img

আস্থার সংকট শেষ? নতুন রূপে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার!

প্রকাশিত :  ০৪:৩৯, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৪:৪৯, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আস্থার সংকট শেষ? নতুন রূপে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার!

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

পুঁজিবাজার কোনো সংখ্যাতত্ত্বের খেলা নয়, বরং এটি একটি দেশের অর্থনীতির স্বচ্ছ দর্পণ। ২০২৬ সালের এই প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের যে চিত্র আমাদের সামনে ভেসে ওঠে, তা যেমন আশার সঞ্চার করে, তেমনি এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে গত দেড় দশকের পুঞ্জীভূত অনিয়ম ও আস্থার সংকটের ক্ষত। ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতার যে পালাবদল ঘটেছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে মতিঝিলের পাড়ায়। নির্বাচনের পর প্রথম কার্যদিবস ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক প্রায় ২০০ পয়েন্ট বেড়ে গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছিল। তখন মনে হয়েছিল, যেন রুদ্ধশ্বাস অন্ধকার থেকে বাজার মুক্তি পেতে চলেছে। তবে এই উল্লম্ফন কি নিছক রাজনৈতিক আবেগ, নাকি এর পেছনে কোনো গভীর অর্থনৈতিক ভিত্তি আছে—তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ কেবল একটি নির্বাচিত সরকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি দাঁড়িয়ে আছে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীর আস্থার ওপর।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণ করে পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির ‘মূল চালিকাশক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, পুঁজিবাজারকে দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা বাজারের মৌলিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এশিয়ান ফ্রন্টিয়ার মার্কেটগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়েছে, যার অন্যতম কারণ ছিল সুশাসনের চরম অভাব এবং একাডেমিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা। বর্তমানে বাজারের মূল চ্যালেঞ্জ হলো একে ‘জুয়ার খেলা’ থেকে বের করে এনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত করা। এই উত্তরণের পথটি মসৃণ নয়, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের বিপুল খেলাপি ঋণ এবং ডলার সংকটের মতো কঠিন বাস্তবতা।

সামষ্টিক অর্থনীতির ছায়া ও বিনিয়োগের পরিবেশ

পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে বাংলাদেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে। ২০২৫ সাল শেষে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রতিবেশী দেশ ভারত বা শ্রীলঙ্কা যখন তাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে, বাংলাদেশ তখনো ৮ শতাংশের ওপরের হার নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই রেশ ২০২৬ সালেও থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ক্ষমতাকে সরাসরি আঘাত করছে। একজন বিনিয়োগকারী যখন দৈনন্দিন বাজারের ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খান, তখন শেয়ারবাজারে নতুন বিনিয়োগের স্বপ্ন দেখা তাঁর জন্য বিলাসিতা মাত্র।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেখানে ২৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ তা ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রায় ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং বাজারের ওপর ভিত্তি করে ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণের ফলে বৈদেশিক খাতের চাপ কিছুটা কমেছে। এই স্থিতিশীলতা যদি বজায় থাকে, তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুনরায় বাংলাদেশের বাজারের দিকে তাকাতে পারেন। বর্তমানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার তার ইতিহাসের সর্বনিম্ন মূল্যায়নে (Valuation) অবস্থান করছে, যা অনেক বিদেশি বিশ্লেষকের মতে একটি বড় ‘বাইয়িং অপরচুনিটি’ বা বিনিয়োগের সুযোগ। বিশেষ করে ব্র্যাক ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে প্রতিকূল পরিবেশেও তাদের প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে, তা নির্দেশ করে যে ভালো মৌলিক ভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারে এখনো বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

বিনিয়োগের পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের মাধ্যমে। এটি একটি দ্বিমুখী তলোয়ার। একদিকে যেমন এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়াবে, অন্যদিকে এর ফলে রপ্তানি খাতে বিদ্যমান শুল্কসুবিধা ও সহজ শর্তের বিদেশি ঋণ কমে যাবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের শিল্পখাতের জন্য সস্তা ব্যাংকঋণের পরিবর্তে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের বিকল্প নেই। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট করে বলেছেন, ব্যাংকঋণের ওপর অত্যধিক নির্ভরতা কমিয়ে শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে না পারলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার ও সুশাসনের সন্ধানে

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসের দিকে তাকালে ২০১০ সালের ধসের কথা বারবার মনে আসে। সেই সময়কার তদন্ত প্রতিবেদনে কারসাজিকারীদের যে তালিকা দেওয়া হয়েছিল, দীর্ঘ সময় ধরে তাদের বিচার না হওয়া ছিল আস্থার সংকটের প্রধান কারণ। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০২৫ সালে বেশ কিছু যুগান্তকারী আইনি সংস্কার সম্পন্ন করেছে। মার্জিন রুলস ২০২৫, মিউচুয়াল ফান্ড রুলস ২০২৫ এবং পাবলিক অফার অব ইকুইটি সিকিউরিটিজ রুলস ২০২৫-এর মাধ্যমে বাজারকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। বিএসইসির বর্তমান নেতৃত্ব আইপিওকে বাজারের ‘হৃৎপিণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভালো মানের কোম্পানিকে বাজারে আনার ওপর জোর দিচ্ছেন।

তবে কেবল আইন করলেই হবে না, তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। ২০২৫ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাজার কারসাজির দায়ে গত ৫ মাসে বিএসইসি প্রায় ৬১৯ কোটি টাকা জরিমানা করলেও আইনি জটিলতার কারণে তার এক টাকাও আদায় করা যায়নি। এই ধরনের পরিস্থিতি অপরাধীদের উৎসাহিত করে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। বিনিয়োগকারীরা এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাডেমিক নেতৃত্ব চান না, বরং তারা চান এমন নেতৃত্ব, যাদের বাজারের কারিগরি জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। নতুন সরকার বিএসইসি পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছে, যা বাজারের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হতে পারে।

সুশাসনের অভাবের কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো (এমএনসি) বাংলাদেশের বাজারে আসতে অনাগ্রহী। ইউনিলিভার, নেসলে বা মেটলাইফের মতো কোম্পানিগুলো বিশ্বের অনেক দেশে তালিকাভুক্ত হলেও বাংলাদেশে তারা বাজারের গভীরতা ও স্বচ্ছতার অভাবে তালিকাভুক্ত হতে চায় না। নতুন সরকার যদি এই কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনতে পারে এবং সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠান যেমন বিমান বা শিপিং কর্পোরেশনকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করে, তবেই বাজারের গভীরতা বাড়বে।

ব্যাংকিং খাতের সংকট ও পুঁজিবাজারে তার প্রতিফলন

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের একটি বড় স্তম্ভ হলো ব্যাংকিং খাত। তবে এই খাতটি বর্তমানে সবচেয়ে বেশি রুগ্ণ অবস্থায় রয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০২৪ সালের শেষে ২৮.৫৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ব্যাংকিং খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। ব্যাংকিং খাতের এই সংকট সরাসরি পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলছে, কারণ ব্যাংকগুলোর বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ও ঋণ পুঁজিবাজারে আটকে আছে। ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ‘নেতিবাচক ইকুইটি’ (Negative Equity) একটি স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিএসইসি ইতিমধ্যে ৩৬টি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানকে তাদের আর্থিক ঘাটতি পূরণের সময়সীমা বাড়িয়ে দিয়েছে, যা নির্দেশ করে যে বাজারের অভ্যন্তরীণ কাঠামো কতটা ভঙ্গুর।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের লক্ষ্যে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম দিন থেকে এই ব্যাংকের গ্রাহকরা তাদের পুরোনো চেক দিয়েই লেনদেন করতে পারছেন, যা বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। তবে ব্যাংক খাতের এই সংস্কার যদি কেবল উপরিভাগের প্রলেপ না হয়ে গভীর কাঠামোগত পরিবর্তন হয়, তবেই পুঁজিবাজার তার সুফল পাবে। ব্যাংকগুলো যদি স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া বন্ধ করে এবং কোম্পানিগুলো মূলধনের জন্য পুঁজিবাজারে আসে, তবে লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

রাজনৈতিক পরিবর্তন ও বাজারের নতুন মেরুকরণ

২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর বাজারের আচরণে এক বিশেষ ধরনের মেরুকরণ লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচনের ঠিক পরেই বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছিল। ন্যাশনাল ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক ও মন্নু ফেব্রিক্সের মতো কোম্পানিগুলোর দর বৃদ্ধিতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের ‘পলিটিক্যাল প্রিমিয়াম’ বা রাজনৈতিক আস্থার প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল। অন্যদিকে, বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত গোষ্ঠীগুলোর মালিকানাধীন শেয়ার বা ইসলামী ব্যাংকগুলোর শেয়ারদরে পতন লক্ষ্য করা গেছে।

এই ধরনের রাজনৈতিক উত্থান-পতন বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। পুঁজিবাজারকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে একটি টেকসই অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন করাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশে ‘প্যাট্রোনেজ ইকোনমি’ বা পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতির অবসান ঘটিয়ে একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সবার জন্য সমান সুযোগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যদি তা সম্ভব হয়, তবেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কোম্পানি দেখে নয়, বরং কোম্পানির পারফরম্যান্স দেখে বিনিয়োগ করবেন।

প্রযুক্তিনির্ভর বাজার ও আগামীর সম্ভাবনা

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যতের একটি বড় অংশ হলো তথ্যপ্রযুক্তি বা আইসিটি। ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আইসিটি বাজারের আকার ৯.৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, যা ২০৩১ সালে ১২.৭৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। পুঁজিবাজারে এই খাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বিএসইসি ইতিমধ্যে ই-কেওয়াইসি (ই-কেওয়াইসি) চালু করেছে, যার মাধ্যমে ঘরে বসেই বিও অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া এপিআই (এপিআই) কানেক্টিভিটির মাধ্যমে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সহজ করা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে বাজারে কেবল শেয়ার নয়, বরং কমোডিটি এক্সচেঞ্জ ও ডেরিভেটিভস পণ্য চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে কৃষিপণ্যের জন্য কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু হলে কৃষকরা যেমন ন্যায্যমূল্য পাবেন, তেমনি পুঁজিবাজারেও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হবে। স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাজার কারসাজি শনাক্ত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা যদি কার্যকর হয়, তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা বাড়বে।

এলডিসি উত্তরণ ও বিদেশি বিনিয়োগের হাতছানি

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখন ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ হিসেবে পরিচিত হলেও একে ‘এমার্জিং মার্কেট’ বা উদীয়মান বাজারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ এখনো একটি রহস্যময় দেশ। একদিকে এর ৬ শতাংশের ওপরের গড় প্রবৃদ্ধি (২০১৩-২০২৩) তাদের আকর্ষণ করে, অন্যদিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ডলার লভ্যাংশ পাঠাতে বিলম্ব তাদের নিরুৎসাহিত করে। নতুন সরকার ‘সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স’ ও ডিজিটাল ওয়ার্কফ্লোর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের হয়রানি কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই (এফডিআই) বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

২০২৬ সালের বাজেট বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। যদি বাজেটে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের ব্যবধান বাড়ানো হয়, তবে অনেক ভালো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী হবে। এছাড়া বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন করে ব্যাংকনির্ভরতা কমানোর যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে পারলে অর্থনীতি একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াবে।

একটি আস্থার নবোদয়

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ কেবল সূচকের সবুজ রঙের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য ও সুশাসনের গভীরতার সঙ্গে যুক্ত। ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি, পরিবর্তনের একটি হাওয়া বইছে। নতুন সরকারের সংস্কারের সদিচ্ছা, বিএসইসির আইনি কাঠামো পরিবর্তন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা—সবকিছুই একটি ইতিবাচক সংকেত বহন করে। তবে এই পথটি কণ্টকাকীর্ণ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও খেলাপি ঋণের পাহাড় ডিঙিয়ে পুঁজিবাজারকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও পেশাদারিত্ব।

পুঁজিবাজারের প্রকৃত বিজয় তখনই হবে, যখন একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী তাঁর মাথার ঘাম পায়ে ফেলা জমানো টাকা মতিঝিলে বিনিয়োগ করে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন। তাঁকে আর কোনো কারসাজির ভয় বা তথ্য গোপনের আতঙ্কে থাকতে হবে না। বাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে আগামীর মূল লক্ষ্য। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাষায়, ‘গণতন্ত্র কেবল ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, অর্থনীতির সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই হলো প্রকৃত গণতন্ত্র।’ সেই স্বপ্ন যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার হবে ‘বেঙ্গল টাইগার’ অর্থনীতির প্রকৃত মেরুদণ্ড। আমরা সেই সুদিনের অপেক্ষায় আছি, যেখানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার হবে আস্থার এক অপরাজেয় দুর্গ।


অর্থনীতি এর আরও খবর

img

ডিভিডেন্ড ঘোষণা ও ইপিএস প্রকাশের তারিখ জানাল ৫ কোম্পানি

প্রকাশিত :  ১৯:২৭, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২০:০৬, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মোট ৫টি কোম্পানি তাদের পরিচালনা পর্ষদের সভার (বোর্ড সভা) তারিখ ঘোষণা করেছে। কোম্পানিগুলো হলো- কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স, শাহজীবাজার পাওয়ার কোম্পানি, পিপলস ইন্স্যুরেন্স, ইউনিলিভার কনজুমার এবং এস্কোয়ার নিট কম্পোজিট।
কোম্পানিগুলোর মধ্যে কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স এবং পিপলস ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ পর্যন্ত সমাপ্ত অর্থবছরের নিরিক্ষীত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ডিভিডেন্ড ঘোষণা করবে।
একই সভায় পিপলস ইন্স্যুরেন্স ও ইউনিলিভার কনজুমার ৩১ মার্চ, ২০২৬ পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকের অনিরিক্ষীত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
এছাড়া, শাহজীবাজার পাওয়ার ও এস্কোয়ার নিট কম্পোজিট ৩১ মার্চ, ২০২৬ পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকের অনিরিক্ষীত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে
সোমবার (১৩ এপ্রিল) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এই তথ্য প্রকাশ করে।

কোম্পানিগুলোর সভার তারিখ ও সময়

২০ এপ্রিল, ২০২৬ (সোমবার):
শাহজীবাজার পাওয়ার কোম্পানি: বিকেল ৩:০০ টায়
ইউনিলিভার কনজুমার: বিকেল ৪:০০ টায়

২৩ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার)
পিপলস ইন্স্যুরেন্স: বিকাল ৩:০০ টায়
কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স: বিকাল ৪:০০ টায়

২৮ এপ্রিল (মঙ্গলবার)
এস্কোয়ার নিট কম্পোজিট: বিকেল ৩:০০ টায়