img

হবিগঞ্জের চারটি আসনেই বিএনপি প্রার্থীদের নিরঙ্কুশ বিজয়

প্রকাশিত :  ০৫:৫৫, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

হবিগঞ্জের চারটি আসনেই বিএনপি প্রার্থীদের নিরঙ্কুশ বিজয়

হবিগঞ্জ জেলার মোট চারটি নির্বাচনী আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। জেলা প্রকাশসক ও জেলা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

ঘোষিত ফলাফলে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে বেসরকারিভাবে বিএনপির প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়া ১ লাখ ১১ হাজার ৯৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের মাওলানা সিরাজুল ইসলাম রিকশা প্রতীকে পেয়েছেন ৫৫ হাজার ২৪৫ ভোট। ভোটের শতকরা হার ৪৬ দশমিক ৮ ভাগ।

হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫৮৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের  দেয়াল ঘড়ি মার্কার প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ পেয়েছেন ৬৫ হাজার ৭৬২ ভোট। ভোটের শতকরা হার ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

হবিগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী জি কে গউস ১ লাখ ৪২ হাজার ৩৪৮ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী কাজী মহসিন আহমেদ পেয়েছেন ৪৫ হাজার ৫৬৮ ভোট। ভোটের শতকরা হার ৫১ দশমিক ১২ শতাংশ।

হবিগঞ্জ-৪ (মাধবপুর চুনারুঘাট) আসনে বিএনপির সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সল ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী মো. গিয়াস উদ্দিন তাহেরী পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৩২৩ ভোট। ভোটের শতকরা হার ৫৬ দশমিক ১০ শতাংশ।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

শ্রীমঙ্গলের ‘পানু বাবু’ ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর ত্যাগ, সংগ্রাম ও স্বীকৃতি-বঞ্চনার ইতিহাস

প্রকাশিত :  ০৮:১৫, ১২ জুলাই ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অসংখ্য মানুষের অবদান আজও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরে রয়ে গেছে। কেউ সরাসরি যুদ্ধ করেছেন, কেউ সংগঠক হিসেবে মানুষকে প্রস্তুত করেছেন, আবার কেউ জীবনভর আদর্শ ও জনসেবার রাজনীতি করে গেছেন নীরবে। তেমনই এক মানুষ শ্রীমঙ্গলের নোয়াগাঁও গ্রামের ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, যিনি সবার কাছে ছিলেন ‘পানু বাবু’ নামে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও নানা কারণে তিনি রাষ্ট্রীয় মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। তাঁর জীবন তাই ত্যাগ, আদর্শ, নির্যাতন, জনসেবা এবং স্বীকৃতি-বঞ্চনার এক অনুলিখিত ইতিহাস।

ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর জন্ম ব্রিটিশ শাসনামলে তৎকালীন সিলেট জেলার দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমার (বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলা) শ্রীমঙ্গল থানার নোয়াগাঁও গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন স্বর্গীয় যতীন্দ্রমোহন দত্ত চৌধুরী এবং মাতা স্বর্গীয় বিন্দুবাসিনী দত্ত চৌধুরী। ভাইবোনদের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ।

তাঁদের পরিবার ছিল এলাকার একটি ঐতিহ্যবাহী ও সচ্ছল পরিবার। তাঁর পিতা ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন স্থানীয় নেতা ছিলেন। পরে ১৯৬০ সালে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম শুরু হলে তিনি প্রথম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) নির্বাচিত হন।

ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে তিনি শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। বিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর নোয়াগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পেলেও স্বল্প বেতন ও ছোট চাকরি হওয়ায় তিনি সেখানে যোগ দেননি। উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাশহরের একটি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে আইএ পাস করেন। পরবর্তীতে সেখানে তিনি সরকারি চাকরি পেলেও মাতৃভূমির টানে বেশি দিন সেখানে চাকরি করেননি।

পরিশেষে নিজ গ্রামে ফিরে এলে কয়েকজন স্থানীয় তথ্যদাতার মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁর অবস্থানের খবর পেয়ে তাঁকে আটক করে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁর ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয় এবং বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। এই নির্যাতনের ফলে তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে, যার প্রভাব তিনি আমৃত্যু বহন করেন।

এলাকায় ফিরে তিনি পুনরায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-মোজাফফর)-এর রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলে স্থানীয়ভাবে ন্যাপ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠিত করেন। মার্চ ও এপ্রিল মাসজুড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, প্রাথমিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন।

পরে মৌলভীবাজার হয়ে শেরপুর ও সিলেট অঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হন। পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক আক্রমণ, চারদিক থেকে অবরোধ এবং ভারী বোমাবর্ষণের মুখে মুক্তিবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হলে তিনিও সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যান।

ভারতে অবস্থানকালে তিনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালান, তরুণদের উদ্বুদ্ধ করেন এবং নতুন যোদ্ধাদের যুদ্ধে পাঠানোর কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি নিজ গ্রাম নোয়াগাঁওয়ে ফিরে আসেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।

১৯৭৩ সালের প্রথম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি মাছ প্রতীক নিয়ে সদস্য (মেম্বার) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে সততা, নিষ্ঠা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি এলাকাবাসীর আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেন।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ন্যাপের রাজনীতি কঠিন সময়ে পড়ে। তাঁর এক বড় ভাই রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হন। এরপরও তিনি রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে যাননি। ন্যাপের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের উদয়ন পত্রিকা এবং ন্যাপের মুখপত্র নতুন বাংলা এলাকায় বিতরণ করে মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করেন।

১৯৭৯ সালে শ্রীমঙ্গল নতুন বাজারের সুলভ ভাণ্ডারের সামনের গলিতে ৮-দলের একটি মিছিলে স্থানীয় বিএনপির কিছু কর্মী হামলা চালায়। এ সময় ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর ওপর আক্রমণ করা হয়। দূর থেকে ঘটনাটি দেখে তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন তাঁর বড় ভাই রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী। কিন্তু তিনিও হামলার শিকার হন। পরবর্তীকালে জানা যায়, হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিলেন রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী; তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন দুই ভাইই।

১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাঁর বড় ভাই রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়িত হয়, যা আজও স্থানীয়ভাবে স্মরণ করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবনে ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ছিলেন অবিবাহিত। অভিজাত ও সচ্ছল পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। সরকারি চাকরির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জনসেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজনীতিকেই জীবনের পথ হিসেবে বেছে নেন। সততা, নির্ভীকতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

২০১৪ সালে সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের অনলাইনে আবেদন গ্রহণের উদ্যোগ নিলে তিনি গুরুতর অসুস্থ থাকায় আবেদন করতে পারেননি। একই সঙ্গে পরিবার ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের অসচেতনতার কারণে ন্যাপ–কমিউনিস্ট পার্টি–ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত গেরিলা বাহিনীর তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি থেকেও তিনি বঞ্চিত হন। তবে ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের দেওয়া একটি প্রত্যয়নপত্র এখনো পরিবারের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে, যা তাঁর মুক্তিযুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০০৪ সালের পর নোয়াগাঁও গ্রামের কিছু প্রভাবশালী ও কুচক্রী মহলের প্ররোচনায় স্থানীয় জয়নাল ও হারুনের নেতৃত্বাধীন একটি চক্র তিন অবিবাহিত ভাইবোনকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ১৩ ইঞ্চি স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নিয়ে তাঁদের বিশাল সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা চালায়। কিন্তু শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. আহাদ মিয়া এবং শ্রীমঙ্গল থানার কয়েকজন কর্মকর্তার সাহসী ও সময়োপযোগী ভূমিকার ফলে সেই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার হন। পরিবারের দাবি, ওই চক্রটি এখনো তাঁদের সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

জীবনের শেষ সময়ে তিনি অসুস্থতা ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটিয়েছেন। পর্যাপ্ত চিকিৎসার সুযোগও তিনি পাননি। অবশেষে ২০১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর রাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির তালিকায় তাঁর নাম নেই। তবু শ্রীমঙ্গলের নোয়াগাঁওয়ের মানুষের কাছে ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরী আজও ‘পানু বাবু’—একজন সৎ রাজনীতিক, মুক্তিযুদ্ধের নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক এবং জনসেবায় আত্মনিয়োগ করা বিরল ব্যক্তিত্ব। ইতিহাসের আনুষ্ঠানিক নথিতে তাঁর নাম স্থান না পেলেও মানুষের স্মৃতি, শ্রদ্ধা এবং স্থানীয় ইতিহাসে তিনি এখনো বেঁচে আছেন। তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল স্বীকৃতির তালিকায় সীমাবদ্ধ নয়; অসংখ্য নীরব ত্যাগ, আদর্শ ও আত্মনিবেদনের গল্পও সেই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সিলেটের খবর এর আরও খবর