সিলেটের যোগাযোগ সংকটে উন্নয়নের স্বপ্ন: সড়ক, রেল ও আকাশপথে সম্ভাবনা ও বাস্তবতার ব্যবধান
সংগ্রাম দত্ত, প্রতিনিধি শ্রীমঙ্গল: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল সিলেট বিভাগ—চা, পাহাড়, হাওর ও প্রবাসী অর্থনীতির জন্য দেশব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। প্রবাসী আয়ের অন্যতম কেন্দ্র, পর্যটন সম্ভাবনার ভান্ডার এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হওয়া সত্ত্বেও দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা সিলেটের অগ্রগতিকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। সড়ক, রেল ও আকাশপথ—তিনটি ক্ষেত্রেই সংকট এখন স্থানীয় জনগণের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সড়ক যোগাযোগে নাজুক বাস্তবতা
সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দুরবস্থা দীর্ঘদিনের সমস্যা। পাঁচ ঘণ্টার পথ অতিক্রম করতে যাত্রীদের এখন প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় ব্যয় করতে হয়। যানজট, সড়কের সংস্কারের ধীরগতি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা যাত্রীসেবাকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে। দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি।
আকাশপথে চাপ ও টিকিট সংকট
সড়ক ও রেলপথের সীমাবদ্ধতার কারণে আকাশপথে যাত্রার চাপ বেড়েছে। তবে সিলেটের বিমান চলাচল ব্যবস্থাও চ্যালেঞ্জের মুখে। ঢাকা-সিলেট রুটে বিমান ভাড়া অনেক ক্ষেত্রে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা সাধারণ যাত্রীদের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা কম থাকায় টিকিট সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়া যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: সম্ভাবনা বনাম বাস্তবতা
১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সিলেট এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এখানে যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ম্যানচেস্টার এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট চালু রয়েছে।
২০১৮ সালে বিমানবন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে ২,৩০৯ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু নকশাগত জটিলতা, প্রশাসনিক ধীরগতি ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে পাঁচ বছরে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২২ শতাংশ। প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৭৮০ কোটি টাকায় এবং মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ২০ লাখ যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিমানবন্দর যথাযথভাবে উন্নত হলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিমান হাবে পরিণত হতে পারে।
শমশেরনগর বিমানবন্দর: ইতিহাসের গৌরব, পুনরুজ্জীবনের অপেক্ষা
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর বিমানবন্দর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ প্রশাসন সামরিক উদ্দেশ্যে নির্মাণ করে। একসময় এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বিমান যোগাযোগ কেন্দ্র ছিল।
১৯৬৮ সালের দুর্ঘটনার পর বেসামরিক বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে এটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৯৫ সালে বেসরকারি উদ্যোগে স্বল্প সময়ের জন্য ফ্লাইট চালু হলেও তা স্থায়ী হয়নি।
২০১৬ সালে বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে পুনরায় ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নিলেও শমশেরনগর বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে এখনও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত আসেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রবাসীরা মনে করেন, এই বিমানবন্দর চালু হলে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের পর্যটন, কৃষি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে। একই সঙ্গে প্রবাসীরা সরাসরি নিজ এলাকায় পৌঁছানোর সুযোগ পাবেন।
পর্যটন খাতের অপার সম্ভাবনা
সিলেট বিভাগের পর্যটন শিল্প অত্যন্ত সমৃদ্ধ। জাফলং, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, বিছানাকান্দি, লালাখান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হামহাম জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর এবং ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনাগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
তবে পর্যটন বিকাশের প্রধান বাধা সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু হলে সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরের ওপর চাপ কমবে এবং পর্যটন শিল্প আরও গতিশীল হবে।
রেল যোগাযোগ: আটকে থাকা উন্নয়নের গল্প
সিলেটের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার চিত্রও হতাশাজনক। ২০১৯ সালে আখাউড়া–সিলেট ডবল লাইন প্রকল্প অনুমোদিত হলেও অর্থ সংকটের কারণে প্রকল্পটি ধীরগতিতে চলছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-সিলেট রেলপথে দ্রুত ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হতো।
ময়মনসিংহ–সিলেট রেলসংযোগের দাবিও দীর্ঘদিনের। বর্তমানে এই দুই বিভাগের মধ্যে সরাসরি রেলপথ না থাকায় যাত্রীদের ঢাকা বা ভৈরব হয়ে ঘুরে যেতে হয়, যেখানে সময় লাগে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা। সরাসরি রেলপথ চালু হলে এই সময় প্রায় ৭ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতো।
২০২৩ সালে ঘোষিত টাঙ্গুয়ার এক্সপ্রেস ট্রেনও এখনো চালু হয়নি। একইভাবে নতুন আন্তঃনগর ট্রেন ও আধুনিক কোচ ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি।
ইন্টারসিটি ট্রেনের স্টপেজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতেও স্থানীয় জনগণ বিভিন্ন সময় মানববন্ধন করেছে। তাদের দাবি, অতিরিক্ত স্টপেজের কারণে ট্রেন ভ্রমণে অস্বস্তি তৈরি হয়।
শ্রীমঙ্গল: পর্যটন ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু
শ্রীমঙ্গল সিলেট বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। চা শিল্প, কৃষি উৎপাদন এবং পর্যটন ব্যবসা এখানে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ঐতিহাসিক রাধানগর এলাকা ও ডলুছড়া পাহাড় অঞ্চল পর্যটন আকর্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবুও আধুনিক রেল যোগাযোগের অভাবে এই অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
অর্থনৈতিক প্রভাব
সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম রেমিট্যান্স নির্ভর অঞ্চল। প্রবাসী আয়, চা শিল্প, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পর্যটন খাত সিলেটের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হলে রপ্তানি বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন হলে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শমশেরনগর বিমানবন্দর সিলেটকে আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। একই সঙ্গে আধুনিক রেলপথ স্থাপন সিলেটের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।
সিলেটবাসীর প্রত্যাশা—আর কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, এবার দৃশ্যমান উন্নয়ন। সিলেটের আকাশ, সড়ক ও রেলপথে দ্রুত পরিবর্তন আসুক—এই প্রত্যাশাই এখন অঞ্চলের মানুষের প্রধান দাবি।



















