img

মব নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এ নির্বাচনেও সহিংসতা হতে পারে : ইফতেখারুজ্জামান

প্রকাশিত :  ১১:৫২, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মব নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এ নির্বাচনেও সহিংসতা হতে পারে : ইফতেখারুজ্জামান

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, মব সন্ত্রাস যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে আসন্ন ১২ তারিখের নির্বাচনে সহিংসতা দেখা দিতে পারে—যেমনটি ঘটেছিল বিগত নির্বাচনগুলোতে। তিনি বলেন, নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে মব সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ও কার্যকর অবস্থান নিতে হবে।

আজ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) টিআইবির কনফারেন্স রুমে ‌‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, যদি মব সন্ত্রাস যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে বিগত নির্বাচনের মতোই আসন্ন ১২ তারিখের নির্বাচনে সহিংসতা হতে পারে।

মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হতে হবে। 

তিনি বলেন, বাংলাদেশে মব সংস্কৃতি শুরু হয়েছে সরকারের থেকেই। সরকার গঠনের পরেই সচিবালয়ে প্রথম মব হয়। সরকারের বাইরের শক্তি যারা এখন মব করছে, তারা ক্ষমতায়িত হয়েছে সচিবালয়ে মব সৃষ্টির পরে।

এর ফলে সরকারের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়েছে।

টিআইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, রাজনীতিবিদ ও আমলাতন্ত্র জুলাই আন্দোলন থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। গণতান্ত্রিক সংস্কার সফল করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আর একটি হত্যাকাণ্ডও হবে না—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আর যেন নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা না হয়।

তবে সহিংসতার ঝুঁকি শুধু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত নয়, এর পরবর্তী কয়েক দিনও থাকতে পারে। সরকার এই ঝুঁকির বিষয়টি ভালোভাবেই জানে এবং ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা ও সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

জুলাই আন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাংবাদিকদের ঢালাওভাবে মামলায় জড়ানোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, পেশাগত অবস্থান অপব্যবহারের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া কতটুকু বিচার আর কতটুকু প্রতিশোধ, সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। এর ফলে প্রকৃত অপরাধী, কর্তৃত্ববাদের দোসরদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা কতটুকু সম্ভব ও গ্রহণযোগ্য হবে, সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।

তিনি আরও যোগ করেন, প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির মতো অপরাধের প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ন্যায়সংগত ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

গণভোট ও সংস্কার প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নোট অব ডিসেন্টের মৌলিক কনসেপ্ট ধারণ করলে আপত্তি থাকলেও যেসব বিষয়ে ঐকমত্য বা সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটিই বাস্তবায়িত হবে। এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার রীতি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত আছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমনটি হবে কি না, সেটি দেখার বিষয়। গণভোটের রায় \'হ্যাঁ\'-এর পক্ষে গেলে সেক্ষেত্রে যারা সরকারে যাবে, তাদের সদিচ্ছার ওপর সংস্কার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে।

সরকারের প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ ও গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, মিডিয়া বিশেষভাবে সরকার কর্তৃক উপেক্ষিত হয়েছে এবং মিডিয়ার প্রতি নতুন করে ঝুঁকি সৃষ্টি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের ভেতরের ও বাইরের শক্তি কাজ করেছে এবং বাইরের শক্তিকে সরকারই \'অতিক্ষমতায়িত\' করেছে। 

গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে পেশাদারত্বের সঙ্গে নিরাপদে কাজ করুক—এই চিন্তাভাবনা অন্তর্বর্তী সরকার ধারণ করেছে কি না, সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, দুটি মিডিয়া কমিশন লোকদেখানো পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়।

 

বাংলাদেশ এর আরও খবর

img

ভারতে নানকের কাছে মাসে যায় কোটি টাকা, নেপথ্যে যারা

প্রকাশিত :  ০৯:০৭, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের কাছে বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে নিয়মিত অর্থ পাঠানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ অর্থ পাঠাতে দুটি পথ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বরিশাল ও ঢাকার বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়ি ও সম্পত্তি থেকে পাওয়া আয়ের একটি অংশ দুই হুন্ডি ব্যবসায়ী এবং বেনাপোলের একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হচ্ছে। ভারতে অর্থ পৌঁছানোর এই পুরো ব্যবস্থাপনার পেছনে নানকের তিন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি রয়েছেন বলে জানা গেছে।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কিভাবে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে যান তা সবিস্তারে বলেছিলেন নানক। সেই বক্তব্য অনুযায়ী ২৪’র ১৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশেই ছিলেন তিনি। ১৬ আগস্ট তামাবিল সীমান্ত হয়ে প্রবেশ করেন ভারতের শিলংয়ে। এরপর মালদা হয়ে চলে যান কলকাতায়। তার পালিয়ে যাওয়ার পুরো পরিকল্পনাটি করেন মেয়ে রাখির স্বামী ডা. নাজমুল। সেই সাক্ষাৎকারে নানক যা তিনি বলেননি তা হলো, কলকাতার অভিজাত তপসিয়া এলাকায় আগে থেকেই ভাড়া করা ছিল বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। কলকাতায় গিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে সেখানেই ওঠেন তিনি। বর্তমানে এই দম্পতিকে মাঝে মধ্যেই দেখা যায় কলকাতার নামিদামি শপিংমলগুলোতে। দেশের মতো বিদেশে পালিয়ে থাকা অবস্থাতেও দামি গাড়িতে চড়া আর বিলাসিতার সবকিছুই ভোগ করছেন তারা। যার জোগান যায় বাংলাদেশ থেকে। প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা বরিশাল আর ঢাকা থেকে নানকের কাছে যায় অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে। 

সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পর নানকের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করা এক ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করেন এর সবকিছু। ৫ আগস্টের পর অবশ্য আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়তে হয় তাকে। তারপরও যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন ক্ষমতার সময়ে নানকের কাছ থেকে নানা সুবিধা নেওয়া ষাটোর্ধ্ব এই ব্যক্তি।

বরিশাল নগরীর সদর রোড ও কাঠপট্টি এলাকার দুই হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে সরাসরি ভারতে টাকা যায় নানকের কাছে। এদের একজন হোটেল ব্যবসায়ী। অন্যজন স্বর্ণের ব্যবসার আড়ালে চালান অবৈধ হুন্ডির ব্যবসা। এখানে থাকা বিশাল ভবনসহ অন্যান্য ছোট-বড় বাড়িগুলোর ভাড়া তুলে সরাসরি দিয়ে দেওয়া হয় ওই দুই হুন্ডি ব্যবসায়ীর কাছে। তারাই তা পশ্চিমবঙ্গে রুপি আকারে নানকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের একটি বড় অংশও দাপ্তরিক ফাঁক গলে চলে যায় ভারতে। ঢাকায় থাকা ৩টি বাড়িসহ অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যের আয়ও একইভাবে যায় সেখানে। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় বেনাপোল সীমান্তে থাকা একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মালিককে। ওই মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর যশোরে থাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয় ঢাকা থেকে। এরপর তিনি তার পশ্চিমবঙ্গের এজেন্টের মাধ্যমে রুপি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন নানকের কাছে। ঢাকার আয় পশ্চিমবঙ্গে পাঠানোর বিষয়টি দেখভাল করেন নানকের এক ছোট ভাই।

আওয়ামী শাসনামলের ১৭ বছরে অর্থবিত্তে ফুলেফেঁপে ওঠেন বরিশাল নগরীর বটতলা এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর কবির নানক। যদিও তিনি এমপি হয়েছিলেন ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে। ২০০৮’র জাতীয় নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামায় নিজের ও স্ত্রীর মিলিয়ে মাত্র ৬৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার সম্পদ থাকার তথ্য দেন নানক। ১৬ বছরের ব্যবধানে ২০২৪’র নির্বাচনে হলফনামায় তিনি দুজনের সম্পদের পরিমাণ দেখান ১৯ কোটি টাকা। দুই হলফনামার এই হিসাবে ৩০ গুণ সম্পদ বাড়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি সম্পদ রয়েছে নানক পরিবারের। সেসব সম্পদের মূল্য শত কোটি টাকার বেশি।

বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকায় নানক দম্পতির মালিকানায় থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘গ্লোবাল ভিলেজ’র কথা উল্লেখ করা হয়নি দাখিল করা ওই হলফনামায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়-ব্যায়ের কোনো হিসাবও দেওয়া হয়নি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে। বরিশালের প্রবেশদ্বার দোয়ারিকা সেতু এলাকায় থাকা ৮ একর জমির কথাও কোথাও বলেননি নানক। বরিশাল নগরীতে ২টি বাড়ি ও মাছের খামারসহ ২ একর ২২ শতাংশ ভূ-সম্পত্তির কথা হলফনামায় থাকলেও এসব সম্পত্তির অধিকাংশে যে ছোট-বড় ভবন রয়েছে তার যেমন উল্লেখ নেই, তেমনি এসব ভবন থেকে আসা ভাড়ার কথাও হলফনামা তথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বলেননি এই আওয়ামী লীগ নেতা। এর বাইরে ঢাকার কলাবাগান এলাকায় বহুতল ভবনসহ কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে নানকের। 

২৪’র নির্বাচনে দেওয়া হলফনামায় বরিশালে ২টি বাড়ি ছাড়াও রাজধানীর উত্তরায় একটি ৬ তলা ও মোহাম্মদপুরে একটি ৮ তলা বাড়ি থাকার তথ্য দেন নানক। নানকের এসব সম্পদে একটি নখের আঁচড়ও পড়েনি চব্বিশের ৫ আগস্টের পর। বিশেষ করে বরিশাল নগরীর বটতলা এলাকায় থাকা বাড়িতে একটি ঢিলও ছোড়েনি কেউ। ফলে এসব ভবন যেমন রয়েছে বহাল তবিয়তে, তেমনি ভাড়া বাবদ নিয়মিত আদায় হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। একইভাবে মসৃণ গতিতে চলা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও প্রতি মাসে আয় হচ্ছে বিপুল অর্থ। এর পাশাপাশি বরিশাল নগরীর রুপাতলী, মতাসার, সার্কুলার রোড ও করিম কুটিরসহ বিভিন্ন এলাকায় নানকের জমিতে থাকা ছোট-বড় বাসা-বাড়ি থেকেও ভাড়া বাবদ উঠছে মোটা অংকের টাকা। সবমিলিয়ে এই টাকার পরিমাণ প্রতি মাসে কোটিরও বেশি। আর এই পুরো টাকাই হুন্ডি হয়ে চলে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে থাকা নানকের কাছে।

পরিচয় না প্রকাশের শর্তে কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশে ফেরা আওয়ামী লীগের এক কর্মী যুগান্তরকে বলেন, ‘হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া টাকা আনতে বাড়ির বাইরে যেতে হয় না নানককে। নির্ধারিত এজেন্টরা তপসিয়া এলাকার ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসেন তা। ৫ আগস্টের পর টানা প্রায় ২ বছর এভাবেই দেখেছি। ওই টাকা দিয়ে রাজকীয় হালে পশ্চিমবঙ্গে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।’ 

এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের পরিচিত সবগুলো ফোন ও মোবাইল নম্বরে ফোন দেওয়া হলে তার সবগুলোই বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর দেননি তিনি।



বাংলাদেশ এর আরও খবর