img

শহীদ মোকমেদ আলী: এক বিস্মৃত বীরের কবর আজও রয়ে গেছে ভারতের ত্রিপুরায়

প্রকাশিত :  ১৬:০৬, ২৭ জুলাই ২০২৫

শহীদ মোকমেদ আলী: এক বিস্মৃত বীরের কবর আজও রয়ে গেছে ভারতের ত্রিপুরায়
সংগ্রাম দত্ত: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এই যুদ্ধে আত্মত্যাগ করেছিলেন হাজারো মুক্তিযোদ্ধা। অনেকের নাম ইতিহাসে অমর হয়ে আছে, আবার অনেকে রয়ে গেছেন নিভৃতে—যাদের বীরত্বের গল্প আজও অজানা। তেমনই এক বীর শহীদ হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক মোকমেদ আলী, যিনি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার সাগরনাল চা বাগানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে  শহীদ হন।

১৯৭১ সালের ১২ অক্টোবর কুলাউড়া উপজেলার সাগরনাল চা বাগান এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এক গেরিলা অভিযানে অংশ নেন সৈনিক মোকমেদ আলী। এই যুদ্ধে তিনি বীরের মতো যুদ্ধ করে শহীদ হন। পরদিন ১৩ অক্টোবর ১৯৭১ তাঁর মরদেহ কাঁটাতার পেরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের উত্তর ত্রিপুরা জেলার ধর্মনগর মহকুমার অধীনে কদমতলা থানার চাল্লিশদ্রোন গ্রামে। তখন সেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি অস্থায়ী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ছিল ।

স্থানীয়দের সহায়তায় সেদিন একটি ছোট্ট কবরস্থানে জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও সেই কবর অক্ষত রয়েছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শহীদ মোকমেদ আলীর কবর কিংবা তাঁর পরিবার তাঁর সম্পর্কে কোনো অনুসন্ধান করা হয়নি।

সম্প্রতি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ধর্মনগরের বাসিন্দা মিনহাজুল আলম ‘বঙ্গভিটা’ নামের একটি ফেসবুক পেজে শহীদ মোকমেদ আলীর কবরের ছবি ও বিবরণ শেয়ার করলে ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হয়। তিনি জানান, ওই কবরস্থানে আরও কিছু বীর মুক্তিযোদ্ধার কবর রয়েছে যাদের পরিচয় আজও অজানা। তবে শহীদ মোকমেদ আলীর কবরের পাশে একটি নামফলকে তাঁর নাম, পদবি এবং আইডি নম্বর (৩৯৪০০৮৮) উল্লেখ আছে। সেই ফলকে উল্লেখ রয়েছে তাঁর গ্রামের ঠিকানাও: কিসমত নয়াপাড়া, পোস্ট: গোয়ালপাড়া, জেলা: কুমিল্লা, বাংলাদেশ।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে, স্বাধীনতার এত বছর পরেও শহীদ মোকমেদ আলীর পরিবারের কোনো সদস্য হয়তো জানেনই না যে তিনি কোথায় শায়িত আছেন। না সরকার, না কোনো সংগঠন এই কবর সম্পর্কে কোনো খোঁজখবর নিয়েছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকেও কোনো তালিকায় তাঁর নাম নেই বলে জানা গেছে।

স্থানীয় জনসাধারণ নিজেদের উদ্যোগে একটি ক্ষুদ্র স্মৃতিফলক স্থাপন করেছেন তাঁর কবরের পাশে। কালের আবর্তে তারা হয়তো ভুলে যাননি মুক্তিযুদ্ধের এক নির্ভীক শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে।

এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে—শহীদ মোকমেদ আলীর দেহাবশেষ উল্লেখিত স্থান থেকে এখানে দেশের সম্মানের সহিত সমাহিত করা, তাঁর পরিবারকে অবহিত করা হয়, এবং কবরস্থানটিকে সংরক্ষিত স্মৃতিসৌধ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। সেই সঙ্গে সেখানে শায়িত অন্য অজানা শহীদদের পরিচয় খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে স্বাধীনতাকামী লোকজন মনে করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটিতে লেগে আছে শহীদদের রক্ত। মোকমেদ আলীর মতো শহীদদের অবদান জাতি যতদিন স্মরণ করবে, ততদিন স্বাধীনতার মর্যাদা অটুট থাকবে। আর একটিও শহীদ যেন অবহেলিত না থাকেন—এটাই হোক আমাদের সকলের অঙ্গীকার।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

কোদালিছড়া বন্ধ, শহর বন্দী: জলাবদ্ধতায় মৌলভীবাজার শহর ও শহরতলী

প্রকাশিত :  ১৮:৩৮, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারে গ্রীষ্মের শেষভাগ মানেই এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা—বর্ষা পুরোপুরি না নামলেও হঠাৎ ঝড়, দমকা হাওয়া আর বজ্রসহ বৃষ্টিতে শহরের প্রকৃত চিত্র বারবার উন্মোচিত হয়। সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই যখন একটি শহর পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন সেটি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের গল্প থাকে না; হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা আর অবহেলার নির্মম প্রতিচ্ছবি।

গত সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তুলনামূলক স্বল্প সময়ের বৃষ্টিতেই মৌলভীবাজার পৌর শহরের রাস্তাঘাট ডুবে যায়, দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে, অসংখ্য পরিবারের ঘরে প্রবেশ করে বৃষ্টির পানি। কারো ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারো আসবাবপত্র নষ্ট হয়েছে, কারো জীবনের সঞ্চয় এক রাতেই ভেসে গেছে। অথচ এই দৃশ্য নতুন নয়—বরং বছর ঘুরে ঘুরে ফিরে আসা এক চেনা দুর্ভোগ।

এই সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে কোদালিছড়া—পৌরসভার পানি নিষ্কাশনের প্রধান এবং কার্যত একমাত্র মাধ্যম। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে পানির প্রবাহ থাকার কথা, সেখানে এখন দেখা যায় স্থির, বদ্ধ পানি। ছড়ার বুকে ভাসে পলিথিন, ময়লা-আবর্জনা; বাতাসে ছড়ায় দুর্গন্ধ। আশপাশের মানুষের জন্য এটি শুধু অসুবিধাই নয়, এক ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিরও নাম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছড়ার ভাটিতে তৈরি হওয়া কয়েকটি অস্থায়ী বাঁধই এই সংকটের অন্যতম মূল কারণ। এসব বাঁধ পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে, ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারছে না। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে বহুবার সতর্ক করা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কিছু এলাকায় আংশিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হলেও সমস্যার মূল জায়গাগুলো অরক্ষিতই থেকে গেছে।

ড্রেনেজ ব্যবস্থার অবস্থাও কম করুণ নয়। শহরের অনেক ড্রেন ময়লা ও প্লাস্টিকে ভরে গেছে; কোথাও কোথাও ড্রেনের অস্তিত্বই বোঝা যায় না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং নাগরিক অসচেতনতা—সব মিলিয়ে একটি অচল ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে, যার খেসারত দিচ্ছে পুরো শহর।

একসময় অবশ্য এই পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিল।

২০১৮ সালে কোদালিছড়া সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থাও ছিল। নাগরিকদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে প্রতিদিন ছড়ার পরিচর্যা করা হতো। সেই উদ্যোগের ফলে কয়েক বছর জলাবদ্ধতার তীব্রতা কমে এসেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে। প্রশ্ন উঠছে—যে অর্থ এখনো নাগরিকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে, তার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি?

বর্তমানে পৌরসভায় কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় শহর পরিচালিত হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় দ্রুততা ও জবাবদিহিতার অভাব স্পষ্ট। সম্ভাব্য নেতৃত্বের কথা শোনা গেলেও এই সংকটকালে তাদের দৃশ্যমান ভূমিকা খুব একটা চোখে পড়ে না।

তবে দায় শুধু প্রশাসনের নয়। নাগরিক হিসেবেও দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। ড্রেনে ময়লা ফেলা, প্লাস্টিক ব্যবহারে উদাসীনতা—এসব আচরণ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। টেকসই সমাধানের জন্য তাই দরকার সমন্বিত উদ্যোগ—প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোদালিছড়াকে সচল করা, ভাটির বাঁধগুলো দ্রুত অপসারণ, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার—এই চারটি পদক্ষেপ এখন জরুরি। নইলে সামনে আসা পূর্ণ বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখানো হয়েছে বহুবার। কিন্তু একটি শহর যদি নিজের বৃষ্টির পানি সামলাতে না পারে, তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

২৭ এপ্রিলের রাত যেন আরেকটি সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। এখনো সময় আছে—সঠিক সিদ্ধান্ত আর কার্যকর উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। কারণ একটি শহর শুধু অবকাঠামোর সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বপ্ন আর টিকে থাকার প্রতিচ্ছবি।


সিলেটের খবর এর আরও খবর