়ায় অপরাধীর বিচার নিশ্চিত হবে।’

প্রক্টরের অনুপস্থিতির বিষয়ে তিনি জানান, অসুস্থতার কারণে প্রক্টর অফিসে আসতে পারেননি। তবে বিকেলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, দুর্ঘটনায় আহত সাত শিক্ষার্থী হলেন ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের মার্কেটিং বিভাগের জাহিদুল ইসলাম হৃদয়, কানিজ ফাতেমা, তাসনিয়া বেগম তাহা, মিফতাহুল, তাসফিয়া তাবাসসুম ও সিদরাতুল মুনতাহা। এ ছাড়া ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ইসলাম তাহিয়াও আহত হয়েছেন।