img

বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা: মূল্যস্ফীতি, নীতি ও সম্ভাবনা

প্রকাশিত :  ০৯:৪২, ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪

বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা: মূল্যস্ফীতি, নীতি ও সম্ভাবনা

রেজুয়ান আহম্মেদ

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতি ১১.৩৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলো—শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তান এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথে অগ্রসর হচ্ছে।

শ্রীলঙ্কায় বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক ২.১০ শতাংশ এবং পাকিস্তানে এটি ৪.৯০ শতাংশে নেমে এসেছে। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে, দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সংস্কার এবং সঠিক ব্যবস্হাপনার ফলে জিনিসপত্রের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কেন সেই একই সাফল্য অর্জন করতে পারছে না?

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিত্র: কোথায় সমস্যার মূল?

বাংলাদেশের অর্থনীতির কিছু মূল সমস্যা স্পষ্ট। প্রথমত, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। রিজার্ভ, রেমিট্যান্স এবং উৎপাদন খাতের উন্নয়নে তাদের বক্তব্য আশাব্যঞ্জক ছিল।

বাংলাদেশের রিজার্ভ এখনও তুলনামূলকভাবে পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার চেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে। চলমান অর্থনৈতিক চাপে রেমিট্যান্সও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, গত চার মাসে ৩৫ শতাংশ বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। তবে এই অর্থনৈতিক সাফল্যগুলো মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণে কার্যকর প্রভাব ফেলছে না। এর পেছনে প্রধান কারণ হতে পারে দুর্বল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগের অপ্রতুলতা এবং দুর্নীতির অব্যাহত প্রভাব।

মূল্যস্ফীতির কারণ ও প্রভাব

১. খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি:

খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশে পৌঁছানোর মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে ঘাটতি, আমদানি নির্ভরতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্য কমলেও দেশের অভ্যন্তরে সঠিকভাবে সেই সুবিধা পৌঁছাচ্ছে না।

২. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট:

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন খাতসহ পণ্যের দামে প্রভাব ফেলেছে। একইসঙ্গে বিদ্যুতের ঘাটতি উৎপাদন খাতের ব্যয় বাড়িয়েছে, যা সাধারণ মানুষের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

৩. টাকার মান কমে যাওয়া:

টাকার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে।

নীতি-নির্ধারকদের ব্যর্থতা

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে পরামর্শ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে।

অগ্রাধিকার নির্ধারণের অভাব:

কোথায় অর্থ বিনিয়োগ করা উচিত এবং কোন খাতগুলো উন্নয়নের জন্য জরুরি—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে না পারা সরকারের বড় ব্যর্থতা।

দুর্নীতি ও পাচার:

সরকারের দাবি অনুযায়ী অর্থ পাচার এবং দুর্নীতি অনেকাংশে কমে এসেছে। কিন্তু কার্যত এই সেক্টরের কোনো সঠিক হিসাব নেই, যা অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে।

শেখার সুযোগ: শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সাফল্য

শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তান তাদের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার জন্য যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে, তা থেকে বাংলাদেশ অনেক কিছু শিখতে পারে। শ্রীলঙ্কা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যেখানে জ্বালানি, খাদ্য এবং কৃষি খাতে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

পাকিস্তান আইএমএফ-এর কঠোর শর্ত মেনে অর্থনৈতিক সংস্কার করেছে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।

সমাধানের উপায়: বাংলাদেশ কী করতে পারে?

১. নিয়ন্ত্রণমূলক বাজার ব্যবস্থাপনা:

পণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো জরুরি।

২. দুর্নীতি রোধে দৃঢ় পদক্ষেপ:

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত ব্যাংকিং খাত এবং আমদানি-রপ্তানিতে দুর্নীতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৩. কৃষি ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ:

খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কমাতে স্থানীয় কৃষি এবং উৎপাদন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষি খাতকে আধুনিকায়ন করতে হবে।

৪. বিশ্বব্যাপী বাজারের সাথে সমন্বয়:

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতি প্রণয়ন এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে সঠিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। রেমিট্যান্স প্রবাহ, স্থানীয় সম্পদের উন্নয়ন এবং দুর্নীতিমুক্ত নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ভবিষ্যত গড়ে তোলা সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাফল্য থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশকেও তার নিজস্ব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানমুখী হতে হবে।

রেজুয়ান আহম্মেদ: কলামিস্ট, বিশ্লেষক; সম্পাদক অর্থনীতি ডটকম
img

স্বল্পমূল্যের শেয়ারে কি ফিরছে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ? বাজারে আস্থা ফেরার সঙ্গে বাড়তে পারে ১০ টাকার নিচের শেয়ারের কদর

প্রকাশিত :  ১২:৫৫, ০৬ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যহ্রাসের কারণে অনেক কোম্পানির শেয়ার ১০ টাকার নিচে নেমে এসেছে। একসময় যেসব শেয়ার বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল, বাজারের মন্দাভাব, আস্থার সংকট এবং তারল্য সংকটের কারণে সেগুলোর অনেকগুলো এখন নামমাত্র দামে লেনদেন হচ্ছে। তবে বাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বল্পমূল্যের কিছু শেয়ার আগামী দিনে নতুন করে বিনিয়োগকারীদের নজর কাড়তে পারে।

বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, পুঁজিবাজারে যখন ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়, তখন সাধারণত কম দামি শেয়ারগুলোতে প্রথমে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়তে দেখা যায়। তুলনামূলকভাবে কম মূলধন নিয়ে বেশি সংখ্যক শেয়ার কেনার সুযোগ থাকায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এসব শেয়ারের প্রতি আকৃষ্ট হন। ফলে বাজারে আস্থা ফিরতে শুরু করলে ১০ টাকার নিচে থাকা শেয়ারগুলোর দামও দ্রুত বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বাজার সংস্কার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রমের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগের কারণে ইতিবাচক প্রত্যাশা দেখা যাচ্ছে। এর প্রভাব বাজারে ধীরে ধীরে প্রতিফলিত হলে দীর্ঘদিন অবমূল্যায়িত অবস্থায় থাকা কিছু শেয়ারের মূল্য পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ পেতে পারে।

তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, ১০ টাকার নিচে থাকা সব শেয়ারই যে ভালো বিনিয়োগ হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। অনেক কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল, ব্যবসায়িক কার্যক্রম সীমিত কিংবা দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে রয়েছে। ফলে শুধুমাত্র কম দাম দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, যেসব কোম্পানির মৌলভিত্তি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, নিয়মিত ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমূল্যের শেয়ারগুলো বেশি লাভজনক হতে পারে। অন্যদিকে দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি ঘটলেও তা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।

পুঁজিবাজারের ইতিহাস বলছে, প্রতিটি পুনরুদ্ধার পর্বে কিছু অবমূল্যায়িত শেয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য উল্লেখযোগ্য মুনাফার সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমান বাজারেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে বাজারে আস্থা ও তারল্য বাড়লে ১০ টাকার নিচে থাকা নির্বাচিত কিছু শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, স্বল্পমূল্যের শেয়ারগুলো আগামী দিনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারে। তবে বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করাই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়।