img

পুঁজিবাজারে রোববার: আস্থা ফেরানোর দায় কার?

প্রকাশিত :  ০৯:১২, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:১৭, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

পুঁজিবাজারে রোববার: আস্থা ফেরানোর দায় কার?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

পুঁজিবাজার কেবল সূচক বা লেনদেনের পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক আস্থার প্রতিফলন। তবে সেই আস্থা আজ চরম সংকটে। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ঢাকার পুঁজিবাজারে যে চিত্র দেখা গেছে, তা কোনো আকস্মিক অস্থিরতা নয়—বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ।

রোববার, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি, বাজার যখন খুলবে, বিনিয়োগকারীরা তখন ভবিষ্যতের স্বপ্নে আর ভরসা রাখতে পারছেন না। তারা এখন চাক্ষুষ দেখতে চান—নিয়ন্ত্রক সংস্থা কী ভূমিকা রাখছে, সরকার কী বার্তা দিচ্ছে এবং বাজারকে আদৌ কেউ গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে কি না।

সূচক বাড়লেই আস্থা ফেরে না

গত সপ্তাহে সূচকের সাময়িক উত্থান প্রমাণ করেছে, বাজার এখনো প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম। তবে লেনদেনের দুর্বলতা আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে—বাজারে পুঁজির চেয়ে সংশয়ই বেশি। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পুঁজিবাজার এখন মূলত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভরশীল; অথচ সেই বিনিয়োগকারীরাও ক্রমাগত ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। সূচককে কৃত্রিমভাবে ধরে রাখার চেষ্টা করে বাজারের মৌলিক সমস্যাগুলো আড়াল করা সম্ভব নয়; বরং এতে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়।

উচ্চ সুদের নীতিতে অবহেলিত বাজার

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি যৌক্তিক হতে পারে, তবে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পুঁজিবাজার কার্যত নীতিগত অবহেলার শিকার হয়েছে। নীতি সুদহার (Policy Rate) ১০ শতাংশে থাকার অর্থ হলো—ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের পথ সংকুচিত হওয়া। যখন ব্যাংক আমানত ও সরকারি বন্ড নিশ্চিত মুনাফার নিশ্চয়তা দেয়, তখন শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রণোদনা কোথায়? এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। ফলে বড় বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে সরে গেছেন। তারল্যহীন বাজারে আস্থা জন্মায় না—এটাই অর্থনীতির বাস্তবতা।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী: বাজারের সবচেয়ে অনিরাপদ পক্ষ

পুঁজিবাজার সংস্কার নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন, বাস্তবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা আজও সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। মূল্যস্ফীতির চাপে তাদের সঞ্চয়ক্ষমতা কমছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাজার থেকে অর্থ তুলে নেওয়া কোনো কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি তাদের জন্য একপ্রকার বাধ্যবাধকতা। মাসের শুরুতে বিক্রির চাপ বাড়া কোনো কারসাজি নয়; এটি সমাজ ও অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রতিফলন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিনিয়োগকারীদের রক্ষা করার দায়িত্ব কার?

ঘোষণার চেয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ জরুরি

নতুন আইপিও (IPO) বিধিমালা, কেওয়াইসি (KYC) আধুনিকায়ন ও বাজার স্বয়ংক্রিয়করণ—সবই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। তবে বিনিয়োগকারীরা এখন কেবল ঘোষণায় তুষ্ট নন, তারা বাস্তব ফলাফল দেখতে চান। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তি নিয়ে বছরের পর বছর আলোচনা হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বিরল। এই ব্যবধানই বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রধান অন্তরায়।

রাজনীতি ও অনিশ্চয়তার প্রভাব

পুঁজিবাজার রাজনৈতিক অস্থিরতা সহ্য করতে পারে না। নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনা, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও অনিশ্চিত রোডম্যাপ বিনিয়োগকারীদের আরও সতর্ক ও রক্ষণাত্মক করে তুলছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণও সেই একই নেতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কারের উদ্যোগ ইতিবাচক, তবে এখানে ‘সময়’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কারে বিলম্ব মানেই বাজারে আস্থার আরও ক্ষয়।

এখন দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

রোববারের বাজার হয়তো বড় কোনো চমক দেখাবে না, তবে এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে—বাজার কোন দিকে যাচ্ছে। সেই বার্তা যদি অনিশ্চয়তার হয়, তবে এর দায় নীতিনির্ধারকরা এড়াতে পারবেন না। পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল করতে এখন প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতি, দৃশ্যমান সংস্কার এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সাহসী সিদ্ধান্ত। কেবল বক্তৃতা বা আশ্বাসে বাজার চলে না।

একটি দেশের অর্থনীতি তখনই শক্ত ভিত পায়, যখন তার পুঁজিবাজার বিশ্বাসযোগ্য হয়। সেই বিশ্বাস ফেরানোর প্রাথমিক দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদেরই নিতে হবে।

রোববারের পুঁজিবাজার তাই শুধু লেনদেনের সাধারণ কোনো দিন নয়—এটি একটি পরীক্ষা। আস্থা ফিরবে নাকি অবিশ্বাস আরও গভীর হবে, তার উত্তর দেবে সময়; কিন্তু সংশ্লিষ্ট সকলের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন জরুরি।

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের কী হবে, জানালেন বিএসইসি চেয়ারম্যান

প্রকাশিত :  ০৫:৫৮, ১২ জুলাই ২০২৬

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভূমিকা নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেন, শেয়ারহোল্ডারদের ভবিষ্যৎ স্বার্থ ও প্রাপ্য আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন (ইন্টারন্যাশনাল ভ্যালুয়েশন) পদ্ধতির ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা উচিত।

গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাজধানীর বিজয়নগরের ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত ‘সিএমজেএফ টক’ অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সিএমজেএফের সভাপতি মনির হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব রাসেলসহ সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে শেয়ারবাজারের দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার লক্ষ্যে \'শেয়ার শূন্য\' ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে সমালোচনার মুখে তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান যে- সরকার তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। কোন প্রক্রিয়ায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে সেটি \'হিসাব-নিকাশ\' করা হচ্ছে। এরপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও বিষয়টির সমাধান হয়নি৷ ওই পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় বর্তমান কমিশন কি ধরনের ভূমিকা রাখবে?

জবাবে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, “ওই প্রশ্নটার উত্তর দেওয়ার আগে আমি একটা ফান্ডামেন্টাল প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই। হোয়াট ইজ দ্য ভ্যালু অফ দিস শেয়ার? ওই পাঁচটি ব্যাংকের নেগেটিভ নিট ইকুইটি ছিল কিনা? উত্তর- ছিল। অর্থাৎ লস মেকিংয়ে নেগেটিভ ইকুইটি ছিল। ইন দিস কেসেস ইন্টারন্যাশনাল ভ্যালুয়েশন মেথলজি কি বলছে? যদি কোনো কোম্পানি লস মেকিং হয় আমরা শেয়ারকে মূল্যায়ন করবো বেসড অন দ্য নেটওয়ার্কস, অন্য দিকে তাকাবো না। তাহলে নেটওয়ার্ক যদি নেগেটিভ হয়, ভ্যালুয়েশন কি হবে? উত্তরটা হবে ‘জিরো’।”

তিনি বলেন, \'আপনি (বিনিয়োগকারী) তো জেনে-শুনে ইনভেস্ট করছেন। আজকে যদি ওই ব্যাংকগুলো খোলাও থাকতো তাহলে হয়তো ৫০ পয়সা থেকে এক টাকা দিয়ে লেনদেন করতে হতো। এর বেশি হয়তো আপনি পেতেন না। আপনি হয়তো ২০ টাকা বা ১৫ টাকায় কিনেছেন। কিন্তু, ওভার দ্য ইয়ারস এগুলোর পারফরমেন্স ডিউ (বকেয়া) হয়ে গেছে। ফলে এগুলো পাঁচটাকা, একটাকা, দুই টাকা হয়ে গেছে। হয়তো আপনি সেটাই পেতেন। কিন্তু সেটাও পাওয়ার কথা নয়। কারণ এগুলোতে নেগেটিভ ইকুইটি ছিল।\'

ঢাকা পোস্টের এই প্রতিবেদকের দ্বিতীয় প্রশ্ন- সম্প্রতি প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) যেই কোম্পানিগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে, সেগুলো তালিকাচ্যুত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক তালিকাভুক্ত অনেকগুলো ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধের দিকে এগোচ্ছে৷ এসব কোম্পানি তালিকাচ্যুত করা হলে শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করা হবে কিনা?

এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ খান বলেন, ‘একই উত্তরটা আপনি পাবেন। ওইসব প্রতিষ্ঠানের কী অবস্থা আপনি বলেন তো? এগুলোতে নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ হিসাব ছাড়া। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপল লিজিং- এসব কোম্পানিগুলোর নেটওয়ার্ক কি আছে? এগুলো জিরোর থেকেও অনেক কম।’

অর্থনীতি এর আরও খবর