img

‘২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণের বোঝা নিয়ে যাত্রা করছে বিএনপি সরকার’

প্রকাশিত :  ০৫:২১, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণের বোঝা নিয়ে যাত্রা করছে বিএনপি সরকার’

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনের অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) থেকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হচ্ছে। আজ বিকাল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করবে এবং রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। 

রাজনৈতিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে আজ অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় নতুন সরকারের কাঁধে চাপতে যাচ্ছে ২৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণের বোঝা। পাশাপাশি ২০২৫ সালেও ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২ শতাংশের বেশি। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই বিএনপি সরকারকে অর্থনীতির এ বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে নেয়া সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সরকার ব্যাংকিং উৎস থেকে ৬১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা নিয়েছে। পাশাপাশি এ সময়ে এসেছে ১০৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারের নিট বৈদেশিক ঋণ। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ১০৩ কোটি টাকায়। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকার দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ৭৪ হাজার ২৫১ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। সব মিলিয়ে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ২৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা।

সরকারি ব্যয় ও ঋণের পরিমাণ বাড়লে সাধারণত সুদহার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে। এর প্রভাবে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ভোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। অর্থনীতির পরিভাষায় এ পরিস্থিতিকে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকায়। আগের বছরের ডিসেম্বর শেষে এর পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৫১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। এ ঋণের ৫৭ শতাংশ বা ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকাই নিয়েছে সরকার।

ব্যাংকিং উৎস থেকে গত বছর শেষে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা, আগের বছরে যা ৪ লাখ ১৫ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা ছিল। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমে ৪৭ হাজার ৬১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

মুদ্রানীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকার তার চেয়েও বেশি নিয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে ব্যাংক খাতের সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল সাড়ে ২০ শতাংশ, যদিও তা ২৮ দশমিক ৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সরকারের ঋণ চাহিদা বেশি থাকায় চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়িয়ে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারের ঋণগ্রহণ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে অর্থ বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব মাহবুব আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আহরণ করতে পারেনি সরকার। এ লক্ষ্যমাত্রা কখনই পূরণ করা সম্ভব হয় না। পাশাপাশি ঋণ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া বাবদ বড় অংকের অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের দায় পরিশোধ ও পরিচালন ব্যয় বাবদও সরকারের খরচ বেড়েছে। এসব কারণে ব্যাংক থেকে নেয়া সরকারের ঋণের পরিমাণও বেড়েছে।’

যেসব খাতে ব্যয় কমানোর কথা বলা হয়েছিল সেগুলো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে মাহবুব আহমেদ বলেন, ‘বেসরকারি খাতেও নতুন বিনিয়োগ সেভাবে হচ্ছে না। বিনিয়োগ না থাকলে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণে সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এ কারণে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও কম ধরা হয়েছিল, ৭ দশমিক ২ শতাংশ। সেটি যদিও অর্জিত হয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার প্রয়োজন আছে, যাতে প্রয়োজন ছাড়া ঋণ দেয়া না হয়।’

দেশের বেসরকারি খাতে কয়েক বছর ধরেই বিনিয়োগ স্থবিরতা চলছে। তবে চলতি অর্থবছরে এসে তা আরো তীব্র হয়। গত বছরের জুলাইয়ে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ দশমিক ১ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ২৪ কোটি টাকা। এক বছর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। ফলে বছরের ব্যবধানে বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে প্রায় দুই বছর ধরে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে ধরে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রভাবে ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪-১৫ শতাংশে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ সুদহার কার্যকর থাকলেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং দেশের অর্থনীতিতে চলছে বিনিয়োগ খরা। পরিস্থিতি উত্তরণে সুদহার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। যদিও তাদের এ দাবি উপেক্ষা করেই নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে সম্প্রতি মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হলেও বিনিয়োগ স্থবিরতা কিছুটা কাটিয়ে উঠতে নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে অর্থবছরের শুরুতে জুন পর্যন্ত ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) প্রেসিডেন্ট ও ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেসরকারি খাত এমনিতেই স্থবির হয়ে আছে। পাশাপাশি ব্যাংকের পক্ষ থেকেও এ সময়ে রক্ষণাত্মক ভূমিকা দেখা গেছে। বছর দুয়েক আগে দেশের ব্যাংক খাত প্রায় খাদের কিনারায় চলে গিয়েছিল। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকের পাশাপাশি ঋণগ্রহীতাদের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ফলে যারা এরই মধ্যে ঋণ নিয়েছেন তারা আর নতুন করে ঋণ নেননি। তাছাড়া এ সময়ে বলতে গেলে নতুন ঋণও নেননি কেউ। কিন্তু এটি একটি সাময়িক পদক্ষেপ, দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে পারে না।’

ব্যবসায়ী এ নেতা আরো বলেন, ‘নির্বাচনের পর আমরা দেখেছি যে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যেও সে আস্থা ফিরে আসবে, না আসার কারণ নেই। অতীতে যেটা হয়েছে সেটির বিষয়ে আমরা অবগত, কিন্তু এর ধারাবাহিকতা অবশ্যই আশা করি না। মনেও করি না যে এটা হবে।’

বর্তমানে দেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। এমনকি কভিডকালের চেয়েও নিচে নেমে গেছে বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মূলধনের অন্যতম উৎস হচ্ছে পুঁজিবাজার। বিনিয়োগ খরার কারণে পুঁজিবাজার থেকেও মূলধন সংগ্রহে আগ্রহী হচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে না ওঠায় শিল্পের প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিও কমেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও রফতানি আয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিল্প খাতের মৌলিক তিনটি উপকরণের (মূলধনি যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামাল) আমদানি এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির প্রবণতা নিম্নমুখী।

এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি এলসি খোলার পরিমাণ ২৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ বাড়লেও নিষ্পত্তির পরিমাণ কমেছে ১৬ শতাংশ। মধ্যবর্তী পণ্যের এলসি খোলার পরিমাণ ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং নিষ্পত্তির পরিমাণ ১৩ শতাংশ কমেছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলার পরিমাণ ২ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং নিষ্পত্তির পরিমাণ দশমিক ২২ শতাংশ কমেছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি কমে যাওয়ার পেছনে বিনিয়োগ খরা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও ভোগ ব্যয় কমে যাওয়ার প্রভাব রয়েছে।

নির্বাচনী ইশতাহারে যেসব রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের ব্যয় আরো বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি সরকার যদি পে-স্কেল বাস্তবায়ন করে তাহলেও বড় অংকের অর্থ প্রয়োজন। সব মিলিয়ে সামনে নতুন সরকারকে বাড়তি ব্যয়ের অর্থ জোগানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিডিপি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতিতে বর্তমানে দুই ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে। একটি হচ্ছে সরকার ক্রমান্বয়ে আরো বেশি ব্যাংকনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। আমাদের কর-জিডিপির অনুপাত ধারাবাহিকভাবে কমার কারণে সরকারের রাজস্ব আয়ে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এতে সরকারের ব্যয় সক্ষমতা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে এবং এ কারণে সরকার ঋণ গ্রহণ করে চলেছে। এর বিপরীতে ব্যক্তি খাতের ঋণপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রায় ১০ বছর ধরে জিডিপির ২৩-২৪ শতাংশে স্থির ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি আরো কমে জিডিপির সাড়ে ২২ শতাংশ হয়ে গেছে। তার মানে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ কমছে। এর আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে যে বেসরকারি খাত ঋণও নিচ্ছে না। নতুন বিনিয়োগ নেই, কারখানা সম্প্রসারণ করছে না এবং উৎপাদন বাড়াচ্ছে না। যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ঋণ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগের খরা চলছে বলা যায়। অর্থনীতির এ দুই ধরনের বৈশিষ্ট্যই আমাদের জন্য নেতিবাচক দেখা যাচ্ছে। সামনের দিনের জন্য এটি বেশ উদ্বেগজনক।’

দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন সরকারকে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হবে উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘নির্বাচনের সময় দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের অর্থ প্রয়োজন হবে। পে-স্কেল দেয়ার জন্য টাকার প্রয়োজন। পাশাপাশি নতুন করে এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান কীভাবে হবে? অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আমরা কিন্তু কর্মসংস্থান কমতে দেখেছি। তাছাড়া ব্যবসা সহজীকরণের ক্ষেত্রে যেসব কাঠামোগত সমস্যা যেমন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি, বন্দরের সমস্যা এগুলো রয়ে গেছে। ফলে সার্বিকভাবে নতুন সরকারকে দায়িত্ব নেয়ার পরই এগুলোর মুখোমুখি হতে হবে।’

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলা করে, ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাই বাংলাদেশের অর্থনীতি

প্রকাশিত :  ১১:৫৯, ০১ মে ২০২৬

সিনিয়র রিপোর্টার সৈয়দ আমানউল্লাহ: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন বিএনপি সরকারকে একটি ভঙ্গুর ও চ্যালেঞ্জিং অর্থনীতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে, দেশের অর্থনীতি একটি মিশ্র ও চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ, খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর অবস্থার উত্তরণের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থিতিশীলতা ফেরার মতো ইতিবাচক প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি মাঝারি প্রবৃদ্ধি (প্রায় ৫%) ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছে । মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করা (প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার) প্রধান লক্ষ্য । এছাড়া, এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণ এবং নতুন সরকার কর্তৃক অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চলছে । 

প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন: ২০২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৫০ শতাংশের আশেপাশে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কৃষি ও শিল্প খাতের ওপর নির্ভরশীল । আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ।

বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (ADB) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া কিছুটা শ্লথ হলেও প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

রিজার্ভ ও বাণিজ্য: ঈদুল ফিতরসহ বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হয়েছে । বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে এবং রিজার্ভ প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল হয়েছে । তবে আমদানিনির্ভরতা এবং ডলারের উচ্চমূল্য এখনো চিন্তার বিষয় ।

মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্য: মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের জন্য অন্যতম বড় চাপ। 

মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও ধীরগতিতে তা কমার প্রবণতা রয়েছে । খাদ্যপণ্যের দাম এখনো কিছুটা বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকার তা কমিয়ে আনতে বিভিন্ন আর্থিক ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

খেলাপি ঋণ:  ব্যাংক খাতে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ (Non-Performing Loans) এবং আর্থিক সুশাসনের অভাব বিগত সরকারের সময় থেকে পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার এসব প্রতিষ্ঠানে সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের কাজ করছে।

রাজস্ব ও বাজেট ঘাটতি: কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাজস্ব আদায় না হওয়ায় এবং ভর্তুকি ও ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ায় সরকারের ব্যাংক ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে।

রপ্তানি খাত: আরএমজি (Ready-Made Garments) বা তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি, যা মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪% নিশ্চিত করে। চীন-এর পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির কারণে কাঁচামাল আমদানি, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম এবং শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় কারখানা গুলোর উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। ডলার সংকটের কারণে অনেক কারখানার সময়মতো এলসি খুলতে সমস্যা হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সময়মতো পণ্য ডেলিভারি ও পেমেন্টে। শ্রমিক অসন্তোষ এর কারণে অনেক কারখানা বন্ধ, বকেয়া বেতন এবং কাজের পরিবেশ নিয়ে মাঝে মাঝেই কিছু কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভ দেখা যায়। এছাড়া বর্ধিত খরচের চাপে কিছু ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করে, তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ: কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষিত তরুণ ও যুবকদের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সাথে সাথে নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

রেমিট্যান্স (Remittance): এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত (প্রথম ৪ মাসে) বাংলাদেশে মোট ১২.৫ বিলিয়ন (১,২৫০ কোটি) মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ।  

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই চার মাসে আসা রেমিট্যান্সের মাসিক হিসাব অনুযায়ী 

জানুয়ারি মাসে এসেছে ৩.১৭ বিলিয়ন (৩১৭ কোটি) ডলার, ফেব্রুয়ারি মাসে এসেছে ৩.০২ বিলিয়ন (৩০২ কোটি) ডলার, মার্চ মাসে এসেছে ৩.৭৫ বিলিয়ন (৩৭৫ কোটি) ডলার, (যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ মাসিক রেকর্ড)। এপ্রিল মাসের প্রথম ২৮ দিনে ২.৯১ বিলিয়ন (২৯১ কোটি) ডলার এসেছে । মাস শেষে এই সংখ্যাটি আনুমানিক ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। মোট প্রবাহ, এই সময়ে প্রবাসীরা প্রায় ১২.৮৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রায় ১৬% থেকে ২০% প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ।

বাজেট ও চ্যালেঞ্জ: সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বড় বাজেট প্রণয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে । মূল চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি । 

সার্বিকভাবে, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির ক্ষত ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন সরকারের যাত্রা কিছুটা কঠিন হলেও ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সরকার কাঠামোগত সংস্কার ও আর্থিক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেছে। ২০২৬ সালটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি \"পরীক্ষার বছর\", বলা যেতে পারে।